খবর

শরিফকে কড়া জবাব জয়শঙ্করের

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • পাকিস্তান বা তার প্রধানমন্ত্রীর নাম উল্লেখ না করেই ভারতের বিদেশমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি—সন্ত্রাসকে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করার কিংবা তার পরিণতি থেকে রেহাই পাওয়ার চেষ্টা মেনে নেওয়া…
  • পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ রাষ্ট্রপুঞ্জে কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুলে ভারতের সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তকে ‘যুদ্ধ ঘোষণার শামিল’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
  • তার পরদিনই পাল্টা জবাব দিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

পাকিস্তান বা তার প্রধানমন্ত্রীর নাম উল্লেখ না করেই ভারতের বিদেশমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি—সন্ত্রাসকে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করার কিংবা তার পরিণতি থেকে রেহাই পাওয়ার চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ রাষ্ট্রপুঞ্জে কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুলে ভারতের সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তকে ‘যুদ্ধ ঘোষণার শামিল’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। তার পরদিনই পাল্টা জবাব দিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। শনিবার রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় পাকিস্তানকে ‘ধারাবাহিক ভাবে সন্ত্রাস চালিয়ে যাওয়া’ দেশ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানিয়ে দিলেন, সন্ত্রাসকে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করা এবং তার পরিণতি থেকে দায়মুক্তি দাবি করার চেষ্টা সফল হবে না। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে ভারত।

নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার ৮১তম অধিবেশনে শরিফের বক্তব্যের কড়া জবাব দিতে গিয়ে জয়শঙ্কর তাঁর নাম উল্লেখ না করেই বলেন, “গতকাল ধারাবাহিকভাবে সন্ত্রাস চালিয়ে যাওয়া একটি দেশ এই সভার সামনে তথ্য বিকৃত করেছে। সন্ত্রাসকে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করতে এবং তার পরিণতি থেকে দায়মুক্তি দাবি করতে নানা যুক্তি হাজির করা হয়েছে। তা মেনে নেওয়া হবে না।”

তিনি বলেন, “সন্ত্রাসের অভিশাপ শান্তির সামনে এক অবিরাম বিপদ। সীমান্তের ওপারে সন্ত্রাস চালানোর উদ্দেশ্যে যখন রাষ্ট্রই তার মদতদাতা হয়, তখন তা বিশ্বব্যবস্থার প্রতি সরাসরি অবমাননা হয়ে দাঁড়ায়। যে সব সরকার এই ধরনের কাজে লিপ্ত, তাদের জবাবদিহির মুখে দাঁড় করাতেই হবে।”

এই ধরনের রাষ্ট্রকে দায়বদ্ধ করার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক সমাজের, জানান বিদেশমন্ত্রী। তাঁর কথায়, “সন্ত্রাসকে কোনও ভাবেই বরদাস্ত না করার নীতিতে বিন্দুমাত্র শিথিলতা চলবে না। বিশেষ করে সন্ত্রাসের অর্থ জোগানের দিকগুলি প্রকাশ্যে আনতে হবে এবং তা প্রতিহত করতে হবে।”

ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করে জয়শঙ্কর বলেন, “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার যে অধিকার আমাদের রয়েছে, তা আমরা প্রয়োগ করব। বন্ধুত্ব ও সদিচ্ছার সঙ্গে সন্ত্রাস পাশাপাশি চলতে পারে না। ফলে বন্ধুত্ব ও সদিচ্ছার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বোঝাপড়াগুলিও স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়বে।” তাঁর বক্তব্য, “যারা সন্ত্রাস চালায়, নিজেদের আচরণ সংশোধন করার দায়িত্ব তাদেরই।”

‘ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের পক্ষ থেকে নমস্কার’ জানিয়ে বক্তৃতা শুরু করেন জয়শঙ্কর। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে যুদ্ধ ও সংঘাতই বিশ্বের প্রধান উদ্বেগ হয়ে রয়েছে।

তাঁর কথায়, “শান্তি বজায় রাখতে না পারার ব্যর্থতা শুধু নিরাপত্তাকেই দুর্বল করছে না, অগ্রগতিকে বিপন্ন করছে, উন্নয়নের গতিও রুদ্ধ করছে।” বিশ্বায়িত দুনিয়ায় যুদ্ধের প্রভাব যে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে, সে কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি।

“যে সব দেশ সংঘাত থেকে বহু দূরে, কোনও দোষ না করেও তাদের খেসারত দিতে হচ্ছে। অনেক সময় যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদেরই কথা সবচেয়ে কম শোনা যায়,” বলেন জয়শঙ্কর। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এবং ইজরায়েল-গাজা সংঘর্ষের প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইন—দুই পৃথক রাষ্ট্রের ভিত্তিতে সমাধানের উপরও জোর দেন।

বিদেশমন্ত্রী বলেন, “আমাদের বুঝতে হবে, শুধু যুদ্ধ না থাকলেই শান্তি থাকে না। বিশ্বকে যদি ক্রমাগত হুমকি ও চাপের মধ্যে রাখা হয়, তা হলে আমরা আসলে অতল খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে রয়েছি।” তাঁর সতর্কবার্তা, “আর একটি পদক্ষেপই আমাদের সেই খাদে ঠেলে দিতে পারে।”

স্থিরতা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চয়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান জয়শঙ্কর। তাঁর বক্তব্য, “এর যে কোনও একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে শান্তি অনিবার্য ভাবেই দুর্বল হবে।”

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বৃহত্তর পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমরা আসলে দেখছি, সব কিছুকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। চরম প্রতিযোগিতার এক মানসিকতা গেড়ে বসেছে। তাতে প্রতিষ্ঠানগুলি দুর্বল হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে এমন সব বাধা, যা দিয়ে অন্যের গতিপথ আটকে দেওয়া যায়। অর্থজগৎ থেকে শুরু করে বাজারে প্রবেশের সুযোগ সংকুচিত করা, সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করা এবং প্রযুক্তি আটকে রাখা—সর্বত্রই এই প্রবণতা। বিশেষ করে সম্পদ ও যোগাযোগব্যবস্থাকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার করা হচ্ছে।”

এর দু’দিন আগেই রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কেনা দেশগুলিকে শাস্তি দেওয়ার নতুন মার্কিন আইন নিয়ে ভারতের উদ্বেগ জানিয়েছিলেন জয়শঙ্কর। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরে আইনে পরিণত হওয়া ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম রাশিয়া ও ইরান নিষেধাজ্ঞা আইন’ অনুযায়ী, রুশ জ্বালানি কেনার জন্য ভারত ও চিন-সহ ক্রেতা দেশগুলির উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা পেয়েছে আমেরিকা। অপরিশোধিত তেলের চাহিদার ৮৮ শতাংশেরও বেশি মেটাতে ভারত আমদানির উপর নির্ভরশীল। বর্তমানে সেই আমদানির প্রায় অর্ধেকই আসে রাশিয়া থেকে।

জয়শঙ্কর বলেন, এই ধরনের পদক্ষেপের ফলে “দেশগুলি এখন ঝুঁকি কমানো এবং বিকল্প বাড়ানোর দিকে বেশি মন দিচ্ছে।” বিশেষত বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলির সংকট অত্যন্ত তীব্র। তাঁর কথায়, এই দেশগুলি চারটি ক্ষেত্রে নিরাপত্তার সংকটে ভুগছে—খাদ্য, জ্বালানি, সার এবং অর্থের সংস্থান।

বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাকেও ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে বর্ণনা করেন বিদেশমন্ত্রী। হরমুজ প্রণালী ও কৃষ্ণসাগরে বিভিন্ন পক্ষের হামলায় ভারতের দশ জনেরও বেশি নাবিকের মৃত্যু হয়েছে।

তিনি বলেন, “স্থলভাগের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলির সঙ্গে সমুদ্রপথে নতুন বিপদও যুক্ত হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে এবং লোহিত সাগর থেকে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের উপর হামলা হয়েছে।” হতাহতদের মধ্যে ভারতীয় নাবিকেরাও রয়েছেন।

জয়শঙ্করের বক্তব্য, “আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও যাত্রীবাহী নৌযানকে নিশানা করা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। সমস্ত পক্ষের কাছে ভারতের আহ্বান—সংযম দেখান, উত্তেজনা কমান, সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করুন এবং জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্য চলাচল অব্যাহত রাখুন।”

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্য উল্লেখ করে বিদেশমন্ত্রী বলেন, “অন্তহীন যুদ্ধের বদলে এখন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে।” শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যে উদ্যোগগুলি চলছে, ভারত সেগুলিকে সমর্থন করে বলেও জানান তিনি।

তাঁর কথায়, “এই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে ভারত সাধ্যের মধ্যে সবকিছু করতে প্রস্তুত। বিশেষ করে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে।”

বক্তৃতার শেষে মহাত্মা গান্ধীর বাণী উদ্ধৃত করেন জয়শঙ্কর। তিনি বলেন, “এই ভবনের বাইরের সবুজ প্রাঙ্গণে মহাত্মা গান্ধীর শক্তিশালী বাণী খোদাই করা রয়েছে। এই সময়ে সেই কথাগুলিই আমাদের প্রেরণা জোগাক। কথাগুলি হল—‘শান্তিতে পৌঁছনোর কোনও পথ নেই; শান্তিই পথ।’”

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles