বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যের একটা জন্মদিন আছে। মহারাষ্ট্র জানে তার প্রতিষ্ঠা দিবস ১ মে। গুজরাটও জানে ১ মে-ই তার জন্ম। অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক, হরিয়ানা, ছত্তিশগড়—সকলেরই একটি নির্দিষ্ট দিন আছে যেদিন তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস স্মরণ করে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিষয়টা একটু অন্যরকম। এখানে প্রতিষ্ঠা দিবস নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই বোঝা যায়, রাজ্যের চেয়ে রাজ্যের বাসিন্দারাই বেশি বিভ্রান্ত। কেউ পয়লা বৈশাখের কথা বলেন, কেউ ২০ জুনের কথা বলেন, কেউ ১৫ আগস্টকে টেনে আনেন, আবার কেউ এমন ভাব করেন যেন পশ্চিমবঙ্গ আদৌ কোনওদিন প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং গঙ্গার পলিমাটির সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে গজিয়ে উঠেছে।

এই বিভ্রান্তির পেছনে কারণ আছে। পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি রাজ্য যার জন্ম কোনও উৎসবের মধ্যে হয়নি, কোনও বিজয়যাত্রার মধ্যে হয়নি, এমনকি কোনও সর্বসম্মত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যেও হয়নি। তার জন্ম হয়েছে এক ভয়াবহ জাতীয় সংকটের মধ্যে। তার জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, উদ্বাস্তু স্রোত, রাজনৈতিক দরকষাকষি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা। ফলে পশ্চিমবঙ্গের জন্মদিন নিয়ে আলোচনা মানেই অবধারিতভাবে সেই অস্বস্তিকর ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়া। আর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল, ইতিহাসকে যতটা ভালোবাসার দাবি করা হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি ভালোবাসা হয় ইতিহাসের সুবিধাজনক অংশগুলিকে।

সেই কারণেই পয়লা বৈশাখের ধারণাটি অনেকের কাছে আকর্ষণীয়। বাংলা নববর্ষ নিয়ে কারও আপত্তি নেই। এটি ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে বাঙালি পরিচয়ের এক সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নতুন খাতা খোলা, নতুন হিসাব শুরু করা, নতুন পোশাক, নতুন আশা—সব মিলিয়ে দিনটির আবেগময় আবেদন বিপুল। কিন্তু একটি সাংস্কৃতিক উৎসব এবং একটি রাজনৈতিক সত্তার প্রতিষ্ঠা দিবস যে এক জিনিস নয়, সেই সহজ কথাটাই মাঝেমধ্যে হারিয়ে যায়। বাংলা নববর্ষ অবশ্যই বাঙালির, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নয়। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যের আগে যেমন পয়লা বৈশাখ ছিল, পশ্চিমবঙ্গ না থাকলেও পয়লা বৈশাখ থাকত। বাংলাদেশের মানুষও পয়লা বৈশাখ পালন করেন, ত্রিপুরার বাঙালিরাও পালন করেন, লন্ডন-নিউইয়র্ক-সিডনির প্রবাসী বাঙালিরাও পালন করেন। ফলে এটি একটি সাংস্কৃতিক পরম্পরার দিন, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সত্তার জন্মদিন নয়।

অথচ গত কয়েক দশকে এমন একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে যেখানে ইতিহাসের বদলে প্রতীকের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়তে শুরু করেছে। রাজনৈতিক দলগুলি বুঝেছে যে ইতিহাস মানুষকে বিভক্ত করতে পারে, কিন্তু উৎসব মানুষকে একত্রিত করে। ইতিহাস প্রশ্ন তোলে, উৎসব প্রশ্নকে চাপা দেয়। ইতিহাস জিজ্ঞাসা করে কেন বাংলা ভাগ হয়েছিল, উৎসব জিজ্ঞাসা করে আজ কত মিষ্টি বিক্রি হল। ফলে যদি এমন একটি দিন বেছে নেওয়া যায় যার সঙ্গে বিতর্ক কম এবং আবেগ বেশি, তাহলে সেটি রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি লাভজনক। পয়লা বৈশাখ সেই অর্থে আদর্শ প্রার্থী। সেখানে দেশভাগের ভূত নেই, উদ্বাস্তুদের কান্না নেই, আইনসভার তর্ক নেই। আছে গান, কবিতা, আলপনা এবং ফেসবুকের শুভেচ্ছাবার্তা।

কিন্তু ইতিহাসের একটি অসুবিধাজনক অভ্যাস আছে। তাকে যতই সরিয়ে রাখা হোক, সে আবার ফিরে আসে। আর ফিরে এসে মনে করিয়ে দেয় যে পশ্চিমবঙ্গ নামের রাজনৈতিক সত্তাটির জন্মের সঙ্গে ১৯৪৭ সালের ২০ জুনের একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। সেদিন বঙ্গীয় আইনসভায় যে ভোটাভুটি হয়েছিল, তার ফলেই বাংলার পশ্চিমাংশের জন্য পৃথক একটি প্রদেশ গঠনের পথ সুগম হয়। সেই ভোট ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস কল্পনা করা যায় না। পশ্চিমবঙ্গ নামটি পরবর্তীকালে প্রশাসনিক রূপ পেয়েছে, আইনগত স্বীকৃতি পেয়েছে, কিন্তু তার রাজনৈতিক জন্মের সিদ্ধান্তের সূত্র খুঁজতে গেলে ২০ জুনকে এড়িয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

এই জায়গাতেই বিতর্কটি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কারণ ২০ জুনকে গ্রহণ করা মানে দেশভাগের ইতিহাসকে গ্রহণ করা। আর দেশভাগের ইতিহাসকে গ্রহণ করা মানে স্বীকার করা যে পশ্চিমবঙ্গ কোনও চিরন্তন ভৌগোলিক সত্য নয়, বরং একটি রাজনৈতিক আপস, একটি ঐতিহাসিক প্রয়োজন এবং একটি সংকটময় সময়ের সিদ্ধান্তের ফল। এই সত্যটি অনেকের কাছে অস্বস্তিকর। কারণ স্বাধীনতা উদ্‌যাপন করা সহজ, কিন্তু বিভাজনের স্মৃতি উদ্‌যাপন করা কঠিন। মানুষ বিজয়ের গল্প শুনতে ভালোবাসে, অস্তিত্ব রক্ষার গল্প নয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের জন্মকাহিনি ঠিক সেই দ্বিতীয় ধরনের গল্প।

মজার বিষয় হল, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অভিজাতদের একাংশ বহু বছর ধরে এমন এক বয়ান নির্মাণ করেছেন যেখানে দেশভাগ যেন একটি পার্শ্বচরিত্র। এই প্রবণতা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক নয়। প্রায় সব সমাজই নিজের অতীতকে কিছুটা অলংকৃত করে দেখতে চায়। কিন্তু অলংকরণ আর বিস্মরণের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে অনেক সময় মনে হয় আমরা অলংকরণের সীমা পেরিয়ে বিস্মরণের অঞ্চলে প্রবেশ করেছি।

সেই কারণেই প্রতিষ্ঠা দিবসের বিতর্কটি কেবল একটি তারিখ বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নয়। এটি আসলে পশ্চিমবঙ্গ নিজের সম্পর্কে কী মনে করতে চায়, সেই প্রশ্ন। সে কি নিজেকে প্রধানত একটি সাংস্কৃতিক ধারণা হিসেবে দেখতে চায়, যার প্রতীক পয়লা বৈশাখ? নাকি সে নিজেকে একটি রাজনৈতিক সত্তা হিসেবেও দেখতে রাজি, যার জন্মের সঙ্গে ২০ জুনের মতো একটি জটিল, বিতর্কিত এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দিন জড়িয়ে আছে? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। তবে বিতর্ক যতই চলুক, ইতিহাসের দলিলগুলি কিন্তু আজও ১৯৪৭ সালের সেই জুন মাসের দিকেই আঙুল তুলে থাকে।

পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা দিবস নিয়ে বিতর্কে সবচেয়ে মজার বিষয় হল, এই বিতর্কে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই যেন আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন তাঁরা কোন তারিখ চান, তারপর সেই সিদ্ধান্তের সমর্থনে ইতিহাস খুঁজতে বেরিয়েছেন। সাধারণত ইতিহাসচর্চার নিয়মটা উল্টো। আগে নথি দেখা হয়, ঘটনাক্রম দেখা হয়, তারপর সিদ্ধান্তে পৌঁছনো হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ইতিহাসের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক বহুদিন ধরেই এমন যে, এখানে ইতিহাসকে প্রায়ই সাক্ষী নয়, উকিলের ভূমিকায় নামতে হয়। তাকে বলা হয়, “আপনি আমাদের পক্ষে সওয়াল করুন।” ফলে প্রতিষ্ঠা দিবসের প্রশ্নেও দেখা যাচ্ছে, একদল মানুষ পয়লা বৈশাখকে চাইছেন কারণ সেটি আনন্দময়, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ; অন্যদিকে ২০ জুনের সমর্থকেরা বলছেন, জন্মদিন যদি হয়, তবে সেটি জন্মের ইতিহাসের সঙ্গেই যুক্ত হতে হবে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে পার্থক্যটি কেবল তারিখের নয়; এটি আসলে পশ্চিমবঙ্গ নিজের অতীতকে কীভাবে দেখতে চায়, সেই প্রশ্নেরও পার্থক্য।

পয়লা বৈশাখকে প্রতিষ্ঠা দিবস করার পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হল, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের দিন। কথাটা শুনতে ভালো লাগে। এতটাই ভালো লাগে যে শুনতে শুনতে অনেকে ভুলেই যান, সাংস্কৃতিক পরিচয় আর রাজনৈতিক সত্তা এক জিনিস নয়। বাংলা ভাষা পশ্চিমবঙ্গের আগে ছিল, পশ্চিমবঙ্গের পরেও থাকবে। বাংলা সাহিত্য, বাংলা গান, বাংলা নববর্ষ—এসবের ইতিহাস পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেক পুরোনো। পয়লা বৈশাখ পালন করেছেন এমন মানুষও ছিলেন, যাঁদের জন্মের সময় পশ্চিমবঙ্গ বলে কোনও রাজ্যের অস্তিত্বই ছিল না। ফলে পয়লা বৈশাখকে পশ্চিমবঙ্গের জন্মদিন বলা অনেকটা এমন, যেন কেউ নিজের জন্মদিনের বদলে পরিবারের সবচেয়ে প্রিয় উৎসবটিকে জন্মদিন ঘোষণা করে দেন। এতে উৎসবের মর্যাদা কমে না, কিন্তু জন্মদিনের অর্থটাই বদলে যায়।

এই জায়গাতেই ২০ জুনের প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়। ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় আইনসভায় যে ভোটাভুটি হয়েছিল, সেটি নিছক একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ছিল না। সেই ভোটের মধ্য দিয়েই কার্যত স্থির হয়ে যায় যে বাংলা আর এক থাকবে না। পূর্ব বাংলা অন্য পথে যাবে, পশ্চিম বাংলা অন্য পথে। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ নামের যে রাজনৈতিক সত্তাটি পরবর্তীকালে ভারতের একটি রাজ্যে পরিণত হয়, তার জন্মের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ওই দিনেই গৃহীত হয়েছিল। ইতিহাসের বিচারে এই তথ্যটি অস্বীকার করা কঠিন। কিন্তু সমস্যাটা ইতিহাসে নয়, সমস্যাটা স্মৃতিতে। কারণ ২০ জুনকে স্বীকার করা মানে দেশভাগকে স্বীকার করা। আর দেশভাগকে স্বীকার করা মানে এমন এক আয়নার সামনে দাঁড়ানো, যেখানে বাঙালি সমাজ নিজের সবচেয়ে অস্বস্তিকর মুখটি দেখতে পায়।

দেশভাগ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মনোভাব বরাবরই কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। পাঞ্জাবে দেশভাগের স্মৃতি রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় অনেক বেশি উপস্থিত। পশ্চিমবঙ্গে দেশভাগের অভিঘাত কম ছিল না, বরং দীর্ঘস্থায়ী ছিল। লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু সীমান্ত পেরিয়ে এসেছেন, নতুন কলোনি গড়ে উঠেছে, শহর ও গ্রাম বদলে গেছে, অর্থনীতি বদলে গেছে, সমাজের শ্রেণিবিন্যাস বদলে গেছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে পশ্চিমবঙ্গের মূলধারার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কথোপকথনে দেশভাগের আলোচনা বহু সময়েই প্রান্তিক থেকে গেছে। যেন এটি এমন একটি ঘটনা, যার কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো। ফলত পশ্চিমবঙ্গের জন্মের ইতিহাসও এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতার মধ্যে ঢেকে গেছে। সবাই ফলাফলটি নিয়ে কথা বলতে রাজি, কিন্তু ফলাফলের কারণ নিয়ে নয়।

এই প্রবণতার পেছনে রাজনৈতিক কারণও কম নেই। কারণ পশ্চিমবঙ্গের জন্মকাহিনি নিয়ে যত গভীরে যাওয়া যায়, ততই কঠিন প্রশ্ন উঠে আসে। বাংলাভাগের দাবি কারা তুলেছিলেন? কেন তুলেছিলেন? তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী ছিল? কোন কোন আশঙ্কা মানুষকে বিভাজনের পক্ষে ঠেলে দিয়েছিল? কেন এত বড় একটি ভূখণ্ড শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে থাকতে পারল না? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গেলে আবেগের জায়গা দ্রুত সঙ্কুচিত হয়ে আসে এবং ইতিহাসের কঠিন বাস্তবতা সামনে চলে আসে। আধুনিক রাজনীতি সাধারণত এই ধরনের জটিল আলোচনায় খুব স্বচ্ছন্দ নয়। কারণ জটিল ইতিহাস ভোটে রূপান্তর করা কঠিন, কিন্তু সরল আবেগকে ভোটে রূপান্তর করা অনেক সহজ।

তাই পয়লা বৈশাখের ধারণাটি রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি আরামদায়ক। সেখানে দাঙ্গা নেই, উদ্বাস্তু নেই, রক্তপাত নেই, বিভাজন নেই। আছে সংস্কৃতি, গান, কবিতা, উৎসব এবং একটি সর্বজনগ্রাহ্য আবেগ। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন জাগে, একটি প্রতিষ্ঠা দিবস কি কেবল আনন্দদায়ক হওয়ার জন্যই নির্বাচন করা উচিত? যদি তাই হয়, তবে ইতিহাসের প্রয়োজন কী? তাহলে তো কোনও রাজ্য তার প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে এমন কোনও দিনও বেছে নিতে পারে, যেদিন সবচেয়ে বেশি মিষ্টি বিক্রি হয় বা সবচেয়ে বেশি মানুষ আনন্দ করে। কিন্তু রাষ্ট্রের স্মৃতি সাধারণত এভাবে তৈরি হয় না। রাষ্ট্র তার গৌরব যেমন মনে রাখে, তেমনই তার জন্মের বেদনাও মনে রাখে। কারণ পরিণত সমাজ জানে, ইতিহাস কেবল বিজয়ের গল্প নয়; ইতিহাস অনেক সময় ক্ষতচিহ্নের গল্পও।

পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা দিবস বিতর্কে তাই আসল প্রশ্নটি পয়লা বৈশাখ বনাম ২০ জুন নয়। আসল প্রশ্ন হল, পশ্চিমবঙ্গ কি নিজের ইতিহাসকে তার সম্পূর্ণতা নিয়ে গ্রহণ করতে প্রস্তুত? কারণ ২০ জুনকে স্বীকার করা মানে কেবল একটি তারিখকে স্বীকার করা নয়; এর অর্থ হল স্বীকার করা যে পশ্চিমবঙ্গ একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সংকটের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে। তার জন্ম কোনও পৌরাণিক কাহিনি নয়, কোনও সাংস্কৃতিক উৎসব নয়, বরং একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল। সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যেমন বেদনা জড়িয়ে আছে, তেমনই জড়িয়ে আছে আত্মরক্ষার তাগিদ, ভবিষ্যৎ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা এবং নতুন এক রাজনৈতিক সত্তা গড়ে তোলার চেষ্টা।

সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গটা সম্ভবত এখানেই। পশ্চিমবঙ্গ এমন এক রাজ্য, যেখানে ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে সবাই ভালোবাসে। এখানে চায়ের দোকান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার—সব জায়গাতেই ইতিহাসের বিচার বসে। কিন্তু নিজের জন্মের ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গেলেই অদ্ভুত সংকোচ দেখা দেয়। যেন পশ্চিমবঙ্গ নিজেই নিজের জন্মসনদ দেখে একটু অস্বস্তি বোধ করে। ফলে কখনও পয়লা বৈশাখ, কখনও অন্য কোনও তারিখ, কখনও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কথা, কখনও আবেগের কথা সামনে আনা হয়। কিন্তু ইতিহাস বারবার একই জায়গায় ফিরে যায়। সে মনে করিয়ে দেয় যে পশ্চিমবঙ্গের জন্মের সঙ্গে ২০ জুনের সম্পর্ক ঘটনাচক্রের নয়, মৌলিক।

তাই প্রতিষ্ঠা দিবস যদি সত্যিই রাখতে হয়, তাহলে প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত খুব জটিল নয়। পয়লা বৈশাখকে বাংলা সংস্কৃতির মহোৎসব হিসেবে যত সম্মান দেওয়া সম্ভব, দেওয়া উচিত। সেটি বাঙালির নববর্ষ, বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐক্যের দিন, বাঙালির আবেগের দিন। কিন্তু একটি রাজনৈতিক সত্তার প্রতিষ্ঠা দিবস নির্ধারণ করতে গেলে আবেগের পাশাপাশি ইতিহাসকেও সাক্ষ্য দিতে ডাকা প্রয়োজন। আর ইতিহাসের সাক্ষ্য যদি শোনা হয়, তাহলে ২০ জুনের দাবি উপেক্ষা করা কঠিন।

অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে যাঁদের সামান্য ধারণা আছে, তাঁরা জানেন যে এখানে ইতিহাসের চেয়ে ইতিহাসের ব্যবহার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আগামী দিনেও এই বিতর্ক চলবে। কেউ বলবেন সংস্কৃতি বড়, কেউ বলবেন রাজনীতি বড়, কেউ বলবেন আবেগ বড়। কিন্তু সমস্ত তর্ক-বিতর্কের শেষে ইতিহাস সম্ভবত নিঃশব্দে একটি কথাই বলে যাবে—পয়লা বৈশাখ পশ্চিমবঙ্গের আত্মার উৎসব হতে পারে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের জন্মের ইতিহাস খুঁজতে গেলে শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতেই হবে ১৯৪৭ সালের সেই ২০ জুনে, যেদিন প্রথমবারের মতো ভবিষ্যতের পশ্চিমবঙ্গ নিজের অস্তিত্বের দিকে এক নির্ণায়ক পদক্ষেপ নিয়েছিল।