হাইলাইটস:
- মেটাস্ট্যাটিক অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে নতুন ওষুধ ডারাক্সোনরাসিব আশার আলো দেখাল।
- আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় রোগীদের গড় বেঁচে থাকার সময় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
- প্রচলিত কেমোথেরাপির তুলনায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কম।
- বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভবিষ্যতে চিকিৎসার নতুন মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে।
- একই সঙ্গে ফ্রান্সে উচ্চ-ঝুঁকির মানুষের জন্য শুরু হয়েছে বিশেষ প্রতিরোধ ও আগাম শনাক্তকরণ কর্মসূচি।
বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী ক্যানসার অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় বড় সাফল্যের খবর মিলেছে। শিকাগোয় অনুষ্ঠিত আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি (এএসসিও)-র বার্ষিক সম্মেলনে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন ওষুধ ডারাক্সোনরাসিব মেটাস্ট্যাটিক অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের আয়ু প্রায় দ্বিগুণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
গবেষণায় ৪৬০ জন রোগী অংশ নেন। এঁদের সবারই ক্যানসার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং প্রচলিত কেমোথেরাপি ফলফিরিনক্স আর কার্যকর হচ্ছিল না। রোগীদের একাংশকে প্রতিদিন মুখে খাওয়ার ডারাক্সোনরাসিব দেওয়া হয়, অন্য অংশকে দেওয়া হয় প্রচলিত দ্বিতীয় পর্যায়ের কেমোথেরাপি।
ফলাফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। নতুন ওষুধ গ্রহণকারী রোগীদের গড় আয়ু ছিল ১৩ মাস ৬ দিন, যেখানে প্রচলিত চিকিৎসায় তা ছিল ৬ মাস ২১ দিন। এক বছর পরও নতুন ওষুধ গ্রহণকারীদের ৫৩.২ শতাংশ জীবিত ছিলেন, অন্যদিকে কেমোথেরাপি নেওয়া রোগীদের মধ্যে এই হার ছিল মাত্র ১৭.৩ শতাংশ।
গবেষণার প্রধান গবেষক ব্রায়ান উলপিন বলেন, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ। সীমিত চিকিৎসা বিকল্পের মধ্যে ডারাক্সোনরাসিব একটি যুগান্তকারী সংযোজন হতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। নতুন ওষুধের কারণে মাত্র ৩ শতাংশ রোগী চিকিৎসা বন্ধ করতে বাধ্য হন। কেমোথেরাপিতে সেই হার ছিল ৬ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ত্বকে র্যাশ, তবে স্থানীয় স্টেরয়েড, অ্যান্টিবায়োটিক ও ময়েশ্চারাইজারের সাহায্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আয়ুই নয়, রোগীদের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হয়েছে। ব্যথা কমেছে এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম করার সক্ষমতাও দীর্ঘদিন বজায় থেকেছে।
ডারাক্সোনরাসিব মূলত কে-রাস (KRAS) নামের একটি জিনকে লক্ষ্য করে কাজ করে। অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ৯০ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে এই জিনে পরিবর্তন দেখা যায়, যা ক্যানসারের বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। নতুন ওষুধ সেই প্রক্রিয়াকেই বাধা দেয়।
তবে গবেষকেরা সতর্কও করেছেন। সময়ের সঙ্গে কিছু রোগীর শরীরে এই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে একাধিক কে-রাস প্রতিরোধক ওষুধ একসঙ্গে ব্যবহার অথবা কেমোথেরাপির সঙ্গে মিলিয়ে চিকিৎসা করার পরিকল্পনা চলছে।
এদিকে আরও একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা খুব শিগগিরই শুরু হবে। সেখানে রোগ ধরা পড়ার পর প্রথম থেকেই ডারাক্সোনরাসিব ব্যবহার করে ফলাফল যাচাই করা হবে। পাশাপাশি অস্ত্রোপচারযোগ্য রোগীদের ক্ষেত্রেও অপারেশনের আগে এই ওষুধ দিয়ে তার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এটি দীর্ঘদিন কোনও লক্ষণ প্রকাশ করে না। ফলে অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে রোগ ধরা পড়ে অনেক দেরিতে।
এই কারণেই ফ্রান্সে চালু হয়েছে “ইন্টারসেপশন” নামে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিরোধ ও আগাম শনাক্তকরণ কর্মসূচি। যাঁদের বিআরসিএ১ বা বিআরসিএ২ জিনের পরিবর্তন, পারিবারিক ইতিহাস, দীর্ঘস্থায়ী অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ বা অগ্ন্যাশয়ে সিস্ট রয়েছে, তাঁদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।
এই কর্মসূচির আওতায় রক্তপরীক্ষা, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, খাদ্যাভ্যাস ও শরীরচর্চা বিষয়ক নির্দেশনা এবং প্রতি ছয় মাস অন্তর পালাক্রমে এমআরআই ও এন্ডোস্কোপিক পরীক্ষা করা হয়।
এই কর্মসূচিরই এক উপকারভোগী ৬২ বছরের পেরিন দ্য লঁজেভিয়াল। তাঁর মা ও মামা দু’জনেই অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে মারা গিয়েছিলেন। ঝুঁকির কারণে তিনি পরীক্ষায় অংশ নেন। এমআরআইতে মাত্র সাত মিলিমিটারের একটি টিউমার ধরা পড়ে। দ্রুত অস্ত্রোপচার ও ছয় মাসের কেমোথেরাপির পর তিনি এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে আবার কাজে ফিরতে সক্ষম হন। তাঁর কথায়, “এই কর্মসূচিই আমার জীবন বাঁচিয়েছে।”
তবে একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বর্তমানে এই কর্মসূচি কেবল পরিচিত উচ্চ-ঝুঁকির মানুষদের জন্য, অথচ মোট রোগীর প্রায় ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রে আগে থেকে এমন কোনও ঝুঁকির ইতিহাস থাকে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূমপান, স্থূলতা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা গেলে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব। এছাড়া ক্যাডমিয়ামের সংস্পর্শ, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং কীটনাশকের প্রভাব নিয়েও এখন বিস্তর গবেষণা চলছে। একই সঙ্গে রক্ত, মূত্র বা লালার মাধ্যমে খুব প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত করার জৈব সূচক খুঁজে বের করার কাজও জোরকদমে এগোচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ডারাক্সোনরাসিব অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় বহু বছরের স্থবিরতা ভেঙে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। যদিও এটি এখনও সর্বজনীন চিকিৎসা নয়, তবু গবেষকদের আশা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই ওষুধ এবং আগাম শনাক্তকরণ কর্মসূচি মিলিয়ে এই প্রাণঘাতী ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারবে।