এক কাপ চায়ের গাজা

যা জানা জরুরি
- তাঁর কাছে সকালের এই সামান্য অভ্যাসটিও শুরু হয় গ্যাসের হিসাব কষে।
- তিন মাসে তাঁর পরিবার পায় মাত্র ছয় কেজি গ্যাস।
- তাতে প্রতিদিন প্রায় ১৮ মিনিট হাঁড়ি চড়ানো যায়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
গাজায় সকালে এক কাপ চা বানাতে কী লাগে?
আলা হেসি অন্তঃসত্ত্বা। সন্তান জন্মানোর আর এক মাস বাকি। তাঁর কাছে সকালের এই সামান্য অভ্যাসটিও শুরু হয় গ্যাসের হিসাব কষে। তিন মাসে তাঁর পরিবার পায় মাত্র ছয় কেজি গ্যাস। তাতে প্রতিদিন প্রায় ১৮ মিনিট হাঁড়ি চড়ানো যায়। সেই মূল্যবান সময় রান্নার জন্যই রাখতে হয়। তাই এক কাপ চা বানাতে হলে আলাদাভাবে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করতে হয়।
বারো বছরের রমজানের দিন শুরু হয় আগুন জ্বালানোর মতো কিছু খুঁজে বের করার মধ্য দিয়ে। চারপাশে কাঠ বলতে প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। যে বালিয়াড়িতে সে থাকে, সেখানেই ঘুরে ঘুরে শুকনো ডাল খোঁজে। কাঁটাঝোপ থেকে কয়েকটি ডাল ভাঙে। সমুদ্রের জলে ভেসে আসা ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের টুকরো দিয়ে সেই আগুন জিইয়ে রাখে।
তার পরেও চা বানানো শুরু হয় না। কেটলিতে জল তুলতে হবে। আর গাজায় জলও সহজলভ্য নয়।
কল দিয়ে জল আসে না। তাই প্রথম প্রশ্ন, সেদিন এলাকায় জলের গাড়ি আসবে কি না। না এলে জল খুঁজতে কত দূর হাঁটতে হবে? জল পাওয়া গেলেও সেটি বয়ে আনতে হবে। কিন্তু রমজান জল রাখবে কীসে? পরিবারের বড় জলের পাত্রগুলি ইঁদুরে কেটে ফুটো করে দিয়েছে। তার উপর এত ভারী পাত্র একটি ছোট ছেলে বইবেই বা কী করে?
পরের দিন তিরিশ ডিগ্রি গরমে পরিবারের সবার গা ধোয়া, দাঁত মাজা, রান্না এবং পান করার জন্য যতটা জল প্রয়োজন, সবটাই তো জোগাড় করতে হবে।
অবশেষে জল ফুটতে শুরু করে। কিন্তু তখনও শেষ হয়নি হিসাব। চা-পাতা, কফি কিংবা চিনি—কিছু আছে তো?
রেশনে পাওয়া চিনির কাগজের ঠোঙাটি হাতে নিলেই রমজানের মনে পড়ে যায়, কখনও কখনও এই সামান্য জিনিসগুলি জোগাড় করতেও কী মূল্য দিতে হয়েছে। চায়ের পাত্রের সামনে উবু হয়ে বসে সে ফিরে যায় গত বছরের দুর্ভিক্ষের দিনগুলিতে। ত্রাণবণ্টনের জায়গাগুলি তখন মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠেছিল। এক বস্তা ময়দা কিংবা এক ব্যাগ চিনির জন্য সে এবং তার ভাই প্রাণ হাতে করে ছুটত। তার মনে পড়ে, পাশেই গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়েছিল কয়েকটি ছেলে। তাদের ‘অপরাধ’ ছিল, তারা একটু আগে বা একটু পরে লাইনে এগিয়ে গিয়েছিল।
গাজা নিয়ে আমাদের চোখে পড়া অধিকাংশ খবরই ভয়াবহ—বোমাবর্ষণ, একসঙ্গে বহু মানুষের মৃত্যু, নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিশানা করে হামলা। এসবের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
কিন্তু এমন কিছু বিষয়ও রয়েছে, যা সচরাচর খবরের শিরোনামে আসে না। অথচ গাজার মানুষের জীবন আজ সেগুলি দিয়েই নির্ধারিত হচ্ছে। প্রতিদিনের ছোট ছোট অভাব, অপেক্ষা এবং অনিশ্চয়তা ধীরে ধীরে মানুষকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। একটি দিনকে একেবারে কাছ থেকে দেখলেই সেই বাস্তবতা ধরা পড়ে। যেমন, এক কাপ চা।
এই সপ্তাহজুড়ে আমরা পাঁচ জন সাধারণ প্যালেস্টাইনি মানুষের দৈনন্দিন জীবন অনুসরণ করেছি—একটি শিশু, এক অন্তঃসত্ত্বা নারী, এক শিক্ষক, এক স্কেটবোর্ডার এবং এক প্রবীণা। সূর্যোদয় থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে থেকে দেখেছি সেই ছোট ছোট মুহূর্ত, যা আন্তর্জাতিক সংবাদে প্রায় কখনও জায়গা পায় না। তাঁদের দিনযাপনের মধ্য দিয়ে গাজার বর্তমান জীবনকে অন্যভাবে, আরও গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করেছি।
একটি দিনকে খুঁটিয়ে দেখলেই গাজা সম্পর্কে অনেক কিছু বোঝা যায়। বিশেষ করে স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি বিষয়: উচ্চশিক্ষা, বই, শিল্পকলা, সংগ্রহশালা, শখের চর্চা কিংবা বাদ্যযন্ত্র—যে জিনিসগুলি মানুষের জীবনকে শুধু প্রাণধারণের স্তর থেকে আরও ওপরে নিয়ে যায়, সেগুলি ধ্বংস হয়ে গেলে বা মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেলে কী ঘটে।
গাজায় কী ঢুকবে, কী ঢুকবে না—তার উপর ইজরায়েলের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। গাজাবাসীর জন্য খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রবেশ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। এমনকি ন্যূনতম কয়েক বেলার গরম খাবার রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের সরবরাহও এই সংকটের অংশ।
বেঁচে থাকার অত্যাবশ্যক উপকরণের পাশাপাশি আরও বহু সাধারণ সামগ্রীও গাজায় ঢুকতে বাধার মুখে পড়ে। সেগুলিকে অনেক সময় ‘দ্বৈত ব্যবহারের’ সামগ্রী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়—অর্থাৎ, হামাসও যেগুলি ব্যবহার করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। কোন সামগ্রী এই তালিকায় পড়বে এবং কোন মাপকাঠিতে তা নির্ধারিত হবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অস্বচ্ছতার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে শ্বাসপ্রশ্বাসের যন্ত্র, ক্যানসারের ওষুধ, বিয়ের পোশাক, সেলাইকল, খেলনা, বাদ্যযন্ত্র, মশলা, খেজুর এমনকি ক্রাচও প্রবেশের বাধার মুখে পড়েছে।
ছবিতে: গাজা স্কেট টিমের নেতা রজব আল-রিফি দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে স্কেটবোর্ড মেরামত করছেন। ছবি: আমজেদ তানতেশ/দ্য গার্ডিয়ান।
রজব আল-রিফির একটি দিনের গল্প দেখায়, একটি স্কেটবোর্ড না ঢুকতে দেওয়ার সিদ্ধান্তও কীভাবে মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারে।
তিরিশ বছরের রজব গত পাঁচ বছর ধরে গাজা স্কেট টিম চালাচ্ছেন। এই তরুণদের সংগঠনে শিশুদের স্কেটবোর্ড চালানো শেখানো হয়। যুদ্ধের মধ্যেও প্রতি সপ্তাহে তাদের এই জমায়েত ঘরছাড়া শিশুদের কাছে হয়ে উঠেছিল এক ধরনের আশ্রয়—মনের চাপ থেকে কয়েক মুহূর্তের মুক্তি।
স্কেটবোর্ড চালানোর নির্দিষ্ট জায়গাটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরেও দলটি থামেনি। ধ্বংসস্তূপের উপর কসরতের ছবি তারা প্রকাশ করেছে। ভেঙে পড়া কংক্রিটের কড়ি, জট পাকানো ধাতব খুঁটির উপর লাফিয়ে বোর্ড ঘুরিয়ে আবার তাতে নেমে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলেছে।
কিন্তু একটি স্কেটবোর্ড বড়জোর বছর দুয়েক টেকে। একে একে বোর্ডের স্তর ভেঙেছে, চাকার ভিতরের যন্ত্রাংশ ক্ষয়ে গেছে। একটি ভাঙা বোর্ড থেকে খুলে নেওয়া অংশ অন্যটিতে লাগানোও সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত চালানোর মতো একটিও বোর্ড না থাকায় দলটি নেমে পড়ে উদ্ধার অভিযানে। বোমায় ধ্বংস হওয়া একটি বাড়ির ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে কিছু সরঞ্জাম উদ্ধার করে তারা।
এখন তাদের হাতে আবার অল্প কয়েকটি চালানোর মতো বোর্ড রয়েছে। মেয়েরাও ফিরেছে স্কেটবোর্ডে। কিন্তু এই বোর্ডগুলিরও আয়ু প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। এগুলি নষ্ট হয়ে গেলে নতুন বোর্ড আসার সম্ভাবনা নেই।
বেঁচে থাকার জন্য স্কেটবোর্ড অপরিহার্য নয়। তার অভাব ধারাবাহিক খাদ্যবঞ্চনার মতো খবরের শিরোনামও হবে না। কিন্তু এই না-থাকাটাই অবরোধের আর একটি দিক দেখিয়ে দেয়—কীভাবে ধীরে ধীরে মানুষের একটু নির্ভার হওয়ার, আনন্দ পাওয়ার, নিজের পরিচয় প্রকাশ করার জায়গাগুলিও সংকুচিত হয়ে যায়।
ছবিতে: যে খোলা মালবাহী ট্রাকটি এখন তাঁর ঘর, তার সামনে মনসুরা ইব্রাহিম মহম্মদ আবদেল দায়েম। ছবি: আমজেদ তানতেশ/দ্য গার্ডিয়ান।
তবু এই প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রত্যেকে দিনের কোনও না কোনও সময়ে এমন কিছু আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করেন, যা তাঁদের নিজেদের মনুষ্যত্বের অনুভূতিটুকু বাঁচিয়ে রাখে।
অধ্যাপক মাহমুদ সেয়দাম সৌরবিদ্যুতের পাতের সঙ্গে তার জুড়ে ল্যাপটপ চালান। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠের বক্তৃতা পাঠান। লিখিত পরীক্ষার বদলে পড়ুয়াদের মুখে শুনে তাঁদের পড়াশোনা যাচাই করেন। কাগজ নেই, খাতা নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর নেই—তার মধ্যেই শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
আলা হেসি আসন্ন সন্তানের জন্য যতটা সম্ভব নিরাপদ একটি ছোট বিছানা তৈরি করার চেষ্টা করেন। যে ধ্বংসস্তূপের উপর তাঁর তাঁবু খাটানো, সেখানেই এক হামলায় তাঁর তিন সন্তান মারা গিয়েছিল।
ট্রাকের পেছনে বসবাস করা মনসুরা ইব্রাহিম মহম্মদ আবদেল দায়েম নাতি-নাতনিদের নিজেদের ইতিহাসের গল্প শোনান। আর রমজান সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার স্বপ্ন, একদিন সমুদ্রে বিপন্ন মানুষকে উদ্ধার করার কাজ করবে।
এই পাঁচ জনের দিন আলাদা। কিন্তু তাঁদের গল্পের ভিতরে একটি মিল রয়েছে—যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ধ্বংস শুধু ঘরবাড়ি বা পরিকাঠামোর নয়। তার সঙ্গে ক্ষয়ে যায় স্বাভাবিক জীবনের ছোট ছোট অভ্যাস, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, শেখার সুযোগ, খেলাধুলা, আনন্দ এবং নিরাপত্তার অনুভূতি।
আলার কথায়, “আমার সন্তানদের হারিয়েছি। আবার এই সন্তানকেও হারানোর ভয় হয়।”
রমজানের ভয়, “যে খাবারের দোকানে কাজ করি, ওরা সেখানে বোমা ফেলবে, কিংবা আমাকেই বোমা মারবে।”
মনসুরা বলেন, “এখন এটাই আমার বাসা, একটা ট্রাকের পেছনটা।”
মাহমুদের দিনের শুরু হয় “ল্যাপটপে চার্জ দেওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা” দিয়ে।
আর রজবের কথায়, “আমরা ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলির ছাদে স্কেটবোর্ড চালাই।”
গাজার গল্প তাই শুধু বিস্ফোরণের শব্দে লেখা নয়। কখনও কখনও সেই গল্প ধরা পড়ে একটি কেটলিতে জল ফুটতে কতটা কাঠ লাগে, একটি স্কেটবোর্ড কত দিন টেকে, কিংবা একটি ল্যাপটপ চালু রাখতে কতটা রোদ দরকার—সেই হিসাবের মধ্যেও।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



