কলকাতাঃ কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে (এসআরএফটিআই) দুই চুক্তিভিত্তিক শিক্ষককে সাসপেন্ড করার প্রতিবাদে তাঁদের কাজে ফেরানোর দাবি তুলল ছাত্র সংসদ। এরই মধ্যে ফিল্ম এবং ইলেকট্রনিক অ্যান্ড ডিজিটাল মিডিয়া বিভাগের নিয়মিত ক্লাস ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। হস্টেল খালি রাখার নির্দেশও বহাল থাকছে, বন্ধ থাকবে মেস। এর আগে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ জারি ছিল। ৫ নভেম্বরের নির্দেশে তার মেয়াদ আরও চার সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে। বিধিনিষেধ কার্যকর করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ডিন, বিভাগীয় প্রধান, হস্টেলের ওয়ার্ডেন ও নিরাপত্তা আধিকারিককে। নির্দেশ ইচ্ছাকৃত ভাবে অমান্য করলে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে বা প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।

ওই দিনই এক বিবৃতিতে ছাত্র সংসদ অভিযোগ করেছে, আন্দোলনরত পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বলেই দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন বিভাগে ক্লাস নিতে আসতেন এমন ছ’জন আমন্ত্রিত প্রশিক্ষককেও আপাতত ডাকা হচ্ছে না। ছাত্র সংসদ তাঁদেরও ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে। শিক্ষকদের কাছে পাঠানো যে নোটিসগুলিকে তারা প্রতিহিংসামূলক বলে মনে করছে, সেগুলিও প্রত্যাহারের দাবি তুলেছে সংগঠন।

শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রেজিস্ট্রার দীপক কুমার। তাঁর বক্তব্য, চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের নিয়োগের নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। তাঁদের কাজে রাখা বা চুক্তির অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত সেই শর্ত এবং প্রতিষ্ঠানের বিধি মেনেই নেওয়া হয়। আমন্ত্রিত প্রশিক্ষকদের প্রসঙ্গে তাঁর ব্যাখ্যা, ক্লাস বন্ধ থাকায় তাঁদের এখন পড়ানোর কাজ নেই। এই অবস্থায় তাঁদের ডাকলে প্রতিষ্ঠানের অকারণ খরচ হবে। পঠনপাঠন শুরু হলেই তাঁরা ফের কাজে যোগ দেবেন বলে জানিয়েছেন রেজিস্ট্রার।

ক্লাস বন্ধের মধ্যেই ক্যাম্পাসে একটি কর্মশালাকে ঘিরে নতুন করে বিরোধ বেধেছে। বুধবার চিত্রগ্রাহক ও তথ্যচিত্র পরিচালক রঞ্জন পালিত ওই কর্মশালা নিতে এসেছিলেন। পড়ুয়াদের বক্তব্য, তাঁকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে সাহায্য করার সঙ্গে দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার যোগ রয়েছে। অনুমতি ছাড়া পালিতকে ঢুকতে কেন সাহায্য করা হয়েছিল, তা জানতে চেয়ে এক শিক্ষককে তিন দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদ মাধ্যম।

বিরোধের সূত্রপাত ২৭ সেপ্টেম্বর। সে দিন ক্যাম্পাসে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের একটি অনুষ্ঠান ছিল। পড়ুয়াদের অভিযোগ, সেখানে বহিরাগতেরা তাঁদের মারধর করেন। আয়োজকদের পাল্টা অভিযোগ, তাঁদের উপরেই চড়াও হয়েছিলেন কয়েকজন ছাত্র। ৪ অক্টোবর বঙ্গীয় হিন্দু জাগরণ মঞ্চের জমায়েত থেকে ক্যাম্পাসের ভিতরে ইট ও বোতল ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ প্রত্যাহার এবং উপাচার্যের পদত্যাগ চেয়ে সরব হন আন্দোলনকারীরা। অক্টোবরের মাঝামাঝি উপাচার্যকে হেনস্থা ও তাঁর দপ্তরে ভাঙচুরের অভিযোগে ছয় পড়ুয়াকে বহিষ্কার করেন কর্তৃপক্ষ। ছাত্র সংসদ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পড়ুয়াদের কাছে ইতিমধ্যে পঁচিশটিরও বেশি কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।

উপাচার্য সন্তোষ আজমেরা জানিয়েছেন, দুর্গাপুজোর ছুটির আগেই পড়ুয়াদের ক্লাসে ফেরানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি। ছাত্র প্রতিনিধি, সাধারণ পড়ুয়া, শিক্ষক ও কর্মীদের সঙ্গে একাধিক বার বৈঠকও করেছেন। তাঁর অভিযোগ, পড়ুয়াদের একাংশ ক্লাস বয়কট চালিয়ে গিয়েছেন এবং অন্যদেরও তাতে শামিল করেছেন। আজমেরার বক্তব্য, দুই বা তিন বছরের কোর্স শেষ করতে কারও কারও পাঁচ থেকে ছয় বছর লেগে যাচ্ছে। তত দিন তাঁরা হস্টেলে থেকে গেলে নতুন পড়ুয়াদের জন্য ঘরের অভাব হয়।

আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, হস্টেল খালি করার নির্দেশ আর মেস বন্ধের ধাক্কা সরাসরি সামলাতে হচ্ছে আবাসিকদের। খাবার, পানীয় জল, বিদ্যুৎ ও ওয়াই-ফাই পরিষেবা নিয়েও অভিযোগ জানিয়েছেন তাঁরা। ছাত্র সংসদ চায়, কর্তৃপক্ষ ক্লাস ও হস্টেল খুলে দিয়ে পড়ুয়াদের সঙ্গে আলোচনায় বসুন। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে সেপ্টেম্বর থেকে তাঁরা যে প্রশ্ন তুলছেন, সেই আলোচনায় তারও জবাব চান পড়ুয়ারা।