হাইলাইটস:
- বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকাতার ট্রাম পরিষেবা পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ বিজেপি সরকারের।
- সমীক্ষার দায়িত্ব পেল রাষ্ট্রায়ত্ত পরামর্শদাতা সংস্থা রাইটস (RITES)।
- প্রথম ধাপে পুরনো ট্রামলাইন সংস্কার, পরে আধুনিক ট্রাম চালুর পরিকল্পনা।
- অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের আদলে নতুন নকশার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রাম আনার ভাবনা।
- দৈনন্দিন যাতায়াতের পাশাপাশি পর্যটন আকর্ষণ হিসেবেও ট্রামকে গড়ে তোলার লক্ষ্য।
- পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন হিসেবে কলকাতার ঐতিহ্য ফেরানোর বার্তা রাজ্য সরকারের।
বাংলাস্ফিয়ার: প্রায় দেড়শো বছরের ইতিহাস বহনকারী কলকাতার ট্রাম কি আবার শহরের রাস্তায় ঘণ্টা বাজিয়ে ফিরবে? দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, পরিষেবা সংকোচন এবং শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে সেই সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিল বিজেপি সরকার। রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিং রবিবার জানিয়েছেন, কলকাতার পরিবেশবান্ধব এই গণপরিবহন ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা রাইটসকে সমীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সমীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতেই ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তৈরি হবে।
মন্ত্রী জানান, সরকারের লক্ষ্য কেবল অতীতের ট্রাম ফিরিয়ে আনা নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী আধুনিক নগর পরিবহনে তাকে রূপান্তরিত করা। সেই কারণে পুরনো ট্রামলাইন সংস্কারের পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তির ট্রাম চালুর পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন শহরে যেভাবে আধুনিক, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, দ্রুতগতির এবং আরামদায়ক ট্রাম চলছে, কলকাতাতেও তেমন মডেল আনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কলকাতার ট্রাম শুধু একটি যানবাহন নয়, শহরের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৮৭৩ সালে ব্রিটিশ আমলে এই পরিষেবার সূচনা হয়। পরে বিদ্যুৎচালিত ট্রাম চালু হওয়ার মাধ্যমে কলকাতা এশিয়ার প্রথম শহর হিসেবে বৈদ্যুতিক ট্রাম পরিষেবার গৌরব অর্জন করে। বহু দশক ধরে এই ট্রাম শহরের প্রধান গণপরিবহনগুলির অন্যতম ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় যানজট, পরিকাঠামোর অবনতি, ধীরগতি এবং আর্থিক লোকসানের যুক্তি তুলে ধরে পরিষেবা ক্রমশ কমানো হয়।
তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে অধিকাংশ ট্রামরুট বন্ধ করে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত মাত্র দুটি রুটে সীমিত পরিষেবা বজায় রাখা হলেও কার্যত কলকাতার ট্রাম ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিতে বসেছিল। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিবেশবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, ঐতিহ্য সংরক্ষণ আন্দোলনকারী এবং বহু নাগরিক দীর্ঘদিন ধরেই আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। তাঁদের মতে, বিশ্বের বহু উন্নত শহর যখন দূষণ কমাতে ট্রামের মতো বৈদ্যুতিক গণপরিবহন সম্প্রসারণ করছে, তখন কলকাতায় তার বিপরীত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
নতুন সরকারের বক্তব্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও বায়ুদূষণের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎচালিত ট্রামের গুরুত্ব নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পরিবহণ দফতরের একাধিক আধিকারিকের মতে, প্রথমে বিদ্যমান ট্র্যাকগুলির অবস্থা খতিয়ে দেখা হবে। যেসব অংশ ব্যবহারযোগ্য, সেগুলি সংস্কার করা হবে। প্রয়োজনে নতুন প্রযুক্তিতে ট্র্যাক পুনর্নির্মাণও করা হতে পারে। এরপর আধুনিক ট্রামগাড়ি চালুর জন্য প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করা হবে।
সরকারের পরিকল্পনায় আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পর্যটন। কলকাতার ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ রয়েছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ট্রাম চালু হলে তা শহর ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে সরকার। ইউরোপের একাধিক ঐতিহাসিক শহর কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে যেমন ট্রাম শুধু পরিবহন নয়, পর্যটনেরও বড় আকর্ষণ, কলকাতাতেও সেই মডেল অনুসরণ করার ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রামের আরেকটি বড় সুবিধা হল এটি সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বাস বা গাড়ির তুলনায় দূষণ অনেক কম হয়। এছাড়া শব্দদূষণও তুলনামূলকভাবে কম। যদি আধুনিক প্রযুক্তির ট্রাম চালু করা যায়, তবে তা শহরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
তবে এই পরিকল্পনার সামনে একাধিক বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা ট্র্যাক সংস্কারে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। শহরের বহু রাস্তার বর্তমান বিন্যাসও আগের তুলনায় অনেক বদলে গেছে। কোথাও ট্র্যাক তুলে ফেলা হয়েছে, কোথাও রাস্তা সম্প্রসারণের ফলে পুরনো অবকাঠামো আর কার্যকর নেই। ফলে কোন কোন রুটে ট্রাম বাস্তবে ফিরতে পারে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এছাড়া আধুনিক ট্রাম কেনা, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা, ডিপো সংস্কার এবং পরিচালন ব্যয়—সব মিলিয়ে প্রকল্পের আর্থিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই সরকার প্রথমেই সমীক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে। রাইটসের রিপোর্টে সম্ভাব্য রুট, ব্যয়, যাত্রীচাহিদা, প্রযুক্তিগত প্রয়োজন এবং আর্থিক কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা হবে।
পরিবহণ বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, অতীতের ধীরগতির ট্রাম ফিরিয়ে আনা নয়, বরং পৃথক করিডর, উন্নত সংকেত ব্যবস্থা এবং আধুনিক নকশার ট্রাম চালু করা গেলে কলকাতায় এই পরিষেবা আবার জনপ্রিয় হতে পারে। বিশেষ করে মধ্য কলকাতার ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল, নদীতীরবর্তী এলাকা এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলিকে সংযুক্ত করে পরিকল্পনা করলে তার আলাদা গুরুত্ব তৈরি হতে পারে।
রাজনৈতিকভাবেও এই সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যেখানে আগের সরকার লোকসানের যুক্তিতে ট্রাম পরিষেবা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল, সেখানে নতুন সরকার পরিবেশ, ঐতিহ্য এবং নগর উন্নয়নের প্রশ্নকে সামনে রেখে সেই সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে ট্রামের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে রাইটসের সমীক্ষা এবং তার ভিত্তিতে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।
যদি সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোয়, তবে বহু বছর পরে কলকাতার রাস্তায় আবারও শোনা যেতে পারে ট্রামের পরিচিত ঘণ্টাধ্বনি। তখন ট্রাম শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, ভবিষ্যতের টেকসই নগর পরিবহনেরও প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।