স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলিতে, এমনকি স্বাধীনতার পরেও, ভারতের ছাত্ররাজনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিল আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া। তারপর আলাদা আলাদা সময়ে স্তব্ধ হয়ে যায় দুই ক্যাম্পাস। এখন দুই বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি। ক্যাম্পাসের রাজনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই কেন জরুরি, সংবাদ মাধ্যমকে জানালেন সেখানকার পড়ুয়া ও শিক্ষকেরা।

আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ ভবনের মঞ্চমুখী প্রতিটি বেঞ্চে ধুলোর পুরু আস্তরণ। প্রায় এক শতাব্দী ধরে যে হলঘরে ছাত্র সংসদের নির্বাচনী প্রচারে জাতীয়তাবাদ ও আত্মপরিচয় নিয়ে আবেগদীপ্ত বক্তৃতা প্রতিধ্বনিত হয়েছে, ২০১৮ সালে তা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। ঝাড়বাতিতে মাকড়সার জাল জমে, আলো নিভে যায়, নীচের লনে জমায়েত হওয়া ভিড় মিলিয়ে যায়। ঘরে পড়ে তালা।

আট বছর পরে, ২০১৮ সালের পর প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়—এএমইউ। আবার খুলে দেওয়া হয়েছে সুসজ্জিত সুবিশাল হলঘরটি, যা একদিন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনের প্রাণকেন্দ্র। ৫ নভেম্বরের নির্বাচনের কয়েক দিন আগে, এক বৃহস্পতিবারের দুপুরে, কয়েক জন কর্মী ব্যস্ত তিন থাকের ঝাড়বাতিগুলির বাল্ব বদলাতে ও পরীক্ষা করতে। খোলা জানালা দিয়ে আসা রোদে ঝলমল করছে ঝাড়বাতি। মঞ্চে একটি টেবিল আর কারুকাজ করা তিনটি কাঠের চেয়ার। বাইরে রেলিংয়ের পারস্যরীতির জালিকাজে লাগানো রুপোলি রং তখনও শুকোয়নি।

এর কয়েক ঘণ্টা পরে, প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে দিল্লির আর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়লেন পড়ুয়ারা। তাঁদের নেতৃত্বে ১৯ দিনের আন্দোলনের পরে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার কর্তৃপক্ষ রাজি হয়েছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করাতে। ২০০৫ সালের পর এই প্রথম।

চল্লিশ দিনেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলনে উত্তাল ছিল এএমইউ ও জামিয়া। দেশের মুসলিম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে এই দু’টির মতো ইতিহাসসমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান সম্ভবত কমই আছে। স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে দু’টিরই সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য; একটির জন্ম অন্যটির ভিতর থেকে। দুই ক্যাম্পাসের ছাত্রছাত্রীদের দাবি ছিল এক—নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে। সেই দাবি তাঁরা আদায় করে নিয়েছেন।

জামিয়ার জন্ম :

প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ মহম্মদ আদিব ১৯৬৭-৬৮ সালে এএমইউ ছাত্র সংসদের সভাপতি ছিলেন। তাঁর এক অভিনব শখ—ছাত্র সংসদের পুরনো বৈঠকের কার্যবিবরণী পড়া।

সেই সব কার্যবিবরণীর পাতা উল্টে তিনি ফিরে যান ১৯২০ সালের ১২ অক্টোবরের এক তুমুল উত্তেজনাপূর্ণ বৈঠকে। ছাত্র সংসদ ভবনের নাম তখন সিডন্স ইউনিয়ন হল। ছাত্রসমাজ দুই শিবিরে বিভক্ত। হলঘর গর্জে উঠছে।

এক পক্ষ চাইছিল ব্রিটিশ পৃষ্ঠপোষকতার ছত্রচ্ছায়ায় থেকে যেতে। প্রতিষ্ঠানটির নাম তখন মহমেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল বা এমএও কলেজ; ব্রিটিশ পৃষ্ঠপোষকতা পেত সেটি। অন্য পক্ষ ইউনিয়ন জ্যাকের নীচে পড়াশোনা করতে রাজি ছিল না। ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের বৃহত্তর পটভূমিতে গাঁধী এসেছিলেন প্রথম পক্ষকে বোঝাতে—ইংরেজের পৃষ্ঠপোষকতা বর্জন করে জাতীয় আন্দোলনে যোগ দিতে হবে।

আদিবের কথায়, গাঁধীকে শুনতে হয়েছিল বিদ্রুপ ও দুয়োধ্বনি। সেখানে উপস্থিত ছিলেন খিলাফত আন্দোলনের দুই প্রভাবশালী নেতা, কলেজের প্রাক্তনী শওকত ও মহম্মদ আলি—যাঁরা আলি ভ্রাতৃদ্বয় নামে পরিচিত। ছিলেন তৎকালীন জনপ্রিয় ছাত্রনেতা জাকির হুসেনও, যিনি পরে স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রপতি হবেন।

আদিব বলেন, “গাঁধীকে অপমানিত হতে দেখে ওঁদের, অর্থাৎ আলি ভাইদের, চোখ দিয়ে জল গড়াতে শুরু করেছিল।”

জাকির হুসেনের মুখ তখন লাল, চোখেমুখে অশ্রুর রেখা। সেই মুহূর্তে তিনি সিদ্ধান্ত নেন। আদিব বলেন, “জাকির হুসেনের নেতৃত্বে বাইশ জন ছাত্র সে দিন সিডন্স হল থেকে বেরিয়ে যান।”

মাত্র সতেরো দিন পরে এমএও কলেজের এই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং তাঁদের কয়েক জন শিক্ষক আলিগড়ের লাল ডিগি এলাকার কৃষ্ণ কোঠিতে প্রতিষ্ঠা করেন জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া। পরে বিশ্ববিদ্যালয়টি দিল্লিতে চলে আসে। অন্য দিকে, জাতীয়তাবাদীদের এই প্রস্থানে ব্রিটিশ পৃষ্ঠপোষকতায় চলা এমএও কলেজের এএমইউ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া আরও গতি পায়—স্বতন্ত্র পরিচয়ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ধারক এক বিশ্ববিদ্যালয়।

ছাত্ররাজনীতির পুনরুজ্জীবন নিয়ে আলোচনা উঠলেই দুই ক্যাম্পাসে ফিরে আসে এই ইতিহাস—এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর থেকে অন্যটির জন্মের কাহিনি।

জামিয়ার প্রেমচন্দ আর্কাইভস অ্যান্ড লিটারারি সেন্টারের প্রাক্তন অধিকর্তা সাবিহা জাইদি বলেন, “জামিয়া প্রতিষ্ঠার নেতৃত্বেই ছিলেন ছাত্রেরা। তাই যখনই জামিয়ায় ছাত্রবিক্ষোভ দেখি—তা সে ২০১৯ সালের সিএএ-এনআরসি-বিরোধী আন্দোলন হোক বা সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদের দাবিতে আন্দোলন—আমার মনে পড়ে সেই ছাত্রদের কথা, যাঁরা জামিয়া গড়ে তোলার জন্য লড়েছিলেন।”

এএমইউ-র রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক মহিবুল হকের মতে, মুসলিম নেতৃত্ব গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু, ১৯২০ সালের বিদ্রোহ ছিল তারই অনিবার্য পরিণতি।

অধ্যাপক হক বলেন, “ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে অগ্রহণযোগ্য বলে দেখাতে প্রায়ই স্যার সৈয়দ আহমদ খানের নাম টানা হয়। বলা হয়, তিনি ক্যাম্পাসকে রাজনীতির আওতায় আনতে চাননি। কিন্তু মহম্মদ আলি জওহর এই ধারণা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আমার বিশ্বাস, খিলাফত আন্দোলনই এএমইউ-র সবচেয়ে বড় অবদান।” মহম্মদ আলি জওহর ছিলেন খিলাফত আন্দোলনের আলি ভ্রাতৃদ্বয়ের ছোট ভাই।

এএমইউ-র সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা বিশ্ববিদ্যালয়টির রাজনৈতিক চরিত্রের সাক্ষ্য হিসেবে ছাত্র সংসদ ভবনটির দিকে আঙুল তোলেন। ১৮৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত সিডন্স ক্লাবের ঠিকানা ছিল এই ভবন। এমএও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হেনরি জর্জ ইম্পে সিডন্সের নামে ক্লাবটির নামকরণ।

ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বিতর্কসভা থেকে অনুপ্রাণিত এই ক্লাবে ছাত্রেরা সমসাময়িক নানা প্রশ্ন নিয়ে তর্কবিতর্ক করতেন।

অধ্যাপক হক ইকবালের একটি উদ্দীপনাময় দ্বিপদী উদ্ধৃত করেন। বলা হয়, ১৯১৯-২০ সালে এমএও-র প্রতিষ্ঠাতা স্যার সৈয়দ আহমদ খানের স্মরণে সেটি আবৃত্তি করেছিলেন আলি জওহর—“তুমহি নে কওম কো শিখায়া থা ইয়ে শোর ও শর সারা, জো ইসকি ইন্তেহা হম হ্যায়ঁ তো ইসকি ইবতিদা তুম থে।”

অর্থাৎ, “এই জাতিকে এই কোলাহল, এই আলোড়ন তুমিই শিখিয়েছিলে; আমরা যদি তার চূড়ান্ত পরিণতি হই, তবে তার সূচনা ছিলে তুমি।”

নেতৃত্বের খোঁজে:

এএমইউ-র ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রচার শেষ পর্বে। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ক্যান্টিনের পাশে একটি কুসুমগাছের তলাতেই এখন সবচেয়ে বেশি তৎপরতা। একের পর এক প্রার্থী সেখানে আসছেন, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মিশছেন। চা-শিঙাড়ার সঙ্গে চলছে কথাবার্তা। এই প্রার্থীদের অনেকেরই ক্যাম্পাসের রাজনীতির অভিজ্ঞতা নেই; ছাত্র সংসদ নির্বাচন তো আরও দূরের কথা।

অর্থনীতির পিএইচডি গবেষক আমিনা ইরশাদ এএমইউ ছাত্র সংসদের সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কিছুটা “অভিজ্ঞতা” আছে বলে দাবি করতে পারেন, এমন অল্প কয়েক জনের মধ্যে তিনি একজন। স্নাতক স্তরে জামিয়ায় পড়েছেন; স্নাতকোত্তর পড়তে এসেছিলেন এএমইউ-তে। দু’টি ক্যাম্পাসকেই নিজের বলে মনে করেন।

আমিনা বলেন, “জামিয়ায় যখন পড়তাম, তখন জানতামই না ইউনিয়ন বলে কিছু হয়। আলিগড়ে এসে জানলাম, এমন একটা জায়গা আছে, যেখানে আমরা আমাদের সমস্যার কথা বলতে পারি। সেই আপন হওয়ার অনুভূতি, শুধু ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট সেই পরিসর, আমাকে ভীষণ আশাবাদী করেছিল।”

দুই ক্যাম্পাসের বহু পড়ুয়ার রাজনীতি ও ছাত্রদের সংগঠিত করা সম্পর্কে ধারণা গড়ে উঠেছে ২০১৯ সালের সিএএ-বিরোধী আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের অভিজ্ঞতা থেকে।

আমিনা বলেন, “তখন আমি এএমইউ-র ছাত্রী। কিন্তু আন্দোলনকারীদের সমর্থন জানাতে জামিয়ায় গিয়েছিলাম। তখন বুঝেছিলাম, ইউনিয়ন না থাকায় জামিয়ার কর্তৃপক্ষ কী ভাবে নিজেদের খুশিমতো সব কিছু করছে। যে ক্যাম্পাস ছাত্রছাত্রীদের নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা, সেখানেই পুলিশ ঢুকে তাঁদের মারধর করল।”

সে বছরের ১৫ ডিসেম্বর জামিয়ায় পুলিশি অভিযানের কথাই বলছিলেন তিনি। নিরাপত্তাবাহিনী ক্যাম্পাসে ঢুকে গ্রন্থাগার-সহ বিভিন্ন জায়গায় কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। বহু পড়ুয়া আহত হন।

অনেকের আশা, দুই ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি ফিরে এলে শেষ পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা পূরণ হতে পারে—মুসলিম সমাজে নেতৃত্বের অভাব।

এএমইউ ও জামিয়ার প্রাক্তন ছাত্রনেতারা কী ভাবে পরে মূলধারার রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন, সেই উদাহরণ তুলে ধরেন তাঁরা। এএমইউ-তে বারবার আসে সমাজবাদী পার্টির আজম খানের নাম। সত্তরের দশকে তিনি এএমইউ ছাত্র সংসদের সাম্মানিক সম্পাদক ছিলেন। উঠে আসে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আরিফ মহম্মদ খানের নামও; তিনি ১৯৭২-৭৩ সালে ছাত্র সংসদের সভাপতি ছিলেন।

সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট-অন-রেকর্ড ফুজ়াইল আয়ুবি একবিংশ শতকের প্রথম কয়েক বছরে জামিয়ার ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। জামিয়ার ছাত্র সংসদ থেকে সংসদীয় রাজনীতিতে উঠে আসার উদাহরণ হিসেবে তিনি সমাজবাদী পার্টির বিধায়ক কমল আখতার ও প্রাক্তন কংগ্রেস সাংসদ দানিশ আলির নাম করেন।

দুই ক্যাম্পাসেই অনেকের বক্তব্য, বছরের পর বছর ছাত্ররাজনীতি না থাকায় জাতীয় ও রাজ্য রাজনীতিতে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব কমেছে।

জামিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পিএইচডি গবেষক উজমা পারভিন সাম্প্রতিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “ঐতিহাসিক ভাবেই জামিয়ার সঙ্গে জনজীবনে নেতৃত্ব দেওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু নির্বাচিত ছাত্র সংসদ না থাকায় সেই পথ সংকুচিত হয়েছে। সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা অর্জন, সমর্থনের ভিত্তি তৈরি এবং ক্ষোভকে কী ভাবে রাজনৈতিক দাবিতে রূপান্তরিত করতে হয়, তা শেখার সুযোগ হারাচ্ছেন ছাত্রছাত্রীরা।”

২০১৮ সালে এএমইউ ছাত্র সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন সালমান ইমতিয়াজ়। সিএএ-এনআরসি আন্দোলন ও কোভিড অতিমারির পরে নির্বাচন স্থগিত হয়ে যাওয়ার আগে তিনিই শেষ নির্বাচিত সভাপতি। তাঁর কাছে ছাত্র সংসদ হল অর্থবল ও প্রভাবশালী যোগাযোগ না থাকা পড়ুয়াদের রাজনীতিতে প্রবেশের একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথ। নিজেকেও সেই পড়ুয়াদের একজন বলে মনে করেন তিনি।

২০২২ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে আলিগড় শহর কেন্দ্র থেকে কংগ্রেসের প্রার্থী হয়েছিলেন ইমতিয়াজ়। এ বারও টিকিট পাওয়ার আশা করছেন।

একদা দুই ক্যাম্পাসে :

এএমইউ ও জামিয়ার পুরনো দিনের মানুষেরা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বলেন, যার সঙ্গে বৃহত্তর পৃথিবীর নিবিড় যোগাযোগ ছিল।

ষাটের দশকের নির্বাচনের কথা মনে করে আদিব বলেন, “প্রতিটি নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের তাৎক্ষণিক ভাবে একটি বিষয় দেওয়া হত। প্রস্তুতির জন্য সময় পেতেন পনেরো মিনিট। তখন তো গুগল ছিল না। যিনি নির্ভয়ে কথা বলতে পারতেন, সাধারণত তিনিই জিততেন।”

আলিগড় গেজেট ও দ্য আলিগারিয়ান-সহ কয়েকটি অত্যন্ত প্রভাবশালী প্রকাশনায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশ্ন নিয়ে প্রবন্ধ ছাপা হত। সেই লেখাগুলিই বহু বিতর্কের রসদ জোগাত।

এএমইউ-র আধুনিক ইতিহাসের শিক্ষক মহম্মদ সাজ্জাদ বলেন, “সত্তর ও আশির দশকে, এমনকি তার আগেও, মুসলিম সমাজ ও দেশের নানা বিষয় নিয়ে ছাত্র সংসদে, প্রচারপত্রে, নির্বাচনী বক্তৃতায় আলোচনা হত। জেপি আন্দোলন ও জরুরি অবস্থার সময়ে ক্যাম্পাস ছিল তুমুল আলোড়িত। সত্তরের দশকে এএমইউ আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যালঘু চরিত্র নিয়ে লড়াই আর এক ঢেউ তুলেছিল… জয়প্রকাশ নারায়ণকে এএমইউ ছাত্র সংসদের আজীবন সদস্যপদ দেওয়া হয়েছিল।”

আদিবের মনে আছে, ১৯৬৬ সালে উচ্চশিক্ষা নিয়ে কোঠারি কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হলে এএমইউ ছাত্র সংসদ কী ভাবে সেটি পঙ্‌ক্তি ধরে ধরে বিশ্লেষণ করেছিল। তাঁর স্মৃতিতে, বারবার ফিরে আসত একটি প্রশ্ন—বহুত্ববাদী, গণতান্ত্রিক ভারত গড়ে তুলতে মুসলিমরা কী অবদান রাখতে পারেন?

অন্যেরা এমন এক সময়ের কথা বলেন, যখন দুই ক্যাম্পাসেই তীব্র আন্দোলন হত, কিন্তু সেগুলি দমন করার ঘটনা ছিল বিরল।

প্রাক্তন আমরোহা সাংসদ দানিশ আলি নব্বইয়ের দশকে জামিয়ার ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। সেই উত্তেজনাপূর্ণ দিনগুলির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমাদের ইউনিয়ন বিভিন্ন দলের নেতাদের ক্যাম্পাসে আমন্ত্রণ জানাত। মণ্ডল-বিরোধী আন্দোলনের সময়েও তা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যৌথ ভাবে এই আমন্ত্রণ জানানো হত।”

বর্তমানে ইতিহাসের গবেষক শোয়েব নিয়াজ়ি যখন ২০০৭ সালে জামিয়ায় ভর্তি হন, তত দিনে ছাত্র সংসদ স্থগিত হয়ে গিয়েছে। ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং বিপুল পুলিশ মোতায়েনকে ঘিরে বড় সংঘাতের পরে ২০০৬ সালের ৩১ মার্চ জামিয়ার ছাত্র সংসদ আনুষ্ঠানিক ভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।

নিয়াজ়ি বলেন, “ইউনিয়ন উঠে গেলেও ক্যাম্পাসে বাম রাজনীতির যথেষ্ট উপস্থিতি ছিল। আমি আইসা-য় ছিলাম। গুজরাত দাঙ্গা বা প্যালেস্টাইনের মতো বিষয় নিয়ে বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে মিলে সভা করার অনুমতি তখনও পেতাম। কিন্তু সাধারণত জেএনইউ থেকে আমাদের কমরেডরাই এসে পড়ুয়াদের সংগঠিত করতেন। জামিয়ায় সে ভাবে কোনও নেতা ছিলেন না; ছাত্ররাজনীতিকেও নেতিবাচক চোখে দেখা হত। বাটলা হাউস এনকাউন্টারের পরে এই পরিসরটুকুও সংকুচিত হয়, ছাত্ররাজনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।”

আইসা হল সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্র সংগঠন। নিয়াজ়ি যে ২০০৮ সালের বাটলা হাউস এনকাউন্টারের উল্লেখ করছেন, তাতে জামিয়ার এক ছাত্র নিহত হয়েছিলেন।

জামিয়ার তুলনায় এএমইউ-তে ছাত্ররাজনীতির পরিসর বেশি ছিল। বারবার ছেদ পড়লেও, এক দশকেরও কম সময় আগে পর্যন্ত সেখানে নির্বাচন হয়েছে। তা সত্ত্বেও ছাত্রনেত্রী নাশরা নাঈম মনে করেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জামিয়া একটি সুবিধা পেয়েছে।

এএমইউ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি পদপ্রার্থী নাশরা বলেন, “জামিয়া দিল্লিতে। বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সেখানকার পড়ুয়াদের যোগাযোগ হয়। ওঁরা রাজনৈতিক ভাবে বেশি সক্রিয়, সমাজের সঙ্গে বেশি যুক্ত। এএমইউ একেবারেই অন্য রকম। এখানে কোনও সংগঠন নেই… চিন্তাগত নেতৃত্বের অভাব রয়েছে আমাদের।”

আলিগড় ও জামিয়ার সামনে কী?

কঠিন লড়াই করে নির্বাচন আদায় করা ছাত্রছাত্রীদের কাছে অবশ্য প্রশ্নটি শুধু পুরনো ব্যবস্থা “ফিরিয়ে আনা” নয়; তাকে বদলে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও।

আমিনা ও নাশরা যেমন এমন একটি জায়গা পাওয়ার জন্যও লড়ছেন, যা তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে মহিলাদের জন্য কখনও খোলেনি। এএমইউ ছাত্র সংসদের সভাপতি, সহ-সভাপতি ও সম্পাদক—এই তিন শীর্ষপদে কখনও কোনও মহিলা নির্বাচিত হননি।

নাশরা বলেন, তাঁর বাবা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। মেয়ের নির্বাচনে দাঁড়ানোর ইচ্ছার কথা শুনে তিনি সংশয়ে পড়েছিলেন।

নাশরার কথায়, “প্রথমে বলেছিলাম, সভাপতি পদে দাঁড়াতে চাই। কিন্তু বাবা বললেন, সেটা খুব কঠিন হবে। ইউনিয়ন ফিরে আসার পরপরই ক্যাম্পাস একজন মহিলা সভাপতিকে মেনে নেবে, এমন সম্ভাবনা কম। আমি যেহেতু জেতার জন্যই লড়ছি, তাই সহ-সভাপতি পদকে লক্ষ্য করলাম।”

অন্য দিকে, সভাপতি পদে দাঁড়ানো আমিনার বক্তব্য, প্রতিষ্ঠিত “প্রথা”গুলির মুখোমুখি দাঁড়িয়েই তিনি লড়তে চান।

তিনি বলেন, “আন্দোলনের সময়ে সকলেই ‘বহেনো’, অর্থাৎ বোনেদের, সমর্থন চান। কিন্তু মহিলারা যখন সহ-সভাপতি বা সভাপতি পদে দাঁড়ান, তখন প্রশ্ন ওঠে, তাঁরা প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন কি না।”

ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের মতে, চ্যালেঞ্জ জানানো দরকার আরও কিছু “প্রথা”কেও।

বহু দিন ধরে এএমইউ ছাত্র সংসদের নির্বাচন চলে বিভিন্ন লবির প্রভাবে। গোন্ডা-বস্তি, সীমাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল, কাশ্মীর ও কেরল থেকে আসা পড়ুয়াদের নিয়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন আঞ্চলিক যোগাযোগের জাল। প্রতিটি গোষ্ঠীরই নিজস্ব বাঁধা ভোট রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অধ্যাপকের মতে, জামিয়ার ছবিও একই রকম। তিনি বলেন, “জামিয়ার নির্বাচন ও ছাত্ররাজনীতি বরাবরই আঞ্চলিক গোষ্ঠী এবং বিভেদকামী, নিজেদের গণ্ডিতে আবদ্ধ রাজনীতির অভিশাপ বহন করেছে। শেষ পর্যন্ত তা হিংসা বা অশান্তিতে গড়ায়। ওরা অদূরদর্শী, স্বার্থপর উদ্দেশ্যে লড়াই করে। প্রায়ই তার মূল্য দিতে হয় বৃহত্তর জামিয়া সমাজকে, তার ভবিষ্যৎকে।”

এএমইউ-র অধ্যাপক সাজ্জাদ আরও বড় একটি উদ্বেগের কথা তোলেন। তাঁর বক্তব্য, “মুসলিম অভিজাতদের মধ্যে একটি বৃহত্তর ব্যাধি রয়েছে—আজ আমাদের সামনে যে সব সমস্যা, সেগুলি নিয়ে নীরব থাকা। হয় তাঁরা ভয় পাচ্ছেন, নয়তো তাঁদের কিছুই যায় আসে না… ক্যাম্পাসের দুর্নীতি এবং সংখ্যালঘুদের উদ্বেগের বৃহত্তর বিষয়গুলি—এসআইআর, প্রশ্নপত্র ফাঁস, গণপিটুনিতে হত্যা—নিয়ে রয়েছে অপরাধসম নীরবতা; প্রতিবাদ ও পদক্ষেপ হয় ক্ষীণ, নয়তো অপর্যাপ্ত।”

অনেকের আশা, আসন্ন নির্বাচন মুসলিম সমাজের ভিতর থেকে উঠে আসা কিছু মানুষকে সেই কণ্ঠস্বর খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।

এএমইউ ছাত্র সংসদের শেষ নির্বাচিত সভাপতি ইমতিয়াজ় বলেন, “আমার আশা, অদূর ভবিষ্যতে এএমইউ ও জামিয়া থেকেই মুসলিম নেতৃত্বের নতুন আদর্শ উঠে আসবে। ভারতে নৈতিক দৃঢ়তাসম্পন্ন রাজনৈতিক আলোচনাকে নতুন জীবন দেবে তারা।”