৩ নভেম্বরের নির্বাচনে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ফের মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে জেতার এক দিন পর রো খান্না জানালেন, তিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিরোধী। ভারতে যে ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছেন, তাঁদের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছেন তিনি।
খান্নার এই মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ভারত ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের বিষয়ক কংগ্রেসনাল ককাসের তিনি এখনও যুগ্ম সভাপতি। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারত সরকারের আমন্ত্রণে এ দেশেও এসেছেন। যেদিন তিনি এই মন্তব্য করেন, সেদিনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ) এক বিবৃতিতে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে ভারত সরকারের সমালোচনা করে। দু’টি বক্তব্য নিয়েই ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিক্রিয়া চাওয়া হয়েছিল। মন্ত্রক জবাব দেয়নি।
২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হতে পারেন কি না, তা নিয়ে খান্নাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। ভারতে পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস ও ভোটার তালিকা ঘিরে যে বিক্ষোভ চলছে, তা নিয়েও তিনি মুখ খুলবেন কি না, জানতে চাওয়া হয়। শুক্রবার এক্সে জবাবে খান্না লেখেন, “আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হিন্দু জাতীয়তাবাদের নিন্দা করেছি। যে ছাত্রছাত্রীরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং সমাজে সকলকে সঙ্গে নিয়ে চলার পক্ষে রাস্তায় নেমে সরব হয়েছেন, তাঁদের সাধুবাদ জানিয়েছি।”
খান্না আরও লেখেন, “আমার দাদু গান্ধীর নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। গান্ধী ও নেহরুর বহুত্ববাদের আদর্শে আমি বিশ্বাস করি।” তিনি তাঁর মায়ের বাবা অমরনাথ বিদ্যালঙ্কারের কথা বলছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামী বিদ্যালঙ্কার ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ভারতের সাংসদ ছিলেন।
সরকারি প্রতিক্রিয়া না এলেও খান্নার পোস্টের জবাবে তাঁকে আক্রমণ করেন ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের প্রবীণ উপদেষ্টা কাঞ্চন গুপ্ত। তিনি বলেন, “রো খান্নার মুখে গণতন্ত্র আর বহুত্ববাদের কথা শোভা পায় না।” গুপ্তের অভিযোগ, ১৯৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন, বিদ্যালঙ্কার তাকে সমর্থন করেছিলেন। ১৯৮৫ সালে বিদ্যালঙ্কারের মৃত্যু হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারত সরকারের সঙ্গে খান্নার যোগাযোগ ও ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে তাঁর উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই তিক্ত বাদানুবাদ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। ২০২৩ সালে ভারত সরকারের আমন্ত্রণে মার্কিন কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে দিল্লি এসেছিলেন খান্না। স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ শুনতে তাঁরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগের বছর, ২০২২ সালে, ‘কাউন্টারিং আমেরিকাজ অ্যাডভারসারিজ থ্রু স্যাংশনস অ্যাক্ট’ (কাটসা)-এর আওতায় শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞা থেকে ভারতকে ছাড় দেওয়া নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের সংশোধনীটির খসড়াও লিখেছিলেন খান্না।
শুক্রবার পৃথক এক বিবৃতিতে ভারতে শিখ গুরুদ্বারগুলিতে পরপর কয়েকটি হামলার ঘটনায় উদ্বেগ জানায় মার্কিন ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন। কমিশনের ভাষায়, এ সবই ‘নিজেদের হাতে আইন তুলে নেওয়া গোষ্ঠীর হামলা’।
কমিশনের সদস্য ডেভিড অ্যান্ডারসন বলেন, “গত কয়েক সপ্তাহে ভারতে শিখদের গুরুদ্বারগুলি এমন হামলার নিশানা হয়েছে। ধর্মীয় নেতাদেরও আঘাত করার চেষ্টা হয়েছে। যে হিংসা মানুষকে নিজের ধর্মবিশ্বাস পালনে বাধা দেয়, ভারত সরকার তা মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তার ভিত্তিতেই মার্কিন সরকারের উচিত ভারতকে নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়া।” পরে কমিশনের আর এক সদস্য জো গ্রোগান পৃথক বিবৃতিতে মার্কিন সরকারকে ঘটনাগুলি নিয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে কথা বলার আহ্বান জানান।
ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে পরামর্শদাতা এই কমিশনের দুই সদস্যের কেউই নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ দেননি। মনে করা হচ্ছে, তাঁরা লুধিয়ানার দু’টি গুরুদ্বারায় গুলি চলার ঘটনার কথা বলছিলেন। তবে তদন্তের পর পঞ্জাব পুলিশ জানিয়েছিল, অন্তত একটি হামলা চালিয়েছিলেন গুরুদ্বারার কর্মীরাই। হামলাগুলির পিছনে ধর্মীয় উদ্দেশ্য থাকার সম্ভাবনাও পুলিশ খারিজ করে দিয়েছিল।
অতীতেও ভারতের বিদেশ মন্ত্রক ধারাবাহিকভাবে এই কমিশনের বিবৃতি ও রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছে। মন্ত্রকের অভিযোগ, কমিশন “বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের বদলে প্রশ্নসাপেক্ষ সূত্র ও মতাদর্শনির্ভর ব্যাখ্যার উপর ভর করে বাছাই করা তথ্য দিয়ে ভারতের এক বিকৃত ছবি তুলে ধরে।”
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।