রাষ্ট্রসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১-এ উন্নত দেশগুলির কাছ থেকে পূর্বানুমানযোগ্য জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং অভিযোজন-সহায়তা চাইবে ভারত। কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব ৩ নভেম্বর নয়াদিল্লিতে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। সম্মেলনটি ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্তালিয়ায় হওয়ার কথা।
এর আগে ফিজির নাদিতে কপ৩১-এর প্রস্তুতি-বৈঠক শেষ হয় ৮ অক্টোবর। সেখানে যাদব বলেছিলেন, উচ্চতর জলবায়ু-উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা-বৃদ্ধির সহায়তা মেলাতে হবে। বৈঠকের ফাঁকে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সমুদ্রতীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে টুভালুর মন্ত্রীর সঙ্গে এবং কপ৩১-এর অগ্রাধিকার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিস বোয়েনের সঙ্গে তিনি আলোচনাও করেন।
ভারতের বক্তব্য, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলির পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন, যদি অর্থায়ন অনিশ্চিত থাকে। জলবায়ুজনিত বিপর্যয় মোকাবিলা, কৃষির অভিযোজন, জল সংরক্ষণ এবং পরিকাঠামো শক্তিশালী করতে অর্থ প্রয়োজন। সেই অর্থ ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে সহজ শর্তে ও ধারাবাহিকভাবে পাওয়া উচিত, এমন অবস্থানই তুলে ধরেছে কেন্দ্র। প্রতিটি দেশের নিজস্ব সিদ্ধান্তে ঠিক করা অঙ্গীকারের মর্যাদা বজায় রাখার কথাও ভারত বারবার বলছে।
প্রযুক্তি ও অভিযোজনের দাবি
অর্থায়নের পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তরও ভারতের দাবির মধ্যে রয়েছে। পরিষ্কার শক্তি, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, আগাম সতর্কতা এবং জল ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তি প্রয়োজন। কিন্তু পেটেন্ট, খরচ ও বাণিজ্যিক শর্ত অনেক দেশের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার কঠিন করে তুলতে পারে। কপ৩১-এ এই বাধাগুলি নিয়ে আলোচনা চায় ভারত।
অভিযোজনের প্রশ্নটিও সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতিমধ্যেই কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের জীবিকার উপর পড়ছে। তাই শুধু নির্গমন কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নয়, তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা ও বন্যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও দরকার। ভারত বলেছে, দেশভেদে পরিস্থিতি আলাদা; তাই অভিযোজনের মাপকাঠি ও পরিকল্পনায় দেশের নিজস্ব অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।
ন্যায্য রূপান্তর ও বাস্তব রূপরেখা
ভারত ‘ন্যায্য রূপান্তর’-এর কথাও তুলবে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পরিচ্ছন্ন শক্তির দিকে যাওয়ার সময় শ্রমিক, শিল্পাঞ্চল ও সাধারণ মানুষের উপর কী প্রভাব পড়বে, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। উন্নয়নশীল দেশের কাছে সাশ্রয়ী শক্তির জোগান এখনও জরুরি। তাই জ্বালানি রূপান্তরের পরিকল্পনায় উন্নয়নের অধিকার এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে বাদ দেওয়া যাবে না, এটাই ভারতের যুক্তি। ন্যায্য রূপান্তরের কর্মসূচিকে সদস্য দেশগুলির নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার মাধ্যমে বাড়ানোর পক্ষে ভারত। যাদবের কথায়, জলবায়ু ন্যায়বিচার, উন্নয়নের অধিকার এবং সাশ্রয়ী শক্তির নাগাল, এই তিন নীতিই ভারতের অবস্থানের ভিত্তি।
কপ৩১-এর আগে ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে ২ কোটি ৬০ লক্ষ হেক্টরের বেশি জমি পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছে। কেন্দ্রের বক্তব্য, বন ও অবক্ষয়িত জমি পুনরুদ্ধার, খরা-সহনশীলতা এবং তৃণভূমি রক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক ও স্থানীয় সম্প্রদায়কে যুক্ত করে কাজ করা হবে। শুধু গাছ লাগানো নয়, কোন অঞ্চলে কী ধরনের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র উপযোগী, সেটিও পরিকল্পনায় বিবেচনা করতে হবে।
তবে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অগ্রাধিকার ঘোষণা করলেই কাজ শেষ হয় না। জলবায়ু অর্থায়ন কীভাবে আসবে, কোন প্রকল্পে ব্যয় হবে, প্রযুক্তি কীভাবে ভাগ হবে এবং প্রতিশ্রুত জমি পুনরুদ্ধারের কাজ কীভাবে মাপা হবে, এসবের বাস্তব রূপরেখা জরুরি। কপ৩১-এ ভারতের অবস্থান কতটা সমর্থন পায়, তা আলোচনার ফলেই স্পষ্ট হবে।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।