বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বকাপে পর্তুগালের দুর্দান্ত জয়ের রাতটি শুধুই দলের সাফল্যের ছিল না, ছিল ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর প্রত্যাবর্তনের ঘোষণাও। উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার ম্যাচে জোড়া গোল করে তিনি শুধু দলের জয় নিশ্চিত করেননি, ইতিহাসও গড়েছেন। পৃথিবীর একমাত্র পুরুষ ফুটবলার হিসেবে টানা ৬টি ভিন্ন বিশ্বকাপে (২০০৬ থেকে ২০২৬) গোল করার অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়েন তিনি। মেসি ৬টি বিশ্বকাপ খেললেও ২০১০ আসরে গোল পাননি।
ম্যাচের পর আবেগপ্রবণ রোনাল্ডো জানিয়েছেন, গত কয়েক দিন তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। গণতান্ত্রিক কঙ্গোর বিরুদ্ধে নিষ্প্রভ ড্রয়ের পর পর্তুগাল দল যেমন সমালোচনার মুখে পড়েছিল, তেমনই ব্যক্তিগতভাবে তীব্র আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন ৪১ বছর বয়সি এই তারকা। বড় টুর্নামেন্টে টানা ১০ ম্যাচ গোলহীন থাকার কারণে অনেকেই প্রশ্ন তুলছিলেন, এখনও কি তিনি পর্তুগালের আক্রমণের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সক্ষম?
সেই প্রশ্নের উত্তরই যেন তিনি মাঠে দিয়েছেন। ম্যাচ শেষে টিভির ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সটান চিৎকার করে রোনালদো ঘোষণা করলেন— “আই অ্যাম ব্যাক, আই অ্যাম ব্যাক” (আমি ফিরে এসেছি)!
পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রোনাল্ডো বলেন, “ঈশ্বর তাঁদেরই সাহায্য করেন যারা কঠোর পরিশ্রম করে। এটা ছিল খুব কঠিন, অন্ধকার একটা সপ্তাহ। এমনও মনে হচ্ছিল, যেন আমি ইতিমধ্যেই ফুটবল থেকে অবসর নিয়ে ফেলেছি। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। কারণ আমি সবসময় বিশ্বাস করি পরিশ্রমে।”
তিনি আরও বলেন, “২৩ বছর ধরে আমি পেশাদার ফুটবলে আছি। যখনই কিছু খারাপ হয়, তখনই বলা হয়—‘ক্রিশ্চিয়ানো শেষ’, ‘সে বুড়ো হয়ে গেছে’। আজ আমি এবং আমার সতীর্থরা মাঠে তার জবাব দিয়েছি।”
এই কীর্তি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন আগের দিনই মেসি বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়েছেন। কিন্তু ব্যক্তিগত রেকর্ডের চেয়ে দলের সাফল্যকেই বড় করে দেখছেন রোনাল্ডো।
তাঁর কথায়, “রেকর্ড ভাঙা অবশ্যই ভালো লাগে। কিন্তু আমার প্রধান লক্ষ্য জাতীয় দলকে তার লক্ষ্য পূরণে সাহায্য করা। আমাদের প্রথম কাজ ছিল গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে যাওয়া। চার পয়েন্ট নিয়ে আমরা সেই কাজ প্রায় সেরে ফেলেছি।”
এই জয় পর্তুগালকে বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার হিসেবেও তুলে ধরছে। তবে রোনাল্ডো মনে করেন, দলের ঐক্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, “আজ আমি ম্যাচসেরা হয়েছি, কাল অন্য কেউ হবে। যদি আমরা একসঙ্গে থাকি, তাহলে অনেক দূর যেতে পারব।”
মেসির সঙ্গে তুলনা বা তাঁর রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রোনাল্ডোর উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত এবং স্পষ্ট—“মেসিকে নিয়ে আমি ভাবি না।”
অন্যদিকে পর্তুগাল কোচ মার্তিনেস অবশ্য দুই মহাতারকারই প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, “রোনাল্ডো এবং মেসি দু’জনেই ফুটবল ইতিহাসের অংশ। তাঁরা খেলাটাকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন। রোনাল্ডো আমাদের অধিনায়ক, একজন আদর্শ মানুষ। প্রতিদিন অনুশীলনে নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা করে এবং ড্রেসিংরুমে অসাধারণ প্রভাব রাখে।”
উজবেকিস্তানের কোচ ফ্যাবিও ক্যানাভারো-ও রোনাল্ডোর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি বলেন, “আমি ওকে বলেছি, যদি এখনও ফুটবল উপভোগ করো এবং ক্লান্ত না হও, তাহলে আরও কয়েক বছর খেলতে পারো। ৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপে এসে এভাবে খেলতে পারা প্রমাণ করে তোমার খিদে এখনও শেষ হয়ে যায়নি।”
ক্যানাভারোর মতে, রোনাল্ডোর এই পারফরম্যান্স সেইসব সমালোচকদেরও জবাব, যারা মনে করেন সৌদি আরবের লিগে খেলে তিনি সময় নষ্ট করছেন। তাঁর কথায়, “রোনাল্ডোর বিরুদ্ধে খেলতে গেলে এক সেন্টিমিটার জায়গাও ছাড়া যায় না। সুযোগ পেলেই সে শাস্তি দেবে। বিশ্বকাপে তার এই পারফরম্যান্স দেখিয়ে দিল, সে এখনও বিশ্বের সেরাদের একজন।”