‘বন্দে’তেই বিপাকে কংগ্রেস

যা জানা জরুরি
- ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রথম দুই স্তবকই দলীয় অনুষ্ঠানে গাওয়া হবে—কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির এই সিদ্ধান্ত ঘিরে এবার দলের অন্দরেই অস্বস্তির সুর।
- একাংশের নেতার মতে, ইতিহাস ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে দলের যুক্তি থাকলেও বিজেপির সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ময়দান—জাতীয়তাবাদে—পা দিয়ে কংগ্রেস কার্যত নিজেদের জন্যই বিপদ ডেকে এনেছে।
- তাঁদের প্রশ্ন, এমন বিতর্কে না গিয়ে ছাত্র-যুবদের দাবি, অযোধ্যার রামমন্দিরের অনুদান নিয়ে অভিযোগ, বেকারত্ব কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে অন্য রাজনৈতিক ইস্যুগুলিই সামনে আনা উচিত ছিল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রথম দুই স্তবকই দলীয় অনুষ্ঠানে গাওয়া হবে—কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির এই সিদ্ধান্ত ঘিরে এবার দলের অন্দরেই অস্বস্তির সুর। একাংশের নেতার মতে, ইতিহাস ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে দলের যুক্তি থাকলেও বিজেপির সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ময়দান—জাতীয়তাবাদে—পা দিয়ে কংগ্রেস কার্যত নিজেদের জন্যই বিপদ ডেকে এনেছে। তাঁদের প্রশ্ন, এমন বিতর্কে না গিয়ে ছাত্র-যুবদের দাবি, অযোধ্যার রামমন্দিরের অনুদান নিয়ে অভিযোগ, বেকারত্ব কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে অন্য রাজনৈতিক ইস্যুগুলিই সামনে আনা উচিত ছিল।
কংগ্রেসের আইন বিভাগের প্রধান তথা রাজ্যসভার সাংসদ অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি অবশ্য বিষয়টি আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সংশোধিত আইনে ‘বন্দে মাতরম্’ নির্দিষ্ট কোনও পদ্ধতিতে বা পূর্ণ ছয় স্তবকে গাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। আইনের মূল উদ্দেশ্য হল জাতীয় গান পরিবেশনের সময় ইচ্ছাকৃত বাধা দেওয়া বা গোলমাল সৃষ্টি করা ঠেকানো।
কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির এক সদস্য বিষয়টিকে ক্রিকেটের ভাষায় ‘ওয়াইড বল’ বলে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর মতে, দল চাইলে বিতর্কটি এড়িয়ে যেতে পারত। কিন্তু তার বদলে কংগ্রেস ব্যাট চালিয়ে এমন একটি রাজনৈতিক পিচে নেমেছে, যেখানে জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে বিজেপি বরাবরই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে।
অন্য এক কংগ্রেস নেতার কথায়, “দেশে এই মুহূর্তে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। ছাত্রদের আকাঙ্ক্ষা, অযোধ্যায় অনুদানের অর্থ নিয়ে অভিযোগ—এসব বিষয়ে সরকার চাপে রয়েছে। আমাদের বিজেপির শক্তির জায়গায় গিয়ে লড়াই করা উচিত হয়নি।”
কোথা থেকে বিতর্ক?
বিতর্কের সূত্রপাত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠক। সেখানে ১৯৩৭ সালের ওয়ার্কিং কমিটির প্রস্তাব উদ্ধৃত করে জানানো হয়, দলীয় অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রথম দুই স্তবকই গাওয়া হবে। কংগ্রেসের যুক্তি, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শের ভিত্তিতেই এই নীতি নেওয়া হয়েছিল।
দলের ব্যাখ্যা, প্রথম দুই স্তবকে মাতৃভূমির সৌন্দর্য ও বন্দনার কথা থাকলেও পরবর্তী অংশে দুর্গা-সহ হিন্দু দেবীর উল্লেখ রয়েছে। তাই সব ধর্মের মানুষের কাছে গানটিকে গ্রহণযোগ্য রাখতেই প্রথম দুই স্তবক বেছে নেওয়া হয়েছিল।
এই অবস্থানের পক্ষে সওয়াল করেছেন কংগ্রেস নেতা কানহাইয়া কুমারও। তাঁর বক্তব্য, নেতৃত্বকে একটি স্পষ্ট অবস্থান নিতেই হত। তা না হলে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হত। স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহ্য কংগ্রেসের নিজস্ব উত্তরাধিকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আইন নিয়েও প্রশ্ন
তবে দলের অস্বস্তির মূল জায়গা আরও গভীরে। ২০২৬ সালের জাতীয় মর্যাদা অবমাননা প্রতিরোধ সংশোধনী আইন সংসদে পাশ হওয়ার সময় কংগ্রেস তার বিরোধিতা করেনি। লোকসভায় বিরোধীদের বিক্ষোভের মধ্যেই প্রায় ১৫ মিনিটে বিলটি পাশ হয়। কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টির সাংসদেরা তখন প্রতিবাদে ব্যস্ত ছিলেন; বিরোধীদের মধ্যে কেবল ডিএমকে আলোচনায় অংশ নেয়।
ফলে কংগ্রেসের অন্দরেই প্রশ্ন উঠছে—সংসদের ভিতরে বা বাইরে সংশোধনীটির বিরুদ্ধে বড় কোনও রাজনৈতিক আন্দোলন না করে এত দিন পরে ‘পূর্ণ গান বনাম দুই স্তবক’-এর বিতর্কে নামার প্রয়োজনটাই বা কী ছিল?
সিঙ্ঘভির ব্যাখ্যা, নতুন আইনে জাতীয় সরকারি অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। কোনও রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সভা, বাড়ি, হোটেল বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কী ভাবে গানটি পরিবেশিত হবে, সে বিষয়ে আইন কিছু বলেনি। ফলে কংগ্রেস সরকারি অনুষ্ঠানের জন্য নয়, নিজেদের দলীয় অনুষ্ঠানের জন্যই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তাঁর অভিযোগ, বিজেপি ইচ্ছাকৃত ভাবে দেশপ্রেমকে ‘ছয় স্তবক গাওয়ার পরীক্ষা’-য় পরিণত করছে এবং কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
সংশোধিত আইনে ‘বন্দে মাতরম্’ পরিবেশনে ইচ্ছাকৃত বাধা দেওয়া বা গান চলাকালীন সমাবেশে গোলমাল করাকে দণ্ডনীয় অপরাধ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা দু’টিই হতে পারে। তবে আইনের কোথাও পূর্ণ ছয় স্তবক গাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই—সিঙ্ঘভির মূল যুক্তি সেটিই।
রাজ্যগুলিতেও এক সুর নেই
বিতর্ক আরও জটিল হয়েছে কংগ্রেস-শাসিত রাজ্যগুলির ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তে। হিমাচল প্রদেশ, কর্নাটক ও তেলঙ্গানায় স্বাধীনতা দিবসের সরকারি অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম্’ সম্পূর্ণ গাওয়া হয়েছে। কংগ্রেস যেখানে ঝাড়খণ্ডের জেএমএম সরকারের শরিক, সেখানেও পূর্ণ গান পরিবেশিত হয়েছে। উল্টো দিকে, কেরলের কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন সরকার সরকারি স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানেই জাতীয় গানটি পরিবেশন করেনি।
এ নিয়ে সিঙ্ঘভির বক্তব্য, রাজ্য সরকারগুলি নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
সব মিলিয়ে কংগ্রেস এখন খানিকটা নিজের তৈরি বিতর্কের মধ্যেই আটকে। এক দিকে ১৯৩৭ সালের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিতে হচ্ছে, অন্য দিকে বিজেপির ‘জাতীয়তাবিরোধী’ তকমার মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দলের একাংশের আশঙ্কা, এই ব্যাখ্যা যত দীর্ঘ হবে, ততই আড়ালে চলে যাবে মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, পরীক্ষা-ব্যবস্থার অনিয়ম এবং সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অভিযোগ।
তাই কংগ্রেসের অন্দরমহলে এখন প্রশ্ন একটাই—নীতিগত অবস্থান ঠিক হলেও, ‘বন্দে মাতরম্’ নিয়ে লড়াইটা কি ভুল সময়ে শুরু হয়ে গেল?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



