বাংলাস্ফিয়ার: রাজনীতিতে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন কোনও নেতার সামনে একটিই প্রশ্ন দাঁড়িয়ে থাকে। প্রশ্নটি জটিল নয়। বরং এতটাই সরল যে তার উত্তর দেওয়াই কঠিন হয়ে ওঠে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে শেষ কয়েক বছরে তেমনই একটি প্রশ্ন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল—দল, না ভাইপো?

অনেকের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান বিপর্যয়ের ইতিহাস আসলে এই এক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ইতিহাস। এবং সেই উত্তর মমতা দিয়েছেন বারবার, দ্বিধাহীনভাবে। তিনি দলকে নয়, ভাইপোকেই বেছে নিয়েছেন।

অভিষেকের উত্থান ও সমান্তরাল ক্ষমতাকেন্দ্র

দলের একাংশের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশপাশে এমন একটি বলয় তৈরি হয়েছে যেখানে প্রবীণ নেতাদের মতামতের কোনও মূল্য নেই। অভিষেকের তৃণমূলের অভ্যন্তরে উত্থান শুধু উত্তরাধিকারীর উত্থান হিসেবে নয়, একটি সমান্তরাল ক্ষমতাকেন্দ্রের উত্থান হিসেবে দেখা দিতে শুরু করেছে বলে মনে করেন দলের বহু নেতা।

অভিযোগ রয়েছে, সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে উপরে, কিন্তু তার দায় বইতে হচ্ছে নিচের স্তরের সংগঠনকে। জেলা নেতৃত্ব থেকে সাংসদ, বিধায়ক থেকে পুরসভা — বহু স্তরের নেতারাই নিজেদের ক্রমশ প্রান্তিক বলে অনুভব করতে শুরু করেছেন।

এই অসন্তোষ কখনও প্রকাশ্যে এসেছে, কখনও চাপা পড়ে থেকেছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্য বিদ্রোহকে দমন করা গেলেও নীরব ক্ষোভকে চেনা কঠিন এবং সেটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

মমতা জানতেন, তবু পদক্ষেপ করেননি

দলের অনেক নেতার দাবি, এই ক্ষোভ সম্পর্কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবগত ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে বুথস্তর পর্যন্ত রাজনৈতিক খবর রাখার জন্য পরিচিত এই নেত্রীর পক্ষে দলের ভেতরের এই ক্ষোভ অজানা থাকার কথা নয়। কোন জেলার কোন নেতা কার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ, কোথায় কোন গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে — এসব তাঁর নজর এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয় বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।

তবু কোনও মৌলিক সংশোধনের পথে তিনি হাঁটেননি।

বিশ্বাসের রাজনীতি

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর ব্যাখ্যা খুঁজতে হলে মমতার মানসিক ও রাজনৈতিক জগৎকে একসঙ্গে বুঝতে হবে।

মমতার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর অবিশ্বাস। দীর্ঘ সংগ্রামের জীবনে বারবার বিশ্বাসঘাতকতার অভিজ্ঞতা তাঁকে সতর্ক করেছে, তাঁর চারপাশের বিশ্বস্ত বৃত্তকে ক্রমশ ছোট করেছে। সেই ছোট বৃত্তের একেবারে কেন্দ্রে ছিলেন অভিষেক।

দলের অন্য নেতারা দক্ষ বা জনপ্রিয় হলেও তাঁদের সম্পর্কে মমতার মনে সন্দেহ ছিল। অভিষেক সম্পর্কে ছিল না। রাজনীতিতে এই বিশ্বাসের মূল্য অনেক সময় সাংগঠনিক দক্ষতার থেকেও বেশি হয়ে ওঠে।

ফলে দলের ভেতর থেকে অভিষেকের প্রভাব কমানোর দাবি উঠলে মমতা বিষয়টিকে সাংগঠনিক প্রশ্ন হিসেবে নয়, ব্যক্তিগত আনুগত্যের প্রশ্ন হিসেবে দেখেছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

পরাজয়ের পরেও অপরিবর্তিত কাঠামো

নির্বাচনী পরাজয়ের পর দলের একটি বড় অংশের প্রত্যাশা ছিল, মমতা অন্তত প্রতীকী কিছু পদক্ষেপ নেবেন। সংগঠনের পুনর্গঠন হবে, নেতৃত্বের কাঠামোয় পরিবর্তন আসবে এবং অভিষেকের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারিত হবে।

কিন্তু বাস্তবে প্রায় কিছুই বদলায়নি। সংগঠনে এবং সংসদীয় দলে অভিষেকের অবস্থান অটুট থেকেছে। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট — পরাজয় হয়েছে, কিন্তু উত্তরাধিকার প্রশ্নাতীত।

দলের ক্ষুব্ধ অংশ তাতে বুঝে নিয়েছে, অভিযোগ করার কোনও লাভ নেই। নেতৃত্ব তাদের কথা শুনতে প্রস্তুত নয়। সেখান থেকেই শুরু হয়েছে বিচ্ছিন্নতা।

মমতার রাজনৈতিক হিসেব

প্রশ্ন উঠছে, মমতা কি পরিস্থিতিকে ভুল পড়েছিলেন? নাকি সবকিছু জেনেও সচেতনভাবে ঝুঁকি নিয়েছিলেন?

দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। হয়তো মমতার বিশ্বাস ছিল, দলকে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে গেলে কিছু অস্বস্তি অনিবার্য। হয়তো তিনি মনে করেছিলেন, সময়ের সঙ্গে বিরোধিতা থেমে যাবে। হয়তো তাঁর ধারণা ছিল, অভিষেককে দুর্বল করলে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্ন আরও জটিল হয়ে উঠবে।

তবে রাজনীতিতে নেতাদের বিচার উদ্দেশ্য দিয়ে নয়, ফলাফল দিয়ে হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

মমতার রাজনৈতিক চরিত্র বরাবরই ছিল স্বতন্ত্র। জওহরলাল নেহরু থেকে ইন্দিরা গান্ধী, করুণানিধি থেকে মুলায়ম সিং যাদব — রাজনীতিতে পারিবারিক উত্তরাধিকার নতুন নয়। কিন্তু মমতা নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পরিবারতন্ত্রের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা এক সংগ্রামী নেত্রী হিসেবে। তাঁর দলও দীর্ঘদিন সেই ভাবমূর্তিকেই রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করেছে।

সেই ভাবমূর্তি এবং বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে যে ফারাক তৈরি হয়েছে, তা-ই আজ তৃণমূলের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তৃণমূলের সংকট যদি আরও গভীর হয়, সংগঠনের ভাঙন যদি আরও স্পষ্ট হয়, তাহলে রাজনৈতিক ইতিহাস এই অধ্যায়কে সম্ভবত একটিই বাক্যে সংক্ষেপ করবে — মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে একসময় দল আর ভাইপোর মধ্যে বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল। তিনি ভাইপোকে বেছে নিয়েছিলেন। আর সেই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছিল দলকেই।