হাইলাইটস:
- বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে প্যারাগুয়েকে ৪-১ গোলে হারাল যুক্তরাষ্ট্র।
- ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ, ওয়েস্টন ম্যাককেনি ও ফোলারিন বালোগুনের দুরন্ত ফুটবলে মুগ্ধ গ্যালারি।
- প্রথমার্ধেই ৩-০ এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা।
- বালোগুনের জোড়া গোল, শেষ মুহূর্তে জিও রেইনার দুর্দান্ত সমাপ্তি।
- জয় সত্ত্বেও রক্ষণভাগের কিছু দুর্বলতা সামনে এল পচেত্তিনোর দলের।
লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামের ঠিক উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আছে কিংবদন্তি ফোরাম। আশির দশকে এই ফোরামই ছিল আমেরিকান ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম আকর্ষণীয় বিনোদনমঞ্চ—লস অ্যাঞ্জেলেস লেকার্সের ‘শোটাইম’ যুগের কেন্দ্রবিন্দু। ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের অভিযান শুরু করতে নেমে, ৭০,৪৯২ দর্শকের সামনে মার্কিন পুরুষ ফুটবল দল যেন সেই লেকার্সেরই শোটাইম দর্শনকে মাঠে পুনর্জীবিত করল।
অভিযানের শুরুতেই তারা দুর্দান্ত ছন্দে প্যারাগুয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়ে দিল।
ম্যাচের আগের দিন কোচ মরিসিও পচেত্তিনো তাঁর ফুটবলারদের কাছে আত্মবিশ্বাসের বার্তা দিয়েছিলেন। বড় বড় বক্তৃতা বা আবেগঘন আহ্বানের প্রয়োজন নেই বলেই মনে করেছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের দেশের মাটিতে বিশ্বকাপে আলো ছড়ানোর স্বপ্ন দেখা এই দলকে তিনি শুধু বলেছিলেন আনন্দ নিয়ে এবং মনোযোগ ধরে রেখে খেলতে। ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের এক সদস্যের পরামর্শও তিনি উদ্ধৃত করেছিলেন।
মাঠে নেমে তাঁর ফুটবলাররা ঠিক সেটাই করে দেখাল।
খেলার শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণের লাগাম হাতে তুলে নেয়। ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ ও মালিক টিলম্যান যেন প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে বেশি ‘নাটমেগ’ করার অলিখিত প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। তাঁদের দাপটে প্যারাগুয়ের দুই ডিফেন্ডার হলুদ কার্ড দেখতে বাধ্য হন।
প্রথম গোলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি দশ মিনিটও। টিম রিম ডিফেন্সের পেছন দিক থেকে বল বাড়ান অ্যালেক্স ফ্রিম্যানকে। ফ্রিম্যান ডান প্রান্ত দিয়ে এগিয়ে গিয়ে নিখুঁত একটি পাস বাড়ান ওয়েস্টন ম্যাককেনির উদ্দেশে। জুভেন্টাসের মিডফিল্ডার দ্রুত বল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে পুলিসিচের সঙ্গে বোঝাপড়া তৈরি করেন। এরপর পুলিসিচের ফিরতি পাস থেকে নেওয়া ম্যাককেনির শট ড্যামিয়ান বোবাদিয়ার গায়ে লেগে দিক বদলে জালে ঢুকে যায়।
অতীতে বিশ্বকাপে গোল করার পর অনেক সময়ই মার্কিন দলকে রক্ষণাত্মক হয়ে যেতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু শুক্রবারের দলটি ছিল ভিন্ন। গোলের পরেও তারা আক্রমণের তীব্রতা কমায়নি।
বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামা ফোলারিন বালোগুন ২০ মিনিটের ব্যবধানে দুটি অসাধারণ গোল করেন। ৩১ মিনিটে পুলিসিচের ক্রস থেকে প্রথম গোলটি আসে। দ্বিতীয় গোলটি আরও দৃষ্টিনন্দন। প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে টিলম্যানের বাড়ানো পাস ধরে তিনি ডান দিক দিয়ে উঠে যান। প্যারাগুয়ের অভিজ্ঞ অধিনায়ক গুস্তাভো গোমেজকে চমৎকার কৌশলে কাটিয়ে তিনি বক্সের ভেতর থেকে বল জড়িয়ে দেন জালের ওপরের কোণে।
প্রথমার্ধ শেষ হয় ৩-০ ব্যবধানে।
বিরতির সময় পুলিসিচকে তুলে নেন পচেত্তিনো। সিদ্ধান্তটি আঘাতজনিত কারণে নয়, বরং সতর্কতামূলক বলেই মনে হয়েছে। প্যারাগুয়ের ফুটবলাররা যখন ম্যাচে ফেরার মরিয়া চেষ্টা করছিলেন, তখন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে অপ্রয়োজনীয় ফাউলের ঝুঁকিতে রাখতে চাননি কোচ।
দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য প্যারাগুয়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। তারা বালোগুনের গতিবিধির ওপর নজরদারি বাড়ায় এবং মাঠের মাঝামাঝি ফাঁকা জায়গাগুলি বন্ধ করে দেয়, যেগুলি প্রথমার্ধে মার্কিনরা অনায়াসে ব্যবহার করছিল।
অবশেষে ৭৩ মিনিটে একটি গোলও শোধ করে প্যারাগুয়ে। গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলের দ্রুত খেলা শুরু করার পর মার্কিন রক্ষণভাগ কিছুটা অগোছালো অবস্থায় ধরা পড়ে। টাইলার অ্যাডামসের ক্লিয়ারেন্স গিয়ে পড়ে মিগেল আলমিরনের কাছে। তিনি দ্রুত বল বাড়িয়ে দেন হুলিও এনসিসোর উদ্দেশে। এনসিসো আবার তা এগিয়ে দেন বদলি খেলোয়াড় মরিসিওর জন্য। পালমেইরাসের এই উইঙ্গার ম্যাট ফ্রিজকে পরাস্ত করে বল জালে পাঠান।
গোলটি প্যারাগুয়ের জন্য সান্ত্বনা হলেও, মার্কিন দলের কিছু সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে আসে। রক্ষণে বেশ কয়েকটি ফাঁকফোকর দেখা গিয়েছে। গোলরক্ষক ফ্রিজও একাধিকবার লাইন ছেড়ে বেরিয়ে আসতে অনীহা দেখিয়েছেন। পরবর্তী প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্ক সম্ভবত এই দুর্বলতাগুলিকে আরও কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলবে। বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও রক্ষণকে আরও সতর্ক হতে হবে।
তবে সেসব চিন্তা আপাতত ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখা যেতে পারে।
যেদিন থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে এই বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল, সেদিন থেকেই মার্কিন ফুটবলারদের প্রতিটি পদক্ষেপকে এই টুর্নামেন্টের প্রেক্ষাপটে বিচার করা হয়েছে। সেই চাপের নিচে ভেঙে না পড়ে শুক্রবার তারা দেখিয়ে দিল, এই মঞ্চে থাকার যোগ্যতা তাদের রয়েছে।
আর শোটাইম যদি হয়, তবে শেষ দৃশ্যটিও হতে হবে স্মরণীয়।
ম্যাচের শেষদিকে, যখন প্যারাগুয়ে গোলপার্থক্যের ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করছে, তখন বদলি হিসেবে নামা জিও রেইনা ডান পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে অসাধারণ এক শটে বল জড়িয়ে দেন জালে। গোলরক্ষক গিলের কোনও সুযোগই ছিল না।
এই বিশ্বকাপ চক্রে মার্কিন দলের পথচলা সবসময় সুন্দর ছিল না। সমালোচনা, হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই তারা এগিয়েছে। কিন্তু সেসব যেন ছিল কেবল প্রস্তুতির অংশ। আসল মঞ্চ ছিল এই বিশ্বকাপ, এই উজ্জ্বল আলোকবৃত্ত।
আর অন্তত প্রথম ৪৫ মিনিটে, যুক্তরাষ্ট্র এমন এক প্রদর্শনী উপহার দিল, যেখানে একটিও সংলাপ ভুল হয়নি।