Home সংস্কৃতি ও বিনোদন ড্যান্স ফ্লোরে ম্যাডোনার পুনর্জন্ম

ড্যান্স ফ্লোরে ম্যাডোনার পুনর্জন্ম

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
9 views 5 minutes read
A+A-
Reset

একসময় তাঁকে বলা হতো ‘পপ সম্রাজ্ঞী’। চার দশকের বেশি সময় ধরে জনপ্রিয় সংগীতের গতিপথ বদলে দিয়েছেন তিনি। কিন্তু গত এক দশক ম্যাডোনার জন্য ছিল কঠিন। এমডিএনএ (২০১২), রেবেল হার্ট (২০১৫) এবং মাদাম এক্স (২০১৯)—টানা তিনটি অ্যালবামই শিল্পমান ও বাণিজ্যিক সাফল্য, দুই ক্ষেত্রেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। প্রতিটি অ্যালবামের বিক্রিও আগেরটির তুলনায় কমেছে। সেই হতাশার পর এবার তিনি ফিরে তাকালেন নিজের সবচেয়ে সফল অধ্যায়ের দিকে। কনফেশন্স টু যেন সরাসরি ২০০৫ সালের কনফেশন্স অন আ ড্যান্স ফ্লোর-এর উত্তরসূরি।

এই প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে বড় চমক স্টুয়ার্ট প্রাইসের সঙ্গে পুনর্মিলন। দুই দশক আগে এই জুটিই তৈরি করেছিল এমন এক নৃত্যসংগীতের জগৎ, যেখানে আধুনিকতা আর নস্টালজিয়া হাত ধরাধরি করে চলেছিল। সেই অ্যালবামের হাং আপ আজও ম্যাডোনার অন্যতম জনপ্রিয় গান। তাই পুরোনো সহযোগীকে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ নিরাপদ খেলাও বলতে পারেন। প্রশ্ন উঠতেই পারে—এ কি নতুন কিছু নয়, শুধু পুরোনো সাফল্যের পুনরাবৃত্তি?

অ্যালবামটি সেই প্রশ্নের জবাব নিজেই দেয়।

এখানে ম্যাডোনা অতীতকে অনুকরণ করেননি; বরং নিজের সবচেয়ে শক্তিশালী সংগীতভাষায় ফিরেছেন। গত এক দশকে তিনি ট্র্যাপ, লাতিন পপসহ নতুন ধারার সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেগুলোতে কখনও পুরোপুরি স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। কনফেশন্স টু-তে তিনি আর কাউকে অনুসরণ করেননি। নিজের পরিচিত ছন্দেই খুঁজে পেয়েছেন নতুন প্রাণ।

স্টুয়ার্ট প্রাইস পুরো অ্যালবামটিকে সাজিয়েছেন যেন বিরতিহীন একটি ক্লাব সেট। একটি গান শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি তার ভেতরে মিশে যায়। ফলে এটি আলাদা আলাদা গানের সংকলন নয়; বরং একটানা সংগীতযাত্রা। শুনতে শুনতে মনে হয় আশির দশক, নব্বইয়ের দশক আর বর্তমান—সব সময় যেন একই নৃত্যমঞ্চে মিলেছে।

অ্যালবামের প্রাণ হাউস ও টেকনো সংগীত। নৃত্যশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা ম্যাডোনার এই ধারার সঙ্গে সম্পর্ক বহু পুরোনো। ইরোটিকা, বেডটাইম স্টোরিজ কিংবা রে অব লাইট-এ তার ছাপ ছিল। এবার তিনি সেই ঐতিহ্যকে আরও গভীরভাবে আত্মস্থ করেছেন। পুরোনো নৃত্যসংগীতের পরিচিত সুর, তাল ও আবহকে নতুনভাবে সাজিয়ে তিনি যেন সংগীতের ইতিহাসকেই নতুন ভাষা দিয়েছেন।

আই ফিল সো ফ্রি-তে শোনা যায় হাউস সংগীতের ক্লাসিক ফ্রেঞ্চ কিস-এর আবেগময় অনুরণন। আর ব্রিং ইয়োর লাভ-এ জায়গা পেয়েছে ডেট্রয়েট টেকনোর কিংবদন্তি গুড লাইফ-এর সুরাংশ। গানটিতে ম্যাডোনার সঙ্গী হয়েছেন বর্তমান প্রজন্মের তারকা সাবরিনা কার্পেন্টার। এটি হয়তো হাং আপ-এর মতো তাত্ক্ষণিক জনপ্রিয় হবে না, কিন্তু দুই প্রজন্মের দুই শিল্পীর এই সহযোগিতা প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি মনে করিয়ে দেয়, আজকের নারী পপশিল্পীদের ওপর ম্যাডোনার প্রভাব কতটা গভীর।

গুড ফর দ্য সোল, লাভ সেনসেশন, ওয়ান স্টেপ অ্যাওয়ে এবং বিজার—প্রতিটি গান আলাদা স্বাদের। কোথাও গভীর হাউসের পিয়ানো, কোথাও বিস্ফোরক ইলেকট্রনিক বিট। পুরো অ্যালবাম তাই একই সঙ্গে স্মৃতিময়, আধুনিক এবং প্রাণবন্ত।

তবে কনফেশন্স টু শুধু নাচের অ্যালবাম নয়। ম্যাডোনার কাছে নৃত্যসংগীত কখনও হালকা বিনোদন ছিল না। এটি নিঃসঙ্গতা, উদ্বেগ এবং তারকাখ্যাতির চাপ থেকে মুক্তির এক আশ্রয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ, শরীরের ছন্দ আর সম্মিলিত আনন্দ—এসবই তাঁর কাছে বেঁচে থাকার ভাষা।

এই ভাবনার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রকাশ ড্যান্সেটেরিয়া। গানটি ফিরিয়ে নিয়ে যায় আশির দশকের নিউইয়র্কে, যখন ক্লাবসংস্কৃতি ছিল শিল্প, সংগীত ও স্বাধীনতার পরীক্ষাগার। রাস্তার শিল্পী, ডিজে, নৃত্যশিল্পী, র‌্যাপার—একটি পুরো প্রজন্মের স্মৃতি উঠে আসে সেখানে। কিন্তু উদ্‌যাপনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে শোকও। কারণ সেই সময়ের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। ফলে গানটি একই সঙ্গে উৎসব ও স্মৃতিচারণ।

অ্যালবামের শেষভাগে আবহ পুরো বদলে যায়। ফ্র্যাজাইল থেকে শুরু হয় আত্মসমালোচনার যাত্রা। মাই সিনস আর মাই সেভিয়ার-এ বেলজিয়ান শিল্পী স্ত্রোমায়ের সঙ্গে ফরাসি ভাষায় ম্যাডোনা গেয়েছেন ভাঙন, যন্ত্রণা আর পুনর্জন্মের কথা। ধর্মীয় প্রতীক, বিদ্রোহ এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা মিলিয়ে এটি অ্যালবামের সবচেয়ে গভীর মুহূর্তগুলোর একটি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের বাণিজ্যিক ব্যর্থতা, শারীরিক অসুস্থতা, অসম্পূর্ণ স্বপ্ন এবং প্রিয়জন হারানোর অভিজ্ঞতা এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিট্রেয়াল-এ শোনা যায় ফরাসি সুরকার এরিক সাতির পিয়ানোর অনুরণন। বহুদিনের সহযোগী মিরওয়া গানটির প্রযোজক। এরপর দ্য টেস্ট-এ মেয়ে লুর্দেস ‘লোলা’ লেওনের সঙ্গে ম্যাডোনা তৈরি করেছেন অ্যালবামের সবচেয়ে কোমল ও ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোর একটি।

শেষ গান এল.ই.এস. গার্ল-এ আর কোনো ঝলমলে নৃত্যমঞ্চ নেই। আছে শুধু গিটার, নিঃসঙ্গতা আর নিউইয়র্কের লোয়ার ইস্ট সাইডের এক তরুণীর গল্প। শেষ লাইন—‘সবকিছুই একদিন মুছে যায়’—পুরো অ্যালবামের সারমর্ম হয়ে ওঠে। সময় কাউকে অমর রাখে না, কিন্তু শিল্প সময়কে অতিক্রম করে নতুন অর্থ খুঁজে নিতে পারে।

কনফেশন্স টু তাই কেবল নস্টালজিয়ার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি অ্যালবাম নয়। এটি এমন এক শিল্পীর আত্মস্বীকৃতি, যিনি ব্যর্থতা, বয়স, শোক এবং পরিবর্তনের ভেতর দিয়েও নিজের আসল পরিচয় ফিরে পেয়েছেন। নাচের মঞ্চে ফিরে এসে ম্যাডোনা শুধু পুরোনো জাদুই ফিরিয়ে আনেননি; তিনি প্রমাণ করেছেন, কখনও কখনও সামনে এগোতে হলে নিজের শিকড়েই ফিরে যেতে হয়।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles