International

তালিকা হাতে, তবু নজর এড়ালেন

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • ফ্লাইদুবাইয়ের তেল আভিভগামী বিমান আকাশে ওঠার আগেই ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছে গিয়েছিল গোটা ক্রু-তালিকা।
  • সেই তালিকায় ছিলেন ওমানি সহকারী পাইলট হামাম আল-হাম্মামিও।
  • কিন্তু তাঁকে সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

ফ্লাইদুবাইয়ের তেল আভিভগামী বিমান আকাশে ওঠার আগেই ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছে গিয়েছিল গোটা ক্রু-তালিকা। সেই তালিকায় ছিলেন ওমানি সহকারী পাইলট হামাম আল-হাম্মামিও। কিন্তু তাঁকে সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। এখন প্রশ্ন, উড়ানের আগে তাঁর নাম যাচাই করা হয়েছিল কি? আর যদি হয়ে থাকে, তা হলে কোনও সতর্কবার্তা এল না কেন?

ইজরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ জানিয়েছে, ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ বিমানের যাত্রী ও কর্মীদের নামের তালিকা উড়ানের আগেই ইজরায়েলি সরকারি আধিকারিকদের হাতে পৌঁছেছিল। নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, তালিকাটি খতিয়ে দেখার কথা ছিল পরিবহণ মন্ত্রক এবং গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের। ইজরায়েলের কর কর্তৃপক্ষও তালিকাটি পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে। তবে পরিবহণ মন্ত্রক আদৌ তা পরীক্ষা করেছিল কি না, সে বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চায়নি।

ফলে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখনও উত্তরহীন—তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও কী ভাবে আল-হাম্মামিকে নিয়ে কোনও সতর্কতা তৈরি হল না?

আরও একটি প্রশ্ন ঘুরছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দাবি, ওমানেই নাকি আল-হাম্মামিকে বিমান চালানো থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কথিত উগ্রপন্থী মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগের কারণেই তাঁকে এই নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়েছিল বলে জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদন। তবে ঠিক কী ধরনের মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগ ছিল, তা স্পষ্ট নয়। ওমান এই তথ্য ইজরায়েল বা কোনও বিমান সংস্থাকে জানিয়েছিল কি না, সেটিও এখনও জানা যায়নি।

আল-হাম্মামির পরিচয় নিয়েও সামনে এসেছে একাধিক তথ্য। বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত তিন জন ব্যক্তি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, তাঁর নাম হামাম আল-হাম্মামি এবং তিনি ওমানের নাগরিক। তাঁদের মধ্যে এক জন উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনীতিক এবং অন্য এক জন পশ্চিমি দেশের কূটনীতিক। কেউই প্রকাশ্যে নিজের পরিচয় জানাতে চাননি।

সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আল-হাম্মামির জন্ম সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে এবং তাঁর মা সিরিয়ার নাগরিক। আঞ্চলিক এক কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, কথিত একই ধরনের উদ্বেগের কারণে তাঁকে বিমান চালানোর প্রশিক্ষণ থেকে সরিয়ে অন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

তাঁর নামে থাকা একটি লিঙ্কডইন প্রোফাইলও দেখেছে সিএনএন। সেই তথ্য অনুযায়ী, আল-হাম্মামি ওমান এয়ারে প্রায় সাত বছর কাজ করেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ওই সংস্থা ছাড়েন। ওই বছরের জুনে রয়্যাল এয়ার মারকে যোগ দেন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেখান থেকেও চলে যান।

বাকিংহ্যামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটি জানিয়েছে, আল-হাম্মামি দূরশিক্ষার মাধ্যমে বিমান পরিবহণ ব্যবস্থাপনার একটি পাঠক্রম সম্পূর্ণ করেছিলেন। তবে সেখানে তিনি বিমান চালানোর কোনও প্রশিক্ষণ নেননি।

এখন তদন্তকারীদের আরও একটি প্রশ্ন—আল-হাম্মামি একাই হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন, নাকি কোনও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল? উপসাগরীয় অঞ্চলের এক কূটনীতিক এপিকে জানিয়েছেন, তদন্তকারীরা সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন।

আকাশে আচমকা বিপদ

ঘটনাটি ঘটে ৩০ সেপ্টেম্বর। ফ্লাইটরেডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৫ মিনিটে দুবাই থেকে তেল আভিভের উদ্দেশে রওনা দেয় ফ্লাইদুবাইয়ের বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স। বিমানে ছিলেন ১৭৪ জন, যাঁদের অধিকাংশই ইজরায়েলি নাগরিক।

প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় পৌঁছনোর পর আচমকাই বিমানটি নীচে নামতে শুরু করে। উড়ানের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দু’মিনিটের মধ্যে বিমানটি ১৭ হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতা হারায়। পরে এক দফা উচ্চতা বাড়লেও ফের নীচে নামতে শুরু করে।

ঠিক সেই সময়ই ককপিটের ভিতরে ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছরের উপর হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে আল-হাম্মামির বিরুদ্ধে।

সংযুক্ত আরব আমিরশাহির কর্তৃপক্ষের দাবি, ককপিটে রাখা জরুরি কুড়ুল দিয়ে মাচ্ছরকে আক্রমণ করা হয়। বিমানটির কাঠামো কেটে জরুরি পরিস্থিতিতে পথ তৈরি করার জন্যই সাধারণত এই সরঞ্জাম রাখা থাকে।

আহত হয়ে ককপিটের মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলেন মাচ্ছর। কিন্তু বুঝতে পারছিলেন, বিমানটি দ্রুত নীচে নামছে। পরে আবু ধাবির হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, তখন মনে হয়েছিল, কিছু করার এটাই শেষ সুযোগ।

দ্য ন্যাশনাল-এ প্রকাশিত তাঁর বয়ান অনুযায়ী, তিনি নিজেকেই বলেছিলেন, শেষবারের মতো চেষ্টা করতে হবে। প্রবল যন্ত্রণার মধ্যেও ককপিটের দরজার কাছে পৌঁছে সেটি খুলে দেন। দরজা খুলতেই যাত্রী ও বিমানকর্মীরা ভিতরে ঢুকে সহকারী পাইলটকে কাবু করার সুযোগ পান।

বিমানের ভিতরে থাকা আরও দুই পাইলট তখন নিয়ন্ত্রণ নেন। শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুকে বিমানটির জরুরি অবতরণ করানো হয়।

৭৫০০ সংকেতের অর্থ কী?

ঘটনার সময় বিমানের ট্রান্সপন্ডারে জরুরি সংকেতও বদলাতে থাকে। প্রথমে ৭৭০০ কোড দেওয়া হয়—যা সাধারণ জরুরি পরিস্থিতির সংকেত। পরে সেটি বদলে ৭৫০০ করা হয়। এই কোড বিমান ছিনতাই বা বেআইনি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। প্রায় এক ঘণ্টা পরে আবার ৭৭০০ কোড দেওয়া হয়।

যাত্রীদের ধারণ করা একটি ভিডিয়োয় বিমানের ভিতরে আতঙ্ক ও চিৎকারের শব্দ শোনা যায়। কেউ হামলাকারী বিমানটি ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন বলে দাবি করছেন, আবার কাউকে যাত্রীদের বসে পড়তে বলতে শোনা যায়। তবে ওই ভিডিয়ো স্বাধীন ভাবে যাচাই করা হয়নি। ককপিটের কিছু দৃশ্যও প্রকৃত ফুটেজ নয়; পাইলটের বক্তব্য, যাত্রীদের বর্ণনা এবং প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি অ্যানিমেশন।

সন্ত্রাসের যোগ খতিয়ে দেখছে আবু ধাবি

শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরশাহির অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সইফ আল-শামসি জানান, তদন্তকারীদের হাতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সহকারী পাইলট একটি “সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড” শুরু করেছিলেন। তাঁর দাবি, কুড়ুল দিয়ে ক্যাপ্টেনকে আক্রমণ করে বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।

তবে হামলার নেপথ্যে ঠিক কী উদ্দেশ্য ছিল, আল-হাম্মামি একাই কাজ করেছিলেন কি না, কিংবা কোনও সংগঠনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।

বিমানটি সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে নিবন্ধিত এবং সে দেশের পতাকাবাহী হওয়ায় তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছে আবু ধাবি। বিমানের ভিতরে দেশের সীমানার বাইরে অপরাধ ঘটলেও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে আমিরশাহির আইন প্রযোজ্য হবে বলে জানিয়েছেন আল-শামসি।

তদন্তকারীরা হামলার উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য সহযোগী এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া বস্তুগত ও ডিজিটাল প্রমাণ পরীক্ষা করছেন।

এর মধ্যেই ইজরায়েলের সঙ্গে ফ্লাইদুবাইয়ের উড়ান বন্ধ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশও এক্স-এ মন্তব্য করেছেন, ঘটনাটি দেখিয়ে দিচ্ছে যে অঞ্চলে উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই এখনও শেষ হয়নি।

সব মিলিয়ে এখন তদন্তের কেন্দ্রে শুধু ককপিটের সেই কয়েক মিনিট নয়। তার আগের ঘটনাও—ওমানি সহকারী পাইলটকে নিয়ে আগে কোনও সতর্কতা ছিল কি না, তাঁর নামের তালিকা কী ভাবে যাচাই করা হয়েছিল, এবং সতর্কতার কোনও তথ্য থাকলে তা ইজরায়েল বা সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার কাছে পৌঁছেছিল কি না—এই প্রশ্নগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আর সেই প্রশ্নের উত্তর মিললেই হয়তো বোঝা যাবে, আকাশে হামলা শুরু হওয়ার আগে মাটিতে কোথায় কোথায় সতর্কতার ফাঁক তৈরি হয়েছিল।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles