পুতিনের ‘রাশিয়ান দাভোস’-এর মাঝেই যুদ্ধ পৌঁছে গেল রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের দরজায়
হাইলাইটস
- সেন্ট পিটার্সবার্গ ও তার আশপাশে শতাধিক ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার দাবি রাশিয়ার।
- লক্ষ্যবস্তু ছিল নৌঘাঁটি, অস্ত্রাগার এবং জ্বালানি অবকাঠামো।
- হামলাকে “অভূতপূর্ব” বলে বর্ণনা করেছে রুশ কর্তৃপক্ষ।
- পুতিনের শান্তি-আলোচনা প্রত্যাখ্যানের পরেই এই আক্রমণ চালিয়েছে কিয়েভ।
- যুদ্ধ যে এখন রাশিয়ার গভীর অভ্যন্তরেও পৌঁছে গিয়েছে, এই হামলা তারই নতুন প্রমাণ।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চতুর্থ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর সংঘাতের চরিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় যেখানে যুদ্ধের প্রধান মঞ্চ ছিল ডনবাস, খারকিভ বা জাপোরিঝিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র, সেখানে এখন লড়াই পৌঁছে গিয়েছে রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহানগর সেন্ট পিটার্সবার্গের আকাশে।
সপ্তাহান্তে ইউক্রেন যে বৃহৎ ড্রোন হামলা চালিয়েছে, তাকে রুশ কর্তৃপক্ষ “অভূতপূর্ব” বলে অভিহিত করেছে। রাশিয়ার দাবি, কয়েকশো ড্রোন বিভিন্ন দিক থেকে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে হামলার চেষ্টা করে। এর মধ্যে সেন্ট পিটার্সবার্গ অঞ্চল এবং ফিনল্যান্ড উপসাগর সংলগ্ন সামরিক স্থাপনাগুলিই ছিল প্রধান লক্ষ্য।
হামলার ফলে শহরের বিভিন্ন অংশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। স্থানীয় প্রশাসন বাসিন্দাদের ঘরের ভিতরে থাকার পরামর্শ দেয় এবং কিছু এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাও সীমিত করা হয়। বিমান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, শত শত ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই সংখ্যা ১৪০ থেকে ৩৭৬ পর্যন্ত বলা হয়েছে। যদিও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এই সংখ্যাগুলির স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামলার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল এর প্রতীকী গুরুত্ব। সেন্ট পিটার্সবার্গ শুধু রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরই নয়, এটি প্রেসিডেন্ট Vladimir Putin-এর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একই সময়ে সেখানে চলছিল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্মেলন SPIEF, যাকে অনেকেই “রাশিয়ার দাভোস” বলে থাকেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী, কূটনীতিক এবং বিনিয়োগকারীরা যখন সম্মেলনে উপস্থিত, ঠিক তখনই এই ড্রোন হামলা মস্কোর জন্য এক বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউক্রেনের দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল বেসামরিক এলাকা নয়, বরং রুশ সামরিক অবকাঠামো। কিয়েভ জানিয়েছে যে ক্রনস্টাড্ট নৌঘাঁটি, রুশ নৌবাহিনীর অস্ত্রাগার এবং জ্বালানি সংরক্ষণ কেন্দ্রগুলিকে নিশানা করা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে একটি যুদ্ধজাহাজ এবং একটি বৃহৎ তেল টার্মিনালে আঘাত হানার কথাও বলা হয়েছে।
এই হামলা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট Volodymyr Zelenskyy সরাসরি আলোচনার জন্য পুতিনকে বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, বর্তমানে এমন বৈঠকের “কোনও অর্থ নেই”। তার পরপরই ইউক্রেনের এই বৃহৎ ড্রোন আক্রমণ শুরু হয়। কিয়েভের বক্তব্য, রাশিয়া আলোচনায় আগ্রহ না দেখালে যুদ্ধের মূল্য তাকে নিজের ভূখণ্ডেও দিতে হবে।
এই ঘটনাকে অনেক সামরিক বিশ্লেষক যুদ্ধের একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। গত এক বছরে ইউক্রেন ধারাবাহিকভাবে রাশিয়ার অভ্যন্তরে গভীর আঘাত হানার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। তেল শোধনাগার, বিমানঘাঁটি, গোলাবারুদ ভাণ্ডার এবং শিল্প কারখানাগুলি বারবার ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। এখন সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো কৌশলগত ও প্রতীকী শহরও আর নিরাপদ নয়—এই বার্তাই দিতে চাইছে কিয়েভ।
অন্যদিকে মস্কোও পাল্টা হামলা জোরদার করেছে। রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটছে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি আকাশযুদ্ধও ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গে এই ড্রোন হামলা শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়; এটি একটি রাজনৈতিক বার্তাও। ইউক্রেন দেখাতে চাইছে যে যুদ্ধ আর সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আটকে নেই। রাশিয়ার অর্থনীতি, সামরিক কাঠামো এবং জনমনের নিরাপত্তাবোধ—সবকিছুকেই এখন চ্যালেঞ্জ জানানো সম্ভব।
চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতের শেষ কোথায়, তা এখনও অজানা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ড্রোন প্রযুক্তি যুদ্ধের নিয়ম বদলে দিয়েছে। আর সেই বদলে যাওয়া যুদ্ধের অভিঘাত এখন রাশিয়ার ঐতিহাসিক রাজধানী সেন্ট পিটার্সবার্গের আকাশেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।