পূর্ব সিকিমের পাহাড়ি অরণ্যে ক্যামেরা-ট্র্যাপ সমীক্ষায় বন্যপ্রাণীর নতুন উচ্চতা-সংক্রান্ত রেকর্ড পাওয়া গিয়েছে। একটি গাউরের ছবি ধরা পড়েছে ৩,৫৪২ মিটার উচ্চতায়। এটি প্রজাতিটির সর্বোচ্চ যাচাই করা আলোকচিত্র-রেকর্ড বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। একই সমীক্ষায় ৩,৯৬৬ মিটার উচ্চতায় বাঘের উপস্থিতির ছবিও মিলেছে। গাউরের ছবিটি তোলা হয়েছে পাংগোলাখা অভয়ারণ্যে। এর আগে প্রজাতিটির নথিভুক্ত সর্বোচ্চ উচ্চতা ছিল প্রায় ২,৮০০ মিটার। বাঘের ছবি এসেছে কিয়ংনোসলা অঞ্চল থেকে।

সমীক্ষাটি হয়েছে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত। গবেষকেরা ১,৮০০ থেকে ৪,২০০ মিটার উচ্চতার এলাকায় ৬৪টি ক্যামেরা-ট্র্যাপ বসিয়েছিলেন। ক্যামেরাগুলি মোট ২০,৪১১ রাত সক্রিয় ছিল। কিয়ংনোসলা, পাংগোলাখা ও ফামবংলো বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য এবং তার লাগোয়া কিছু সংরক্ষিত এলাকার বাইরের বনাঞ্চলও সমীক্ষার আওতায় ছিল।

ক্যামেরায় মোট ৩০টি স্তন্যপায়ী প্রজাতির ছবি ধরা পড়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি প্রজাতির ক্ষেত্রে পূর্ব সিকিমে আগে নথিবদ্ধ উচ্চতার সীমা পেরিয়ে উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। ছয়টি প্রজাতির ছবি ওই এলাকার জন্য প্রথম নিশ্চিত আলোকচিত্র-রেকর্ড বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। গাউর ও বাঘের পাশাপাশি সাম্বর, লাল পান্ডা, গোল্ডেন জ্যাকাল এবং ক্লাউডেড লেপার্ডও উচ্চ পার্বত্য এলাকায় নথিবদ্ধ হয়েছে।

গাউর, অর্থাৎ ভারতীয় বাইসন, সাধারণত আরও নিচু উচ্চতার বনাঞ্চলে দেখা যায়। সিকিমে ৩,৫৪২ মিটারে তার উপস্থিতি আগে জানা উচ্চতার সীমাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। বাঘের ৩,৯৬৬ মিটারের রেকর্ডও হিমালয় অঞ্চলে প্রজাতিটির উচ্চ পার্বত্য উপস্থিতি সম্পর্কে নতুন তথ্য দিচ্ছে।

উঁচুতে কেন, ব্যাখ্যা এখনও অস্পষ্ট

এই আবিষ্কারের অর্থ এই নয় যে গাউর বা বাঘ সম্প্রতি পাহাড়ের আরও উঁচুতে উঠে গিয়েছে। গবেষকেরা কয়েকটি সম্ভাবনার কথা বলেছেন। ওই উচ্চতায় আগে থেকেই উপযুক্ত বন ও খাদ্য থাকতে পারে। পূর্ব সিকিমের বনভূমি প্রায় ৪,০০০ মিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে, ফলে গাউর বা বাঘের মতো প্রাণীর জন্য সেখানে উপযুক্ত আবাসস্থল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। দুর্গম এলাকায় আগের সমীক্ষা সীমিত হওয়ায় প্রাণীগুলি নজরে আসেনি। নতুন ক্যামেরা-ট্র্যাপ এবং দীর্ঘ সময় ধরে নজরদারির ফলে তাদের উপস্থিতি এখন নথিবদ্ধ হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনও সম্ভাব্য একটি কারণ হতে পারে। তাপমাত্রা, গাছপালা ও আবাসস্থলের পরিবর্তন প্রাণীদের বিচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু এই সমীক্ষা থেকে জলবায়ু পরিবর্তনই প্রাণীদের উঁচুতে থাকার কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। গবেষণায় বলা হয়েছে, এর জন্য আরও দীর্ঘমেয়াদি তথ্য দরকার। গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক পূজা পান্ট জানিয়েছেন, ভারতীয় হিমালয়ের অন্যত্রও এমন উঁচু এলাকায় স্তন্যপায়ীর উপস্থিতি নথিবদ্ধ হয়েছে। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এই ছবিগুলি পরিবেশগত বদলের ফল, না কি শুধু ভালো নজরদারির, তা নির্ধারণের মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

সংরক্ষণে কী বার্তা

এ ধরনের তথ্য সংরক্ষণ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণীরা যদি সত্যিই আবাসস্থল বদলায়, তা হলে খাদ্য, শিকারি-শিকার সম্পর্ক এবং বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে প্রতিযোগিতায় পরিবর্তন ঘটতে পারে। মানুষের বসতি ও চাষের জমির কাছাকাছি বন্যপ্রাণীর আনাগোনা বাড়লে সংঘাতের ঝুঁকিও তৈরি হয়।

সমীক্ষাটি আরও দেখিয়েছে, শুধু ঘোষিত অভয়ারণ্য নয়, তার পাশের বনাঞ্চলও বন্যপ্রাণীর চলাচল ও আবাসস্থল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই সংরক্ষিত এলাকার সীমানার বাইরে থাকা বন, করিডর ও সংযোগকারী ভূখণ্ডকে নজরদারির বাইরে রাখলে চলবে না। গবেষকেরা দীর্ঘমেয়াদি ক্যামেরা-ট্র্যাপ সমীক্ষার সুপারিশ করেছেন, যাতে বোঝা যায় এই উচ্চ পার্বত্য উপস্থিতি স্থায়ী কি না এবং সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে কি না।