হাইলাইটস:

  • বেআইনি নির্মাণের অভিযোগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক দফতরের একাংশ ভেঙে দিল প্রশাসন।
  • সরকারি কর্তৃপক্ষের দাবি, একাধিক নোটিস দেওয়ার পরও নির্মাণ বৈধ করা হয়নি।
  • তৃণমূলের অভিযোগ, এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ; হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ জানানো হবে।
  • ঘটনাকে ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে তীব্র সংঘাতের আবহ।

বাংলাস্ফিয়ার: বেআইনি নির্মাণের অভিযোগে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক দফতরের একাংশ ভেঙে দিল প্রশাসন। রবিবার সকালে বিপুল পুলিশবাহিনীর উপস্থিতিতে বুলডোজার এবং ভাঙার যন্ত্র নিয়ে অভিযান শুরু হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংশ্লিষ্ট অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ দেখান। তবে প্রশাসন দাবি করেছে, আইন মেনেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে।

সরকারি সূত্রের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট ভবনের একটি অংশ অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মিত হয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার নোটিস দেওয়া হলেও নির্মাণ বৈধ করার জন্য প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া হয়নি কিংবা অবৈধ অংশ অপসারণ করা হয়নি। সেই কারণেই নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পরে ভাঙার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।

অভিযান শুরুর আগেই গোটা এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ। সম্ভাব্য অশান্তির কথা মাথায় রেখে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়। প্রশাসনের আধিকারিকদের উপস্থিতিতেই বুলডোজার দিয়ে ভবনের নির্দিষ্ট অংশ ভাঙা হয়। পুরো প্রক্রিয়ার ভিডিওগ্রাফিও করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

তবে তৃণমূল কংগ্রেস এই পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করেছে। দলের বক্তব্য, বিরোধী রাজনীতিকে দুর্বল করতেই প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করা হচ্ছে। তৃণমূলের একাধিক নেতা দাবি করেছেন, একই ধরনের অভিযোগ থাকা বহু নির্মাণের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অথচ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত দফতরকে বেছে নিয়ে অভিযান চালানো হয়েছে।

দলের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, খুব শীঘ্রই কলকাতা হাইকোর্টে এই অভিযানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মামলা দায়ের করা হবে। তাঁদের দাবি, পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে এবং সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না করেই ভাঙার কাজ করা হয়েছে। আদালতের কাছে এই পদক্ষেপের উপর স্থগিতাদেশ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার আবেদন জানানো হবে।

প্রশাসন অবশ্য এই অভিযোগ মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য, বেআইনি নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনও আলাদা নীতি গ্রহণ করা হয়নি। আইন অনুযায়ী যেসব নির্মাণ অবৈধ বলে চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলির বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, নোটিস, শুনানির সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় সময়—সবই দেওয়া হয়েছিল।

রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনাকে ঘিরে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলি বলছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তবে সেই পদক্ষেপ যেন সর্বত্র সমানভাবে প্রয়োগ হয়। অন্যদিকে তৃণমূলের বক্তব্য, নির্বাচনের পর থেকেই বিরোধী শিবিরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রশাসনিক অভিযান চালানো হচ্ছে, আর এই ঘটনাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইকোর্টে মামলা হলে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রথমত, নির্মাণটিকে বেআইনি ঘোষণার ক্ষেত্রে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে পর্যাপ্ত শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না। তৃতীয়ত, ভাঙার সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের কোনও ভিত্তি রয়েছে কি না। আদালত এই বিষয়গুলিই খতিয়ে দেখতে পারে।

এই ঘটনার রাজনৈতিক অভিঘাতও কম নয়। রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর বিরোধী শিবিরের একাধিক নেতা, সংগঠন এবং দফতরকে ঘিরে প্রশাসনিক পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতরে ভাঙার অভিযান রাজনৈতিক সংঘাতকে আরও তীব্র করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

এখন নজর কলকাতা হাইকোর্টের দিকে। আদালত যদি মামলাটি গ্রহণ করে, তবে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, নোটিস প্রদান, শুনানির সুযোগ এবং ভাঙার পুরো প্রক্রিয়া বিচারিক পরীক্ষার মুখে পড়বে। একই সঙ্গে এই মামলা ভবিষ্যতে বেআইনি নির্মাণ সংক্রান্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক লড়াই আপাতত আদালতের অঙ্গনেই নতুন মাত্রা পেতে চলেছে।