“তোমাদের ঠাকুরজি দেখি সব ছবিতেই এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। দাঁড়ান যখন, তখনও তিন জায়গায় বাঁকা। এক পায়ের উপর আর এক পা, কোমরটা এক দিকে বেঁকে আছে, তার পরে ঘাড় বেঁকিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছেন।” মধ্যপ্রদেশের শিবপুরী জেলার করেরায় রামকথার আসরে এভাবেই শ্রীকৃষ্ণের ত্রিভঙ্গ রূপের বর্ণনা দিয়েছিলেন বাগেশ্বর ধামের প্রধান পুরোহিত ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী। সেই আসরের একটি ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই প্রতিবাদ জানিয়েছেন মথুরার একাধিক সাধুসন্ত। তাঁদের আপত্তি, রামের মহিমা বোঝাতে গিয়ে কৃষ্ণকে এমন করে ছোট করার কী প্রয়োজন? বিতর্কের মুখে ‘বাগেশ্বর বাবা’ নামে পরিচিত এই কথক ভক্তদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।
ভিডিওয় শোনা যায়, কৃষ্ণের দাঁড়ানোর ভঙ্গির বর্ণনা শেষ করে শাস্ত্রী বলছেন, “আমাদের রাম একেবারে সোজা হয়ে দাঁড়ান। তাঁর নামও সোজা, সোজা তাকান, সোজা হাঁটেন। আর তোমাদের ঠাকুর বাঁকা, তাকানও বাঁকা, হাঁটেনও বাঁকা।” অযোধ্যা আর বৃন্দাবনের নাম দুটিও তাঁর তুলনা থেকে বাদ যায়নি। শাস্ত্রীর কথায়, ‘অযোধ্যা’ নামটি উচ্চারণ করতেও সহজ, সোজা। আর কৃষ্ণের ধামের নাম, তাঁর মতে, ঠাকুরের মতোই বাঁকা। তার পর শাস্ত্রী ফেরেন দুই দেবতার হাতের ধনুক আর বাঁশির প্রসঙ্গে। মঞ্চেই ছিলেন এক বংশীবাদক। তাঁকে দেখিয়ে শাস্ত্রী বলেন, “বাঁশি বাজানো তো খেলা। ধনুক চালানো খেলা নয়। তোমাদের ঠাকুরজি বাঁশি বাজান, তাতে এমন কী হল? ওই তো মঞ্চেও এক জন বাঁশি বাজাচ্ছেন।”
মথুরার যে সাধুসন্তেরা এই মন্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন, তাঁদের বক্তব্য, রাম ও কৃষ্ণ একই ভগবানের দুই রূপ। এক জনকে ‘আমাদের’, অন্য জনকে ‘তোমাদের’ বললে ভক্তদের মধ্যেও ভেদাভেদ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যে বাঁশি আর ত্রিভঙ্গ মূর্তিতে ভক্তেরা তাঁদের আরাধ্যকে চেনেন, সেই দুই প্রসঙ্গেই শাস্ত্রীর ভাষা বেছে নেওয়া উচিত ছিল আরও যত্ন করে। মথুরার বাইরেও প্রতিবাদ হয়েছে। গোয়ালিয়রে যাদব সম্প্রদায়ের কয়েক জন প্রতিনিধি পুলিশের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে শাস্ত্রীর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরের দাবি জানিয়েছেন।
আলাদা একটি ভিডিওয় শাস্ত্রী কথাগুলির অন্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, তিনি একটি ভক্তিপদ ব্যাখ্যা করছিলেন। সেখানে ভক্ত তাঁর ঠাকুরের সঙ্গে মান-অভিমানের সুরে কথা বলছেন। সেই প্রসঙ্গ ছেড়ে শুধু কয়েকটি কথা তুলে নেওয়াতেই শ্রোতাদের একাংশ অন্য অর্থ করেছেন। শাস্ত্রী বলেন, “আমরা বিনয়ের সঙ্গে জানাতে চাই, ভগবান রাম আর ভগবান কৃষ্ণের মধ্যে কোনও ভেদ করার ইচ্ছে আমাদের ছিল না।” তাঁর কথায় কারও মনে আঘাত লেগে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
বক্তব্য বোঝাতে শাস্ত্রী ব্রজের গোপীদের কথা টেনেছেন। কৃষ্ণের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল বলেই সখীরা তাঁকে অনায়াসে অনুযোগ করতে পারতেন, তাঁকে নিয়ে ঠাট্টাও করতেন। ভক্তকবি সূরদাসের পদের দৃষ্টান্ত দিয়ে শাস্ত্রী বলেন, ভ্রমরগীতে গোপীরা তো কালো ভোমরাটিকেও কৃষ্ণের সঙ্গে মিলিয়ে টিপ্পনী কেটেছেন। তাঁর দাবি, তিনিও সেই ব্রজের ভক্তিধারার মানুষ। কৃষ্ণকে আপন জেনেই কথাগুলি বলেছিলেন। এই রীতিকে তিনি বলেছেন ‘ব্যঙ্গস্তুতি’, যেখানে ভক্তের মুখে আপাত নিন্দার কথাতেও তাঁর আরাধ্যের স্তুতি শোনা যায়। তবে মুখ ফসকে কথা বেরিয়ে যাওয়ার কথাও মেনেছেন শাস্ত্রী। তাঁর কথায়, কখনও উৎসাহের বশে, কখনও ভক্তির আবেগে কথা বলতে গিয়ে ভুল হয়ে যায়।
বাংলায় মাত্র দু’মাস আগেও শাস্ত্রীর এক ধর্মসভাকে ঘিরে বিতর্ক হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে হাওড়ার লিলুয়ায় এসে তিনি দুর্গাপুজোর সময় মাছ-মাংস রান্না ও খাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলেন। পুজোর দিনেও যাঁরা আমিষ খান, তাঁদের সম্পর্কে ‘পাখণ্ডী’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন তিনি। জবাব এসেছিল রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কাছ থেকেই। অষ্টমীর লুচি আর নবমীর পাঁঠার মাংসের প্রসঙ্গ তুলে শমীক বলেছিলেন, বাঙালি বরাবর যা খেয়ে এসেছে, তাই খাবে। এ রাজ্যে দেবী কালীর ভোগেও যে পাঁঠার মাংস দেওয়ার রীতি আছে, সে কথাও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন শমীক। কোনও সাধু নিরামিষ খাওয়ার পরামর্শ দিতেই পারেন। কিন্তু নিজের বাড়িতে কে কী খাবেন, তা কোনও সাধু বা রাজনৈতিক দল ঠিক করে দেবে কেন?
শিরডির সাঁইবাবাকে নিয়ে শাস্ত্রীর মন্তব্যেও ভক্তরা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। ২০২৩ সালের এপ্রিলে জব্বলপুরে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, সাঁইবাবাকে সাধু বা ফকির বলা যায়, ভগবান বলা যায় না। মহারাষ্ট্রের তৎকালীন রাজস্বমন্ত্রী রাধাকৃষ্ণ ভিখে পাটিল শাস্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলেন। পরে শাস্ত্রী জানান, কেউ ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকে কোনও সাধুকে ভগবান জ্ঞানে পুজো করলে তাঁর আপত্তি নেই। নিজের কথায় যাঁদের আঘাত লেগেছে, তাঁদের কাছে সে বারও দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
ওই বছরের জানুয়ারিতে নাগপুরে শাস্ত্রীর একটি অনুষ্ঠান নিয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছিলেন কুসংস্কারবিরোধী আন্দোলনের কর্মী শ্যাম মানব। তাঁর অভিযোগ ছিল, ভক্তদের সামনে অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনের দাবি করে কুসংস্কার ছড়াচ্ছেন শাস্ত্রী। নাগপুরের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার অমিতেশ কুমার জানান, অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য ও অনুষ্ঠানের ভিডিও খতিয়ে দেখে মহারাষ্ট্রের কালাজাদুবিরোধী আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কিছু মেলেনি।
এ বছর জুলাইয়ে অন্য একটি ঘটনাতেও শাস্ত্রীকে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে হয়। মধ্যপ্রদেশের ছতরপুরে দুই গোষ্ঠীর বিবাদের জেরে মারধর ও গুলি চালানোর ঘটনায় তাঁর ছোট ভাই শালিগ্রাম গর্গের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। ধীরেন্দ্র তখন বলেন, ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নেই। দোষীর কঠোর শাস্তি হোক, তবে পরিবারের প্রত্যেকটি ঘটনায় যেন তাঁকে টেনে আনা না হয়।
এ বারের বিতর্কে কৃষ্ণের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক বোঝাতে শাস্ত্রী শেষ পর্যন্ত মনে করিয়ে দিয়েছেন তাঁর নিজের নামটিই। “আমি কৃষ্ণের বিরোধী নই। তিনি আমাদের ঠাকুরজি। কৃষ্ণজন্মভূমির পক্ষে আমরা নিজেরাই বারবার সরব হয়েছি। আমার নিজের নামের মধ্যেই তো তাঁর নাম। তাঁর জন্যই আমাদের জীবন সার্থক।” রাম আর কৃষ্ণকে আলাদা করে দেখানোর অভিযোগের জবাবে তাঁর প্রশ্ন, “ভগবানকে আমরা ভাগ করতে যাব কেন?”
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।