হাইলাইটস:
- মাঠের ফুটবল আবারও বিশ্বকাপের সমস্ত বিতর্ককে আড়াল করতে শুরু করেছে।
- ইরানের প্রতি আচরণ, ভিসা জটিলতা ও সমর্থকদের বঞ্চনা বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
- টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম ও সমর্থক-বান্ধব সংস্কৃতির অবক্ষয় নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
- ৪৮ দলের বিশ্বকাপে প্রতিযোগিতার মান মোটের উপর বজায় থাকলেও নতুন ফরম্যাট নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
- শেষ পর্যন্ত মানুষ মনে রাখবে মাঠের ফুটবল, কিন্তু রাজনীতি ও অবিচারের প্রশ্নও থেকে যাবে।
বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত ফুটবলই সবকিছুর উপরে উঠে আসে। অতীতেও তাই হয়েছে, এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। ফুটবল এমন এক খেলা, যার অসাধারণ পুনরুজ্জীবনের ক্ষমতা রয়েছে। আর বিশ্বকাপ এমন এক আসর, যা একের পর এক বিতর্ক, রাজনৈতিক সংকট ও নৈতিক প্রশ্নের মুখেও টিকে থেকেছে।
স্বৈরশাসক, দুর্নীতির অভিযোগ, অভিবাসী শ্রমিকদের শোষণ কিংবা সামরিক শাসনের মতো বিতর্ক পেরিয়েও বিশ্বকাপ এগিয়ে চলেছে। এবারও ব্যতিক্রম নয়। আকাশছোঁয়া টিকিটের দাম, কঠোর অভিবাসন নীতি কিংবা আন্তর্জাতিক সমর্থকদের প্রবেশে বাধা—এসব বিতর্কও শেষ পর্যন্ত মাঠের উত্তেজনার কাছে অনেকটাই চাপা পড়ে যাচ্ছে। অথচ এই বাস্তবতা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর “এটাই ইতিহাসের সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বকাপ”—এই দাবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সমস্যাগুলি তুচ্ছ। বরং এগুলি অত্যন্ত গুরুতর। বিশেষ করে ইরানের ঘটনাটি বিশ্বকাপ ইতিহাসে নজিরবিহীন। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দলটিকে বারবার প্রস্তুতির জায়গা বদলাতে হয়েছে। পূর্ণ কোচিং স্টাফ নিয়ে কাজ করতে পারেনি। ম্যাচ খেলতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হয়েছে। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা একটি ম্যাচও না হেরে বিদায় নিয়েছে—শুধু অন্য একটি ম্যাচের শেষ মুহূর্তের গোলে ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে। স্বাভাবিক পরিবেশ পেলে তারা আরও অনেক দূর যেতে পারত বলেই মনে করা হচ্ছে।
শুধু ইরান নয়, বিশ্বের বহু দেশের সমর্থক ও সাংবাদিকও ভিসা সমস্যায় পড়েছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ৮০ শতাংশেরও বেশি ভিসা আবেদন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা প্রত্যাখ্যান করেছে। অথচ বিশ্বকাপ তো গোটা বিশ্বের উৎসব। সমর্থক ও সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়া এই আসরের মূল চেতনাকেই আঘাত করে।
সেনেগালের সরকারি আলোকচিত্রী কানাডায় প্রবেশের অনুমতি পাননি। কঙ্গোর সবচেয়ে পরিচিত সমর্থক মিশেল নকুকা ম্বোলাডিঙ্গা পুরো আসরে শুধু মেক্সিকোতেই একটি ম্যাচ দেখতে পেরেছেন। স্কটল্যান্ডের শত শত সমর্থকের ভ্রমণ অনুমতিও শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়ে যায়। এই ঘটনাগুলি বিশ্বকাপ আয়োজনে সমর্থকদের গুরুত্ব কতটা কমে গিয়েছে, সেটাই স্পষ্ট করে।
এতে শুধু বর্তমান বিশ্বকাপ নয়, ভবিষ্যতের জন্যও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আয়োজক দেশ কি বিশ্বকাপ উপলক্ষে নিজেদের অভিবাসন নীতিতে নমনীয়তা দেখাবে না? অতীতে তো সেটাই ছিল রীতি। কিন্তু এখন যদি এই নজির তৈরি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য আয়োজক দেশগুলিও একই পথ অনুসরণ করতে পারে। ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক সৌদি আরবও তখন নিজেদের পছন্দমতো দর্শকদের প্রবেশাধিকার দিতে পারে।
সমর্থকদের সংস্কৃতিও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বহু দশকের ঐতিহ্য ভেঙে এখন সবকিছুই যেন বাণিজ্যিক লাভের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যাঁরা বছরের পর বছর দলকে অনুসরণ করেন, স্টেডিয়ামে পরিবেশ তৈরি করেন, তাঁদের জন্য কোনও বিশেষ সুবিধা নেই। টিকিটের মূল্য যেমন অস্বাভাবিক, তেমনি যাতায়াত, খাবার কিংবা এক বোতল পানীয় জলের দামও অনেকের নাগালের বাইরে। বিশ্বকাপ যেন সাধারণ সমর্থকদের উৎসব থেকে ধীরে ধীরে ধনীদের বিনোদনে পরিণত হচ্ছে।
এবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপ নিয়ে শুরুর দিকে যে আশঙ্কা ছিল, তা পুরোপুরি সত্যি হয়নি। প্রতিযোগিতার মান খুব বেশি কমেনি। কেপ ভার্দে, কঙ্গো কিংবা কুরাসাওয়ের মতো দলও লড়াই করে নিজেদের সামর্থ্য দেখিয়েছে। তবে তৃতীয় স্থানাধিকারী দলগুলিকে পরবর্তী পর্বে তোলার নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। এতে গ্রুপপর্বের শেষ পর্যন্ত অনেক দল ও সমর্থককে অপেক্ষা করতে হয়েছে, আবার যোগ্যতা অর্জন করা দলগুলিও প্রতিপক্ষ নির্ধারণে অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেছে। ফলে প্রস্তুতিও ব্যাহত হয়েছে।
ভবিষ্যতে যদি বিশ্বকাপ ৬৪ দলে সম্প্রসারিত হয়, তাহলে আয়োজকদের উপর বাড়তি চাপ পড়বে ঠিকই, কিন্তু প্রতিযোগিতার কাঠামো সম্ভবত আরও পরিষ্কার হবে।
সব বিতর্কের মাঝেও মাঠের ফুটবল অবশ্য হতাশ করেনি। গ্রুপপর্বে ম্যাচপ্রতি গড়ে প্রায় তিনটি করে গোল হয়েছে। এই ধারা বজায় থাকলে ১৯৫৮ সালের পর এটিই হবে সর্বাধিক গোলসমৃদ্ধ বিশ্বকাপ।
বিশ্ব ফুটবলের তারকারাও নিজেদের সেরাটা তুলে ধরেছেন। লিওনেল মেসি গ্রুপপর্বেই পাঁচটি গোল করেছেন। উসমান দেম্বেলে, এরলিং হলান্ড, কিলিয়ান এমবাপে এবং ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ঝুলিতেও রয়েছে চারটি করে গোল। বড় দলগুলির কয়েকটি অপ্রত্যাশিত ড্র হলেও প্রকৃত অর্থে বড় অঘটন খুব বেশি ঘটেনি। ফলে নকআউট পর্বে একের পর এক আকর্ষণীয় লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই বিশ্বকাপে নাটকীয় মুহূর্তেরও অভাব ছিল না। জার্মানির বিরুদ্ধে ইকুয়েডরের জয়, উজবেকিস্তানের বিপক্ষে কঙ্গোর সাফল্য কিংবা আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া ম্যাচের অবিশ্বাস্য শেষ মুহূর্ত—সবই দর্শকদের মনে দাগ কেটেছে। কাতারের তুলনায় এবার বিভিন্ন শহরে সমর্থকদের উচ্ছ্বাসও অনেক বেশি চোখে পড়েছে। বোস্টনে স্কটল্যান্ডের সমর্থক, গুয়াদালাহারায় কলম্বিয়ার সমর্থক কিংবা কানসাস সিটিতে নেদারল্যান্ডসের সমর্থকদের উপস্থিতি বিশ্বকাপকে সত্যিকারের বৈশ্বিক উৎসবের রূপ দিয়েছে।
এসবই উদ্যাপনের মতো বিষয়। কিন্তু বিশ্বকাপ বরাবরই দুটি সমান্তরাল পথে এগিয়ে চলে। একদিকে থাকে রোমাঞ্চকর ফুটবল, অসাধারণ গল্প এবং স্মরণীয় মুহূর্ত। অন্যদিকে থাকে রাজনীতি, বৈষম্য, অবিচার এবং বিতর্ক। মাঠের খেলা যতই উজ্জ্বল হোক না কেন, সেই অন্ধকার বাস্তবতাগুলিও কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। শেষ পর্যন্ত মানুষ হয়তো গোল, জয় আর ট্রফির গল্পই বেশি মনে রাখবে, কিন্তু বিশ্বকাপের অন্তরালে থাকা সেই প্রশ্নগুলিও ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে।