প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই রাজধানীতে অবাধ চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারায় দিল্লি পুলিশের জারি করা সাতটি পৃথক নিষেধাজ্ঞার নির্দেশে এমনটাই উঠে এসেছে।

এর মধ্যে ছ’টি নির্দেশ জারি হয়েছিল ২০ আগস্ট অথবা তার ঠিক আগে-পরে। তার প্রায় এক মাস আগে, ২০ জুলাই, নিট-ইউজি ২০২৬-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে বিক্ষোভে হিংসা ছড়িয়েছিল নয়াদিল্লি জেলায়—যা রাজধানীর প্রশাসনিক ক্ষমতা ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র। অন্য একটি নির্দেশে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রাখার কথা বলা হয়েছে।

সর্বাধিক ৬০ দিনের জন্য জারি করা এই নিষেধাজ্ঞাগুলির মধ্যে আগস্টের নির্দেশগুলির মেয়াদ ছিল অক্টোবরের শেষার্ধ পর্যন্ত। সব ক’টি নির্দেশই দেওয়া হয়েছিল ‘একতরফা’ বা ‘এক্স-পার্টে’ পদ্ধতিতে—অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট কারও আপত্তি না শুনেই। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, “সংশ্লিষ্ট প্রত্যেককে আলাদা করে নোটিস দেওয়া সম্ভব নয়।”

দিল্লির পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমার সুপ্রিম কোর্টে যে হলফনামা জমা দিয়েছেন, তার সঙ্গেই এই নির্দেশগুলি পেশ করা হয়েছে। নির্দেশগুলিতে বলা হয়েছে, “প্রাপ্ত রিপোর্ট থেকে বোঝা যাচ্ছে, বর্তমানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবাধে জনসভা, মিছিল বা বিক্ষোভ ইত্যাদি আয়োজনের অনুমতি থাকলে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি হতে পারে, মানুষের নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে এবং জনশান্তি বিঘ্নিত হতে পারে।”

পুলিশের যুক্তি, “মানুষের জীবন বা নিরাপত্তার বিপদ এবং জনশান্তির বিঘ্ন ঠেকাতে” দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল।

সাতটি নির্দেশের আওতায় রয়েছে কনট প্লেস, তুঘলক রোড, পার্লামেন্ট স্ট্রিট, চাণক্যপুরী, বারাখাম্বা রোড, দক্ষিণ-পশ্চিম দিল্লির সফদরজং এনক্লেভ এবং ডিফেন্স কলোনি পুলিশ মহকুমা। এই এলাকাগুলির মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, রাষ্ট্রপতি ভবন, বিদেশি দূতাবাস এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

নিষেধাজ্ঞায় জনসভা করা, স্লোগান দেওয়া, বক্তৃতা করা, পিকেটিং বা ধর্না, পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত এবং আগ্নেয়াস্ত্র, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, লাঠি, বর্শা, তলোয়ার, দণ্ড, ইটের টুকরো ইত্যাদি বহন নিষিদ্ধ করা হয়।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ১০ ও ১১ অক্টোবরের বিক্ষোভ চলাকালীন দিল্লি পুলিশের নির্বিচার আটকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক আবেদনের জবাবে এই হলফনামা দিয়েছেন পুলিশ কমিশনার। আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন রাজনীতিক, বিভিন্ন দলের নেতা, সমাজকর্মী, আইনজীবী ও সাধারণ নাগরিক। তাঁদের মধ্যে আছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক এম এ বেবি, রাজ্যসভার সাংসদ এ এ রহিম, প্রবীণ আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী এবং আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠী।

আবেদনকারীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক নেতা, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, ছাত্রছাত্রী, যুবক-যুবতী, সাংবাদিক, আইনজীবী-সহ বহু মানুষকে নির্বিচারে আটক করে পুলিশ আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকার লঙ্ঘন করেছে।

তাঁদের দাবি, ওই বিক্ষোভের সময় প্রায় সাত হাজার মানুষকে বেআইনিভাবে গণহারে আটক করা হয়েছিল। দিল্লি মেট্রো-সহ গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহণ পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়ায় রাজধানীতে হাজার হাজার যাত্রী আটকে পড়েন। প্রধান সড়কগুলিতে ব্যাপক ব্যারিকেড বসানো হয় এবং বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়। আটকের অভিযানের মধ্যেই ১০ অক্টোবর দিল্লিগামী ট্রেনও বাতিল করা হয়েছিল।

আইনজীবী চাঁদ কুরেশির মাধ্যমে ত্রিপাঠী সুপ্রিম কোর্টে যুক্তি দেন, এভাবে পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া সর্বোচ্চ আদালতের ৯ অক্টোবরের নির্দেশের স্পষ্ট লঙ্ঘন। ওই নির্দেশে আদালত জোর দিয়ে বলেছিল, সার্বিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে সাধারণ যাত্রীদের কোনও রকম দুর্ভোগ বা কষ্টের মুখে ফেলা চলবে না।

এর পরেই সুপ্রিম কোর্ট দিল্লি পুলিশকে নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞার নির্দেশগুলি আদালতের নথিতে পেশ করতে বলে।

পুলিশ কমিশনার হলফনামায় বলেন, “নয়াদিল্লি জেলার সংবেদনশীলতার কথা মাথায় রেখে—যার মধ্যে যন্তর মন্তর, সংসদ ভবন, রাষ্ট্রপতি ভবন, ইন্ডিয়া গেট ইত্যাদি রয়েছে—এবং ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আগের দফার বিক্ষোভে যে ঘটনাগুলি ঘটেছিল, সেগুলি বিবেচনা করেই বিএনএসএসের ১৬৩ ধারায় নির্দেশ জারি করা হয়েছিল।”