Home সুমন নামা পশ্চিমবঙ্গ নয়, নাম রাখা হোক গো-বঙ্গ

পশ্চিমবঙ্গ নয়, নাম রাখা হোক গো-বঙ্গ

0 comments 5 views 4 minutes read
A+A-
Reset

সুমন চট্টোপাধ্যায়: “যে রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীর থেকেও বেশি রাজনৈতিক গুরুত্ব পায় গোরু, সে রাজ্যের নাম পশ্চিমবঙ্গ রাখা সাংবিধানিক প্রতারণা

পৃথিবীর ইতিহাসে কিছু কিছু দিন আছে, যেগুলো ঘটার পর ইতিহাসের বই নতুন করে লিখতে হয়। যেমন ১৭৮৯ সালে বাস্তিল দুর্গ পতনের পরে ফরাসি ইতিহাস আর আগের জায়গায় থাকেনি। ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের পরে রাশিয়া আর পুরনো রাশিয়া ছিল না। আবার ২০২৬ সালের ২৮ মে-র পরে পশ্চিমবঙ্গও আর পশ্চিমবঙ্গ রইল না। অন্তত নৈতিকভাবে নয়। সাংস্কৃতিকভাবে নয়। রাজনৈতিকভাবে তো নয়ই।

কারণ ওই দিন একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। না, গঙ্গা উল্টো দিকে বইতে শুরু করেনি।
না, কলকাতার রাস্তায় গর্ত দেখা যায়নি— সেটাও পুরনো ঘটনা।
না, বিদ্যুৎ দপ্তর সময়মতো কাজ করেছে— এত বড় মিরাকলের দাবি আমরা করছি না। ঘটনাটি আরও গভীর। আরও সভ্যতাগত।

বাংলায় মুসলিম শাসনের আটশো বছরের ইতিহাসে এই প্রথম এমন একটি ঈদ কেটে গেল, যেখানে গরু কাটা হয়নি। হ্যাঁ, ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজি নদীয়া আক্রমণ করার পর থেকে শুরু করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলার ইতিহাসে এমন কোনও ঈদ নেই, যেখানে গরু কোর্বানি হয়নি। সুলতানি আমল গেছে, মোগল গেছে, নবাব গেছে, কোম্পানি গেছে, ব্রিটিশ গেছে, কংগ্রেস গেছে, বামফ্রন্ট গেছে, তৃণমূল গেছে— কিন্তু গরু গেছে কোর্বানির ময়দানে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বজায় থেকেছে।

কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই ৮২৬ বছরের ঐতিহ্যে দাঁড়ি টানল নতুন যুগের নতুন বঙ্গ। এবং সেই মুহূর্তেই “পশ্চিমবঙ্গ” নামটি অচল হয়ে গেল। কারণ “পশ্চিমবঙ্গ” নামের মধ্যে কোনও গোরু নেই। কোনও গো-রাজনীতি নেই। কোনও ষাঁড়তত্ত্ব নেই।
কোনও গোমাতা-চেতনা নেই। এ যেন এমন এক রাষ্ট্রের নাম “মৎস্যপ্রদেশ”, যেখানে মাছ খাওয়া নিষিদ্ধ। অথবা “পাঞ্জাব”, যেখানে পাঁচটি নদীর বদলে পাঁচটি ফ্লাইওভার আছে। না, নামের সঙ্গে বাস্তবের একটা ন্যূনতম সম্পর্ক থাকা উচিত।

এখন বাস্তব কী বলছে? বাস্তব বলছে, এই রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীর পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সত্তা হল গোরু। গোরু এখন আর প্রাণী নয়।
সে একটি সাংবিধানিক অনুভূতি। একটি চলমান আদর্শ।
একটি চারপেয়ে নীতি-নির্দেশক তত্ত্ব। কলকাতার চায়ের দোকানে যে আলোচনা আগে হত—
“মোহনবাগান কেমন খেলল?”ডিএ কবে মিলবে?”মেট্রো আবার বন্ধ কেন?”

সেই সব ইতিহাস। এখন সর্বত্র একটাই প্রশ্ন—“গোরু কাটা হবে?”

এমনকী বাংলার মধ্যবিত্তের সকালের রক্তচাপও এখন নির্ভর করে গোরুর উপর। গোরু যদি নিরাপদ থাকে, তবে রাষ্ট্রও নিরাপদ।গোরুর মন যদি খারাপ হয়, তবে শেয়ার বাজার পড়তে পারে, মৌসুমি বায়ু দেরি করতে পারে, এমনকী মাধ্যমিকের রেজাল্টও প্রভাবিত হতে পারে— এই জাতীয় এক গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাস সমাজে জন্ম নিয়েছে। এবং এই বিপুল সাংস্কৃতিক উত্তরণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মহাশয়।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হয়তো নন্দীগ্রাম নয়, বিরোধী রাজনীতি নয়, প্রশাসনিক সংস্কারও নয়। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে অন্য কারণে। “বাংলায় গোরু রক্ষার মহাযজ্ঞ”-এর প্রধান পুরোহিত হিসেবে। তিনি বুঝেছেন, বাংলার রাজনীতি আর মানুষকেন্দ্রিক নেই। এটি ধীরে ধীরে গোরুকেন্দ্রিক সভ্যতায় প্রবেশ করছে।

এখন প্রশ্ন হল—যে রাজ্যে গোরুর সম্মান রক্ষার জন্য মামলা হয়, টিভি ডিবেট হয়, প্রশাসনিক বৈঠক হয়, রাজনৈতিক মেরুকরণ হয়, এবং সামাজিক মিডিয়ায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে অগ্নিগর্ভ পরিবেশ তৈরি হয়— সেই রাজ্যের নাম এখনও “পশ্চিমবঙ্গ” থাকবে কেন? এটি তো স্পষ্ট অবিচার। বরং নাম হওয়া উচিত—গো-বঙ্গ।

“গো” শব্দটির মধ্যে কী অপূর্ব বহুমাত্রিকতা! সংস্কৃতে “গো” মানে গরু। আবার “গো” মানে ইন্দ্রিয়। আবার “গো” মানে পৃথিবীও। অর্থাৎ “গো-বঙ্গ” এমন এক চেতনার নাম, যেখানে গোরু, ইন্দ্রিয় এবং ভূখণ্ড একাকার হয়ে গেছে। একবার ভাবুন তো—
হাওড়া স্টেশনে নামতেই লেখা থাকবে:“গো-বঙ্গে আপনাকে স্বাগত।” রাজ্যের পর্যটন দপ্তরের নতুন স্লোগান হতে পারে:দেখতে আসুন দিঘা, বুঝতে আসুন গোরুর মাহাত্ম্য।” স্কুলের বইতেও সংশোধন আসবে।বর্তমান: “পশ্চিমবঙ্গের প্রধান কৃষিজ ফসল ধান।” পরিবর্তিত পাঠ্য: “গো-বঙ্গের প্রধান রাজনৈতিক ফসল গোরু।”

এমনকী ভবিষ্যতে প্রশাসনিক পদগুলিরও সংস্কার হতে পারে।
যেমন—

  • মুখ্যমন্ত্রী → গোমুখ্যন্ত্রী
  • রাজভবন → গোভবন
  • বিধানসভা → গোবিধানসভা
  • পুলিশ কমিশনার → গোরক্ষা তত্ত্বাবধায়ক

এবং অবশ্যই, রাজ্যের প্রতীকচিহ্নে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বদলে শান্ত-সুশীতল এক গাভী স্থান পাবে।

তবে এখানেই সবচেয়ে বড় ভুলটি করছেন অনেকে।
তাঁরা ভাবছেন গোরু মানেই শান্তি। এ এক ভয়ংকর ভ্রান্তি।গোরু বাইরে থেকে যত শান্ত দেখাক, তার আত্মসম্মান প্রবল। মানুষ যেমন দল বদলায়, মত বদলায়, আদর্শ বদলায়— গোরু তা করেনা। গোরু কখনও টি এম সি করেনা। গোরু কখনও বিজেপিও করেনা। এই কারণেই গোরু বিপজ্জনক। কারণ রাজনৈতিক কর্মীর মতো তাকে “ম্যানেজ” করা যায় না। সে প্রেস কনফারেন্সে বসে ব্যাখ্যা দেয় না। সে টুইট করে না। সে সাংবাদিক বৈঠকে বলে না— “আমার বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে।” সে সরাসরি শিং নামায়।

এই কারণেই মায়াপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মুখ্যমন্ত্রী যখন সস্নেহে গোরুকে আলিঙ্গন করছিলেন, তখন গোটা বাংলা আবেগে আপ্লুত হয়েছিল।
কেউ কেউ চোখ মুছছিলেন। কারও মনে হচ্ছিল কৃষ্ণ ফিরে এসেছেন। কেউ আবার মনে মনে বাঁশির সুরও শুনতে পেয়েছিলেন।কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে— গোরুরা কী ভাবছিল?

আমরা কি কখনও গোরুর মতামত নিয়েছি? হতে পারে, তারা ভদ্রতা করেছে।
হতে পারে, তারা ভাবছিল—“ঠিক আছে, আপাতত ছবি তুলে নাও। পরে দেখা যাবে।” কারণ গোরুর স্মৃতিশক্তি নাকি প্রবল। আজ আপনি তার সঙ্গে কোলাকুলি করলেন, আর কাল যদি রাজ্যের নাম পরিবর্তনের প্রশ্নে তাকে অবজ্ঞা করেন— তাহলে পরিস্থিতি অন্যরকমও হতে পারে। মায়াপুরের সেই বিশালাকৃতি ষাঁড় যদি কোনওদিন আত্মমর্যাদায় আঘাত পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে? যদি সে ভাবে,“আমাদের এত ব্যবহার, এত প্রচার, এত রাজনৈতিক মুনাফা অথচ রাজ্যের নামেও আমাদের জায়গা নেই?” তখন?তখন ইসকনের ভক্তরাও হয়তো “হরে কৃষ্ণ” বলতে বলতে চারদিকে প্রাণভয়ে দৌড়তে শুরু করবেন। রাজনৈতিক নিরাপত্তারক্ষীরা ব্যারিকেড ফেলবেন। সংবাদমাধ্যম বলবে—“ষাঁড়ের আচরণে রহস্য!”

কিন্তু প্রকৃত সত্যটি ইতিহাসবিদরা বুঝবেন। এটি হবে পরিচয়ের লড়াই।
অস্তিত্বের লড়াই। গো-অস্মিতার বিস্ফোরণ। আর তাই সময় থাকতে পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলে গো-বঙ্গ করা উচিৎ। এটি কেবল নাম পরিবর্তন নয়।
এটি একটি সভ্যতার আত্মস্বীকৃতি।

চলবে…

Author

  • সুমন চট্টোপাধ্যায় (জন্ম: ২৩ অক্টোবর ১৯৫৭) একজন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি সাংবাদিক, সম্পাদক এবং লেখক, যিনি তাঁর তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ ও অনন্য রচনাশৈলীর জন্য সুপরিচিত। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক সম্পন্ন করে ১৯৮১ সালে আজকাল পত্রিকায় যোগ দেওয়ার মাধ্যমে তিনি সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ ২৫ বছর আনন্দবাজার পত্রিকা-র কার্যকরী সম্পাদক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ভারত ও শ্রীলঙ্কার নির্বাচন, ভূ-রাজনীতি ও সন্ত্রাসবাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সাহসিকতার সাথে কভার করার পাশাপাশি স্টার আনন্দ, কলকাতা টিভি ও তারা বাংলার মতো টেলিভিশন মাধ্যমেও যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি নিজস্ব সংবাদপত্র একদিন চালু করেন এবং ২০১২ সালে 'দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া' গ্রুপের বাংলা দৈনিক এই সময়-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি তাঁর নিজস্ব ব্লগ 'বাংলাস্ফিয়ার' (Banglasphere)-এ নিয়মিত বস্তুনিষ্ঠ লেখা ও মতামত প্রকাশ করে যাচ্ছেন এবং সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে মাই ডেট উইথ হিস্ট্রি, প্রথম নাগরিক, সেদিনের সপ্তারোহীগুমঘর গুলজার-এর মতো বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন।

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles