নোটবন্দির দশ বছর পরেও দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় মানুষের হাতে থাকা নগদের পরিমাণ প্রায় আগের মতোই। অথচ ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেসে (ইউপিআই) লেনদেনের অঙ্ক বছর বছর বেড়েছে। জাল নোটের ক্ষেত্রে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের (আরবিআই) পরিসংখ্যানে দু’টি প্রবণতা ধরা পড়েছে। সব মূল্যমানের নোট মিলিয়ে জাল নোট ধরা পড়ার হার কমেছে। তবে নোটবন্দির পরে চালু হওয়া নতুন ৫০০ টাকার নোটের ক্ষেত্রে সেই হার বেড়েছে।
২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর নোটবন্দির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, “বাজারে কত নগদ চালু আছে, তার সঙ্গে দুর্নীতির মাত্রার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। দুর্নীতির পথে উপার্জিত নগদ টাকা খরচ হলে মূল্যবৃদ্ধি আরও তীব্র হয়।” তিনি আরও বলেছিলেন, “বাজারে বেশি নগদ থাকলে হাওয়ালা কারবারও জোরদার হয়। কালো টাকা এবং অস্ত্রের বেআইনি কারবারের সঙ্গে হাওয়ালার সরাসরি যোগ রয়েছে।”
লেনদেনে নগদের উপর দেশের নির্ভরতা কমানো ছিল নোটবন্দির অন্যতম ঘোষিত লক্ষ্য। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেই লক্ষ্য অনেকটাই অধরা। নোটবন্দির আগের অর্থবর্ষে, অর্থাৎ ২০১৫–১৬ সালে, মানুষের হাতে থাকা নগদের পরিমাণ ছিল জিডিপির ১১.৯ শতাংশ। ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ তা সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় ১২.১ শতাংশে। একই সময়ে ইউপিআই লেনদেনে বিপুল বৃদ্ধি ঘটেছে। ২০১৬–১৭ অর্থবর্ষে ইউপিআই মারফত সারা বছরের লেনদেনের মোট মূল্য ছিল জিডিপির হিসাবে প্রায় শূন্য। ২০২৫–২৬ সালে তা পৌঁছেছে জিডিপির প্রায় ৯১ শতাংশে।
নোটবন্দির ঘোষণায় সন্ত্রাসে অর্থ জোগানোর প্রসঙ্গও তুলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর প্রশ্ন ছিল, “কখনও ভেবে দেখেছেন, এই সন্ত্রাসবাদীরা টাকা পায় কোথা থেকে? সীমান্তের ওপারের শত্রুরা জাল নোট দিয়ে তাদের কর্মকাণ্ড চালায়। বছরের পর বছর ধরে এ সব চলছে। পাঁচশো আর হাজার টাকার জাল নোট ব্যবহার করতে গিয়ে বহুবার লোক ধরা পড়েছে। এমন অনেক নোট বাজেয়াপ্তও হয়েছে।”
ভারতীয় মুদ্রা জাল করা ঠেকানোও ছিল নোটবন্দির অন্যতম উদ্দেশ্য। এ ক্ষেত্রে ফল মিশ্র। বাজারে চালু প্রতি এক কোটি নোটের অনুপাতে কতগুলি জাল নোট ধরা পড়ে, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তার হিসাব রাখে। সব মূল্যমান মিলিয়ে ২০১৫–১৬ সালে প্রতি কোটি নোটে ধরা পড়েছিল ৭০.১টি জাল নোট। ২০২৫–২৬ সালে তা কমে হয়েছে ১৩.৪টি।
নোটবন্দির পরে সরকার ৫০০ ও ২,০০০ টাকার নতুন সিরিজের নোট বাজারে আনে। কথা ছিল, উন্নত সুরক্ষাব্যবস্থার ফলে নতুন নোট জাল করা আরও কঠিন হবে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হিসাবে, ২০১৬–১৭ সালে নতুন ৫০০ টাকার নোট চালু হওয়ার বছরে প্রতি কোটি নোটে এই মূল্যমানের জাল নোট ধরা পড়েছিল মাত্র ০.৩টি। ২০২৫–২৬ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০.১টিতে।
২,০০০ টাকার নোটের ক্ষেত্রে তুলনাটা কিছুটা কঠিন। ২০২৩ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বাজার থেকে এই নোট তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। পরিসংখ্যান বলছে, তার পর থেকেই ২,০০০ টাকার জাল নোট ধরা পড়ার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।
জাল নোট বেশি ধরা পড়ার দু’টি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে। জাল নোট তৈরির পরিমাণ বেড়ে থাকতে পারে। আবার জাল নোট চেনার পদ্ধতি উন্নত হলেও বেশি নোট ধরা পড়তে পারে। এই বৃদ্ধির পিছনে কোন কারণটি প্রধান, তা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট নয়।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।