দাসত্বের খাতায় এবার শিকড়ের খোঁজ, অনলাইনে প্রায় ৪০ লক্ষ নথি

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ারঃ ব্রিটেনের ২০টি প্রাক্তন উপনিবেশে দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি মানুষের জীবনসংক্রান্ত প্রায় ৪০ লক্ষ নথি এই প্রথম অনলাইনে খুঁজে দেখার সুযোগ মিলছে।
- বংশের ইতিহাস অনুসন্ধানে সাহায্য করে যে সংস্থা, সেই ‘অ্যানসেস্ট্রি’ নথিগুলিকে বৈদ্যুতিন রূপ দিয়েছে এবং অনুসন্ধানের উপযোগী করে সূচিবদ্ধ করেছে।
- এই কাজে তাদের সহযোগী ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ব্রিটিশ দাসপ্রথার উত্তরাধিকার নিয়ে গবেষণাকেন্দ্র।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ারঃ ব্রিটেনের ২০টি প্রাক্তন উপনিবেশে দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি মানুষের জীবনসংক্রান্ত প্রায় ৪০ লক্ষ নথি এই প্রথম অনলাইনে খুঁজে দেখার সুযোগ মিলছে।
বংশের ইতিহাস অনুসন্ধানে সাহায্য করে যে সংস্থা, সেই ‘অ্যানসেস্ট্রি’ নথিগুলিকে বৈদ্যুতিন রূপ দিয়েছে এবং অনুসন্ধানের উপযোগী করে সূচিবদ্ধ করেছে। এই কাজে তাদের সহযোগী ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ব্রিটিশ দাসপ্রথার উত্তরাধিকার নিয়ে গবেষণাকেন্দ্র।
ব্রিটিশ দাসপ্রথার যে বিপুল নথিভান্ডার আজও টিকে আছে, তার অন্যতম বৃহৎ এই সংগ্রহ। আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত ক্যারিবীয় মানুষ এবং বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা আফ্রিকীয় জনগোষ্ঠীর লক্ষ লক্ষ উত্তরসূরির সামনে নিজেদের পারিবারিক ইতিহাস খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা খুলে দিচ্ছে এটি।
সংগ্রহটির নাম ‘প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশগুলিতে দাসত্বে আবদ্ধ মানুষের নিবন্ধন খাতা’। প্রায় তিন লক্ষ পাতার এই সংগ্রহে রয়েছে ১৮১৩ থেকে ১৮৪০ সালের নথি। বাহামাস, বার্বাডোস, দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ, জামাইকা, মরিশাস ও ত্রিনিদাদ-সহ ব্রিটেনের অধীনস্থ বিভিন্ন ভূখণ্ডে দাসত্বে বন্দি মানুষের বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে সেখানে।
১৮০৭ সালে আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে দাসব্যবসা নিষিদ্ধ হওয়ার পরে ব্রিটিশ সরকার এই খাতাগুলি চালু করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের বেআইনি কেনাবেচা ঠেকানো এবং দাসত্বে আবদ্ধ জনসংখ্যার হিসাব রাখা।
গবেষকেরা বলছেন, এক শিউরে ওঠার মতো নিখুঁত হিসাবের মধ্যে বেঁধে ফেলা হয়েছিল মানুষগুলিকে। নাম, বয়স, চেহারার বিবরণ, পারিবারিক সম্পর্কের পাশাপাশি লেখা থাকত জন্ম, মৃত্যু এবং ‘মালিকানা’ বদলের তথ্য। কোনও কোনও নথিতে আলাদা করে জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট মানুষটির জন্ম আফ্রিকায়, না ক্যারিবীয় অঞ্চলে।
পেশাদার বংশানুসন্ধানী নিকা স্যুয়েল-স্মিথ অ্যানসেস্ট্রিতে কাহিনি নির্মাণের দায়িত্বে থাকা এক জ্যেষ্ঠ প্রযোজক। তাঁর কাছে বিষয়টির তাৎপর্য গভীর। মানুষকে সম্পত্তি হিসেবে গুনে রাখার জন্য যে নথি তৈরি হয়েছিল, আজ সেই নথি থেকেই তাঁদের বংশধরেরা নিজেদের পরিবারের হারানো ইতিহাস উদ্ধার করছেন।
তাঁর কথায়, “দাসত্বে বন্দি আমার পূর্বপুরুষদের খুঁজে বার করতে যখন এই নথি ব্যবহার করি, তখন তার আদি উদ্দেশ্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি কাজে তাকে লাগাই। আমাদের এই উদ্যোগ সেই মানুষটিকে তাঁর মানবিক মর্যাদা ফিরিয়ে দিচ্ছে।”
কোনও কোনও ক্ষেত্রে তথ্যের খুঁটিনাটি বিস্ময়কর। স্যুয়েল-স্মিথ বলেন, “দাসত্বের মধ্যে জন্মানো একটি শিশুর জন্মদিনও নির্ভুল ভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব।”
নথিগুলিকে বৈদ্যুতিন রূপ দেওয়ায় পারিবারিক ইতিহাস অনুসন্ধানের একটি বাস্তব বাধাও দূর হচ্ছে। এত দিন লন্ডনের জাতীয় মহাফেজখানায় রাখা খাতাপত্র ঘেঁটে কী ভাবে তথ্য বার করতে হয়, তা জানা প্রয়োজন ছিল। স্যুয়েল-স্মিথ জানাচ্ছেন, এখন উত্তরসূরিরা শুধু একটি নাম লিখেই এই সংগ্রহে খোঁজ চালাতে পারবেন।
তিনি বলেন, “এই নথিভান্ডারে যাঁদের উল্লেখ রয়েছে, তাঁদের উত্তরসূরি হিসেবে আজ হয়তো লক্ষ লক্ষ মানুষ বেঁচে রয়েছেন। অনেক সময় দাসত্বের ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের সম্পর্ক অস্বীকার করতে এমন একটা ধারণা দেওয়া হয়, যেন ওই মানুষগুলির সঙ্গে যোগ রয়েছে এমন কেউ আজ আর বেঁচে নেই। এই ধারণা গোড়া থেকেই ভুল।”
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ওই গবেষণাকেন্দ্রের অধিকর্তা অধ্যাপক ম্যাথিউ জে স্মিথের মতে, ব্রিটিশ ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং বৃহত্তর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক জগতে দাসত্বের ইতিহাস সম্পর্কে যত নথি পাওয়া যায়, তার মধ্যে এই খাতাগুলিই “সবচেয়ে সুশৃঙ্খল ও ধারাবাহিক সংগ্রহ”।
গত সপ্তাহেই প্রকাশিত হয়েছে ‘ব্রিটিশ দাসব্যবসায়ীদের নামপঞ্জি’। তিন বছরের গবেষণায় তৈরি সেই নামপঞ্জি দেখিয়েছে, আটলান্টিক পেরিয়ে আফ্রিকার মানুষকে পাচারের ব্যবসায় ব্রিটেনের অংশগ্রহণ কতটা ব্যাপক ছিল। প্রায় আড়াইশো বছর ধরে এই ব্যবসায় অর্থ লগ্নি করেছিলেন, এমন প্রায় ১০ হাজার ৫০০ জনকে চিহ্নিত করেছে ওই গবেষণা। তার পরেই প্রকাশ্যে এল এই নতুন সংগ্রহ।
এ দিকে ইতিহাসচর্চার অভিমুখ বদলানোর দাবিও ক্রমে জোরালো হচ্ছে। যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মানুষকে সম্পত্তি হিসেবে দখলে রেখেছিল, পাচার করেছিল কিংবা দাসত্বের ব্যবস্থাটি পরিচালনা করেছিল, গবেষণার কেন্দ্রে এত দিন মূলত তারাই থেকেছে। এ বার দাসত্বের শিকার মানুষগুলির নিজেদের জীবনকে সামনে আনার কথা বলছেন অনেকে।
স্মিথ বলেন, “ব্রিটিশ দাসপ্রথার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অংশ হল দাসত্বে বন্দি মানুষের অভিজ্ঞতা। আবার এই অংশটি সম্পর্কেই আমাদের ভুল বোঝাবুঝি সবচেয়ে বেশি।”
তাঁর মতে, ‘টি৭১’ সংগ্রহ সেই পরিস্থিতি বদলাতে পারে। জাতীয় মহাফেজখানায় যে নথিশ্রেণির অধীনে খাতাগুলি রাখা আছে, তার নাম থেকেই এই পরিচয়।
স্মিথের কথায়, “যখন আপনি ওই মানুষগুলির নাম দেখতে শুরু করেন, তাঁদের বয়স জানতে পারেন, তাঁদের সন্তানদের কথা জানতে পারেন, তাঁদের জীবনের এমন সূক্ষ্ম কিছু ঝলক চোখে পড়ে—তখন গোটা ব্যবস্থাটিকে বোঝার ধরনই বদলে যায়।”
এই নথির সাহায্যে গবেষকেরা উদ্ধার করতে শুরু করতে পারবেন “পরিবারের কাহিনি, জনগোষ্ঠীর কাহিনি, টিকে থাকার কাহিনি, প্রতিরোধের কাহিনি এবং স্বাধীনতার সন্ধানের কাহিনি”।
স্মিথ জানান, জামাইকা নিয়ে গবেষণায় তাঁরা ইতিমধ্যেই এই তথ্য ব্যবহার করে দেখছেন। কয়েকটি পরিবারের ছয় প্রজন্ম পর্যন্ত বংশসূত্র অনুসরণ করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, “কাজটি বিপুল ধৈর্য ও পরিশ্রমের। কিন্তু যা পাওয়া যাচ্ছে, তার মূল্যও অসাধারণ। ক্যারিবীয় অঞ্চলে এবং সারা বিশ্বের আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর মধ্যে যাঁরা দাসত্বে বন্দি মানুষের উত্তরসূরি, তাঁরা সম্পূর্ণ নতুন ভাবে বুঝতে পারবেন—তাঁদের পারিবারিক উত্তরাধিকার কী ভাবে ক্যারিবীয় অঞ্চলে পৌঁছেছিল এবং দাসত্বের মধ্যেও টিকে ছিল।”
স্যুয়েল-স্মিথের কাছে এই নথিভান্ডারের সম্ভাবনা ব্রিটেন ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে আরও বহুদূর বিস্তৃত।
দাসত্বের সময়ে মানুষকে জোর করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানো হয়েছিল। পরে ঘটেছে অভিবাসনও। ফলে তাঁদের উত্তরসূরিরা আজ আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত মানুষের বিস্তৃত জগতে ছড়িয়ে রয়েছেন—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত।
তিনি বলেন, “যে সম্ভাবনাটি আমাকে বিশেষ ভাবে উৎসাহিত করছে, তা হল—বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা আমাদের পারস্পরিক যোগসূত্র কত গভীর হতে পারে। যেন পৃথিবীটা আরও ছোট হয়ে আসবে। আমাদের এমন ভাবে কাছাকাছি নিয়ে আসবে, যা হয়তো আমরা কখনও কল্পনাও করিনি।”
তাঁর মতে, সংগ্রহটি এতই বিশাল যে এর সম্পূর্ণ সম্ভাবনা সম্ভবত এখনই বোঝা যাবে না। উত্তরসূরি ও গবেষকেরা যখন অন্য নথিভান্ডারের সঙ্গে এই তথ্য মিলিয়ে দেখতে শুরু করবেন, তখনই তা ক্রমে স্পষ্ট হবে।
স্মিথ বলেন, “আমরা এক নতুন পরিসরে, এক নতুন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি। এই নথির মুখোমুখি হওয়া যতই যন্ত্রণার হোক, মানুষগুলির উত্তরসূরিদের কথা ভেবে আমি ততটাই আশাবাদী। এখন তাঁদের পক্ষে এই তথ্য পাওয়া, কাজে লাগানো এবং পূর্বপুরুষদের সঙ্গে যোগসূত্র গড়ে তোলার সুযোগ আরও বেড়েছে।”
অ্যানসেস্ট্রিতে একটি ব্যবহারকারী-অ্যাকাউন্ট খুললেই যে কেউ বিনা খরচে এই সংগ্রহে অনুসন্ধান করতে পারবেন।
১৮১৭ সালের একটি নথির নমুনা
জামাইকার ন্যাথানিয়েল পিয়ার্স রাগলেসের ১৮১৭ সালে দাখিল করা বিবরণীতে দেখা যায়, কী ভাবে সাজানো হত এই হিসাব। সেখানে ছিল বিবরণী দাখিলকারীদের নাম ও পদমর্যাদা, দাখিলের তারিখ, তথ্য লেখার নির্দিষ্ট ঘর এবং দাসত্বে আবদ্ধ মানুষের মোট সংখ্যা।
নামের জায়গায় প্রায়ই থাকত শুধু একটি ‘দাসনাম’। তবে এই নথিতে অধিকাংশ মানুষের পুরনো ও নতুন—দু’টি নামই রয়েছে। গবেষকের পক্ষে অতীতের সূত্র ধরে পিছিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গায়ের রঙের জন্য ছিল নানা শ্রেণিবিভাগ, যার মাধ্যমে মাপা হত কৃষ্ণবর্ণের তারতম্য। বয়স সাধারণত লেখা হত প্রচলিত ধারণা বা অনুমানের ভিত্তিতে; সংশ্লিষ্ট কৃষিজমিদারিতে জন্মানো শিশুদের ক্ষেত্রে অবশ্য নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যেত। মানুষটি আফ্রিকায় জন্মেছেন, না স্থানীয় ভাবে জন্মানো ‘ক্রিয়োল’—তা-ও উল্লেখ থাকত। জামাইকার নথিতে ‘মন্তব্য’ অংশে সাধারণত লেখা থাকত মায়ের পরিচয়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



