পূর্ব কলকাতা জলাভূমির তারদহ-কাপাসাটি এলাকায় খালের বাঁধের পথ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে স্থানীয় মাছচাষিদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি সংস্থার বিরুদ্ধে খালের বাঁধের জমিতে দখল নেওয়া এবং মাছের ভেড়িতে যাওয়ার প্রচলিত পথ আটকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রায় ৫০০ কর্মীর কাজ ও যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
জানা গেছে, ওই পথ ব্যবহার করে ছয়-সাতটি ভেড়িতে যাতায়াত করতেন মাছচাষের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, পথ বন্ধ হওয়ায় মাছের খাবার, সরঞ্জাম ও অন্য প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে ভেড়িতে পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়েছে। মাছচাষের কাজে নিয়মিত যাতায়াত জরুরি। পথ বন্ধ থাকলে শুধু কর্মীদের চলাচল নয়, মাছের পরিচর্যা ও উৎপাদনেও সমস্যা হতে পারে।
এলাকার একটি পরিবেশ ও জীবিকা-সংক্রান্ত সংগঠন পূর্ব কলকাতা জলাভূমি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জমা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। মাছচাষের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরাও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় থানায় যোগাযোগ করা হয়েছে বলেও খবর। অভিযোগের সত্যতা ও জমির সীমানা-সংক্রান্ত প্রশ্নের নিষ্পত্তি করতে কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন।
অভিযোগ প্রমাণিত নয়, যাচাই জরুরি
এখনও পর্যন্ত অভিযোগকে প্রমাণিত দখলদারি হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। জমির মালিকানা, পথের ব্যবহার এবং বাঁধের সীমানা, সবকিছু সরকারি নথি দেখে যাচাই করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও প্রকাশ্যে আসা দরকার। তবে অভিযোগের গুরুত্ব রয়েছে, কারণ পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে মাছচাষ, জলনিকাশি ও জীবিকার সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক সরাসরি।
জলাভূমির গুরুত্ব ও প্রশাসনের করণীয়
পূর্ব কলকাতা জলাভূমি শুধু মাছের ভেড়ির সমষ্টি নয়। খাল, জলাভূমি, কৃষিজমি ও মাছচাষের এলাকা মিলিয়ে এটি একটি বৃহৎ পরিবেশব্যবস্থা। শহরের বর্জ্যজল প্রাকৃতিকভাবে পরিশোধন, বন্যার জল ধারণ, জীববৈচিত্র্য বজায় রাখা এবং বহু মানুষের জীবিকার ক্ষেত্রে এই এলাকার ভূমিকা রয়েছে। প্রায় ১২,৫০০ হেক্টর জুড়ে ছড়ানো এই জলাভূমি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত রামসার তালিকাভুক্ত এলাকা। এর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিধিবদ্ধ দায়িত্বে রয়েছে রাজ্য সরকারের অধীন পূর্ব কলকাতা জলাভূমি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। তাই জলাভূমির জমি বা তার সঙ্গে যুক্ত পথের ব্যবহার নিয়ে বিরোধ হলে তার প্রভাব স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ, দুই ক্ষেত্রেই পড়তে পারে।
শহরের পূর্ব প্রান্তে নির্মাণ ও পরিকাঠামো দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে জলাভূমির জমি, খাল এবং চলাচলের পথের উপর চাপ তৈরি হচ্ছে বলে পরিবেশবিদেরা বহুদিন ধরে সতর্ক করেছেন। কোনও পথ বন্ধ করার অভিযোগ উঠলে তা নিছক স্থানীয় জমি-বিবাদ হিসেবে দেখলে চলবে না। পথটি জলাভূমির কাজে, মাছচাষে বা বাসিন্দাদের যাতায়াতে ব্যবহৃত হত কি না, তা যাচাই করা দরকার।
এই ঘটনায় প্রশাসনের সামনে কয়েকটি কাজ রয়েছে: জমির রেকর্ড ও সীমানা খতিয়ে দেখা, অভিযোগকারীদের বক্তব্য শোনা, সংশ্লিষ্ট সংস্থার জবাব নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে চলাচলের অধিকার ও জলাভূমির নিয়ম মেনে ব্যবস্থা করা। তদন্তের ফল প্রকাশ্যে এলে বিরোধের প্রকৃতি বোঝা সহজ হবে। তার আগে অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখ করা উচিত।
পূর্ব কলকাতা জলাভূমি রক্ষার প্রশ্নে পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় জীবিকা, দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে বেআইনি নির্মাণ বা জমির ব্যবহার বদল হলে জলাভূমির কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের মাছচাষ ও স্থানীয় মানুষের কাজও উপেক্ষা করা যায় না। স্বচ্ছ তদন্ত এবং নথিভিত্তিক সিদ্ধান্তই এই বিরোধের গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।