দ্বিজেন্দ্রলাল রায় আজ বেঁচে থাকলে হয়তো চন্দ্রগুপ্ত নাটকের জনপ্রিয় এই সংলাপটি ‘সত্যিই সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ।’ বদলে লিখতেন ‘সত্যিই নরেন, কী বিচিত্র এই দেশের রাজনীতি।’
তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী লোকসভা সাংসদদের পরবর্তী পদক্ষেপ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে জল্পনা তুঙ্গে। দলবদল বা মূল দল দখলের কোনো চেষ্টা না করে, তাঁরা কেন ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই)-র মতো একটি রাজনৈতিকভাবে প্রায় ‘অপরিচিত’ বা ‘অস্তিত্বহীন’ দলে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে একাধিক প্রশ্ন উঠছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই আপাত-অবান্তর সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে গভীর আইনি হিসেবনিকেশ এবং দিল্লির ব্যাকস্টেজ রাজনীতি।
দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়ানোর আইনি ঢাল
সাম্প্রতিক অতীতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়কেরা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করেছিলেন, যা নিয়ে এখনও উচ্চ আদালতে আইনি লড়াই চলছে। লোকসভার বিদ্রোহী সাংসদদের থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক কাকলি ঘোষ দস্তিদার সেই একই ভুল বা দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতায় জড়াতে চাননি। ভারতের কঠোর দলত্যাগ বিরোধী আইনের কড়া ফাঁস এড়াতে এবং নিজেদের সাংসদ পদ সুরক্ষিত রাখতে তাঁরা মূল দল দাবি করার ঝুঁকি নেননি বরং কৌশলগতভাবে একটি পূর্ব-নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিজেদের মিশিয়ে দেওয়ার আইনি পথ বেছে নিয়েছেন।
নেপথ্যে বিজেপির সুচিন্তিত রাজনৈতিক ছক
রাজনৈতিক অলিন্দের খবর অনুযায়ী, এই বিদ্রোহী সাংসদদের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার নেপথ্যে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের মস্তিষ্ক ও পরামর্শ কাজ করেছে। দিল্লির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে বিদ্রোহীদের দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে, যেখানে নিশিকান্ত দুবের মতো প্রভাবশালী বিজেপি নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। বিজেপি এই মুহূর্তে বিদ্রোহীদের সরাসরি নিজেদের দলে টেনে কোনো আইনি জটিলতা বা বাড়তি রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করতে চায়নি। পদ্ম শিবিরের মূল লক্ষ্য হলো লোকসভায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিল পাসের ক্ষেত্রে তৃণমূলের এই বিদ্রোহী অংশের ভোট নিজেদের পক্ষে নিশ্চিত করা। তাই বিদ্রোহীদের একটি পৃথক প্ল্যাটফর্মে রেখে এনডিএ-র শক্তি বাড়ানোর এই সুদূরপ্রসারী ছক সাজানো হয়েছে।
তৃণমূলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ‘অসম্ভব’ লড়াই
সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা এবং কাঠামো সম্পূর্ণভাবে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রিক। ১৯৯৮ সালের দলীয় সংবিধান ও নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী, দলের সর্বময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা চেয়ারপার্সন এবং স্টেট এগজিকিউটিভ কমিটির হাতে ন্যস্ত। ফলে লোকসভায় সংসদীয় দলের রাশ বিদ্রোহীরা সাময়িকভাবে কেড়ে নিলেও, মূল দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়া প্রায় অসম্ভব। উপরন্তু, বিদ্রোহের আঁচ পেয়েই তৃণমূল নেত্রী তড়িঘড়ি সমস্ত পুরনো কমিটি ভেঙে নিজের অনুগতদের পদে বসিয়েছেন। ফলে দল দখলের কাল্পনিক ও নিষ্ফল লড়াইয়ে নেমে সময় নষ্ট করার চেয়ে বিদ্রোহীরা একটি বাহ্যিক দলের আশ্রয় নেওয়াকেই বাস্তবসম্মত মনে করেছেন।
উপসংহার
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাংসদ পদ বাঁচানোর আইনি বাধ্যবাধকতা, বিজেপির সুনিপুণ ব্যাকস্টেজ ম্যানেজমেন্ট এবং তৃণমূলের দলীয় সংবিধানের কঠিন বাস্তব- এই তিন সমীকরণ মিলিয়েই বিদ্রোহীরা এই ‘অস্তিত্বহীন’ নতুন দলে যোগদানের কৌশলকে বাস্তবায়িত করলেন।
বিজেপিতে না গিয়ে ‘অস্তিত্বহীন’ নতুন দলে বিদ্রোহীরা!
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় আজ বেঁচে থাকলে হয়তো চন্দ্রগুপ্ত নাটকের জনপ্রিয় এই সংলাপটি ‘সত্যিই সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ।’ বদলে লিখতেন ‘সত্যিই নরেন, কী বিচিত্র এই দেশের রাজনীতি।’ তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী লোকসভা…