জোকার আপিল ট্রাইব্যুনালে বিচারকেরা ভোটারদের আবেদন পড়ছেন, কাগজে মন্তব্যও লিখে রাখছেন। অথচ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে নির্বাচন কমিশনের পোর্টালে চূড়ান্ত আদেশ তোলার কাজ থমকে। এই অবস্থাতেই ৪ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) এক বছর পূর্ণ হল। এখনও ৩৫ লক্ষের বেশি আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। কমিশন পোর্টালে বদল আনা এবং জোকা থেকে ট্রাইব্যুনাল সরানোর দাবি মেনে নেওয়ায় অবসরপ্রাপ্ত বিচারকেরা আশা করছেন, দীপাবলির পরে কাজে গতি ফিরবে।
জট যে কতটা, তার একটা ছবি মেলে সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্টে কমিশনের দেওয়া হিসাবে। রাজ্যের ১৯টি ট্রাইব্যুনালে তখন সব মিলিয়ে জমা পড়েছিল ৩৮ লক্ষ ৩১ হাজার আপিল। তার মধ্যে ২২ লক্ষ ২১ হাজার আবেদন করেছিলেন এমন ভোটারেরা, যাঁদের নাম বাদ গিয়েছিল। বাকি ১৬ লক্ষ ১০ হাজার আপিল ছিল ভোটার তালিকায় নাম বহাল রাখার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছিল ১ লক্ষ ২৬ হাজার আপিলের। অর্থাৎ, প্রতি একশোটি আবেদনের মধ্যে গড়ে তিনটির ফয়সালা হয়েছিল।
সবচেয়ে বেশি আবেদন মুর্শিদাবাদে। কমিশনের সেপ্টেম্বরের হিসাবে ওই জেলার ৭ লক্ষ ৪৮ হাজারেরও বেশি আপিলের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছিল মাত্র ৫৯৫টির। মুর্শিদাবাদের একাংশের আবেদন শুনছিলেন কলকাতা হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু। শনিবার, ৭ নভেম্বর, ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তিনি হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে ইস্তফা পাঠিয়েছেন। ওই জেলার আবেদন শুনছেন আর এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায়। জোকায় প্রতিদিন যাতায়াতের অসুবিধার কথা জানিয়ে তিনিও সরে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। সমস্যা মেটানোর আশ্বাস পেয়ে তিনি কাজে ফিরেছেন।
এই ট্রাইব্যুনালগুলি গড়ার প্রয়োজন হয়েছিল এপ্রিলের বিধানসভা ভোটের মুখে। ভোটারদের তথ্যে অসঙ্গতি চিহ্নিত করেছিল কমিশনের সফটওয়্যার। প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের নথি পরীক্ষা করেন বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা। সেই পর্যায়ে তালিকা থেকে বাদ পড়ে ২৭ লক্ষেরও বেশি নাম। আধিকারিকদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল শোনার জন্য ১০ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট ট্রাইব্যুনাল গড়ার নির্দেশ দেয়। ২০ মার্চ কমিশন ১৯টি ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞপ্তি জারি করে। প্রতিটির দায়িত্ব দেওয়া হয় হাই কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে।
কাজে নতুন বাধা আসে ২১ সেপ্টেম্বর। পোর্টালে আদেশ তুলতে গেলে বিচারকদের নিজেদের আধার দিয়ে পরিচয় যাচাই করাতে হবে, এমন ব্যবস্থা চালু করে কমিশন। ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তিন দিন পরেই রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে চিঠি দেন বিচারকেরা। ২৮ অক্টোবর মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর বিকল্প পদ্ধতির কথা জানায়। প্যান কার্ড ও সরকারি পরিচয়পত্র দেখিয়ে বিচারকেরা ডিজিটাল স্বাক্ষরের শংসাপত্র নিতে পারবেন। তার জন্য পরিচয়পত্রের প্রতিলিপি জমা দেওয়ার পাশাপাশি ভিডিয়োর মাধ্যমে আসল নথিও দেখাতে হবে।
বিচারকদের আরও একটি দাবি ছিল, পোর্টাল থেকেই যেন শুনানির নোটিস জারি করা যায়। অগস্টের বৈঠকে বিচারকেরা জানিয়েছিলেন, বাড়তি নথি চাওয়ার প্রয়োজন হলে জেলার নির্বাচনী আধিকারিকের মাধ্যমে ইমেলে নোটিস পাঠাতে হচ্ছিল। তাতে সাড়া মিলছিল সামান্যই। মে মাসেই কয়েক জন বিচারক নোটিসের একটি বয়ান অনুমোদন করেছিলেন। অগস্টেও সেটি পোর্টালে ব্যবহার করার উপায় ছিল না। জোকার বদলে কলকাতার কেন্দ্রীয় কোনও জায়গায় ট্রাইব্যুনাল সরানোর অনুরোধও করেছিলেন তাঁরা। জোকায় প্রায় বারো ফুট বাই দশ ফুটের ঘরে বিচারক ও কর্মীদের সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। কমিশন স্থানান্তরে রাজি হলেও ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল জোকাতেই কাজ করছিল।
এত দিন আবেদনকারীর নিজেরও পোর্টাল থেকে আদেশের কপি পাওয়ার উপায় ছিল না। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বিচারক আদেশ আপলোড করলেই ভোটার তার কপি ডাউনলোড করতে পারবেন। তালিকায় নাম রাখার বা বাদ দেওয়ার কারণ তখন তিনি নিজেই পড়ে দেখতে পারবেন। দীপাবলির পরে সেই সুযোগ কবে মিলবে, কমিশন এখনও নির্দিষ্ট দিন জানায়নি।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।