ভারতে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আর কেবল নির্দিষ্ট ঋতু বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের (সিএসই) ‘ক্লাইমেট ইন্ডিয়া ২০২৬’ রিপোর্ট অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশের কোথাও না কোথাও চরম আবহাওয়া ঘটেছে ২৭৩ দিনের মধ্যে ২৫১ দিন। অর্থাৎ প্রথম ৯ মাসের প্রায় ৯২ শতাংশ দিনেই দেশের কোনও অংশে বন্যা, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ, শৈত্যপ্রবাহ, বজ্রপাত, ঝড় বা ধসের মতো ঘটনা ঘটেছে। রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছে ৪ নভেম্বর।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, ওই সময়ে এসব ঘটনায় ৩,২২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমির পরিমাণ ৪২.৫ লক্ষ হেক্টর। ১ লক্ষ ২৮ হাজারের বেশি বাড়ি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাপপ্রবাহ, শৈত্যপ্রবাহ, বজ্রপাত, ঝড় ও বন্যার মতো ঘটনায় মারা গিয়েছে ৪৭ হাজারেরও বেশি গবাদি পশু।

এই হিসাবটি সিএসই-র সংকলিত তথ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি সরকারি বিপর্যয়-পরিসংখ্যানের বিকল্প নয়; বরং দেশের নানা প্রান্তে আবহাওয়াজনিত ঘটনার বিস্তার ও প্রভাব বোঝার একটি মূল্যায়ন।

পাঁচ বছরের ধারা ও রাজ্যভিত্তিক ছবি

রিপোর্টে ২০২২ থেকে ২০২৬, এই পাঁচ বছরের প্রবণতাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেই সময়ে চরম আবহাওয়ায় ১৬ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং ২ কোটি ৬ লক্ষ হেক্টরেরও বেশি ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। মোট ১,৩৬৬ দিনের তথ্য নিয়ে এই মূল্যায়ন। তাতে দেখা যাচ্ছে, চরম আবহাওয়ার দিনের অনুপাত ২০২২ ও ২০২৩ সালে ছিল ৮৬ থেকে ৮৮ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৯৩ এবং ২০২৫ সালে ৯৯ শতাংশ। পাঁচ বছরে মৃত্যুর প্রায় ৬৫ শতাংশ হয়েছে ২০২৪ থেকে ২০২৬-এর মধ্যে। ফসলের ক্ষতির ৮২ শতাংশেরও বেশি ওই তিন বছরের।

রিপোর্টে আবহাওয়ার ঋতুভিত্তিক পরিবর্তনের দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি ছিল ১৯০১ সালের পর দেশের সবচেয়ে শুষ্ক ফেব্রুয়ারি। একই সঙ্গে ১২৫ বছরের মধ্যে চতুর্থ উষ্ণতম ফেব্রুয়ারি হিসেবেও মাসটি নথিবদ্ধ হয়েছে। এই ধরনের পরিবর্তন কৃষিকাজ, পানীয় জলের জোগান এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্ষার পরিসংখ্যানেও একটি বৈপরীত্য উঠে এসেছে। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বৃষ্টির পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে ১৩ শতাংশ কম ছিল। কিন্তু বর্ষার ১২২ দিনের প্রতিটিতেই দেশের অন্তত একটি জায়গায় ভারী বৃষ্টি, বন্যা বা ধসের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ দেশের গড় বৃষ্টির পরিমাণ কম হলেই সব অঞ্চলে জলাভাব ছিল, এমন নয়। কোনও অঞ্চলে বৃষ্টি কমেছে, অন্য কোথাও স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টিতে বন্যা বা ধস হয়েছে।

অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে উত্তর-পশ্চিম ভারতে ২৩৫ দিন চরম আবহাওয়ার ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে সেই সংখ্যা ২১৮ দিন। রাজ্যগুলির মধ্যে উত্তরপ্রদেশে সবচেয়ে বেশি, ৮১১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। ফসলি জমির ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে মহারাষ্ট্রে। উত্তরপ্রদেশ ও হিমাচলপ্রদেশে ২৭৩ দিনের প্রায় ৬৪ শতাংশে চরম আবহাওয়া হয়েছে, যা রাজ্যগুলির মধ্যে সর্বোচ্চ। মৃত্যুর হিসাবে উত্তরপ্রদেশের পরে আছে মহারাষ্ট্র (২৮৬) ও বিহার (২৪৫)। ফসলের ক্ষতির পরিমাণ মহারাষ্ট্রে ২৮ লক্ষ ৩০ হাজার হেক্টর, উত্তরপ্রদেশে ৬ লক্ষ ৯০ হাজার এবং বিহারে ২ লক্ষ ৩০ হাজার হেক্টর।

আগাম প্রস্তুতির প্রশ্ন

রিপোর্টের মূল প্রশ্ন শুধু আবহাওয়ার ঘটনা কতবার ঘটেছে, তা নয়; বিপর্যয়ের আগাম প্রস্তুতি কতটা কার্যকর, সেটিও। সিএসই-র মহানির্দেশক সুনীতা নারায়ণ একে জলবায়ু পরিবর্তনের ‘মানবিক মুখ’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, দেশের প্রায় সব অংশই এখন চরম আবহাওয়ার মুখোমুখি। সিএসই-র সহযোগী প্রকাশনার ম্যানেজিং এডিটর রিচার্ড মহাপাত্র বলেছেন, বিপর্যয়ের পরে সাড়া দেওয়ার বদলে ঝুঁকি কমানো ও সহনশীলতা গড়ে তোলার দিকে যেতে হবে।

ভারী বৃষ্টির সময় জলনিকাশি, শহরের নালা ও নদীর প্রবাহ ঠিক রাখা জরুরি। খরা বা বৃষ্টিহীন সময়ে ভূগর্ভস্থ জলের উপর চাপ কমাতে জল সংরক্ষণ এবং পুনর্ভরণ ব্যবস্থা দরকার। বন, জলাভূমি ও শহরের সবুজ এলাকা রক্ষা করাও বিপর্যয়ের ঝুঁকি কমানোর অংশ।

চরম আবহাওয়ার সব ঘটনাকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলে এক কথায় ব্যাখ্যা করা যায় না। তবে ঘন ঘন ঘটনার ধারা, দীর্ঘস্থায়ী তাপ বা স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির মতো প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য, আগাম সতর্কতা এবং প্রস্তুত পরিকাঠামো না থাকলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। সিএসই-র রিপোর্ট সেই প্রস্তুতি ও ঝুঁকি কমানোর প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে এনেছে।