Home খবরবাংলাদেশ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে উত্তেজনা

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে উত্তেজনা

আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে ঘোষিত কর্মসূচির পর দেশজুড়ে কড়া নিরাপত্তা। সেনা মোতায়েন, বিজিবি-পুলিশের তৎপরতা, ধরপাকড় ও এনসিপির পাল্টা কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা।

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
51 views 5 minutes read
A+A-
Reset

নিজস্ব প্রতিবেদক | বাংলাস্ফিয়ার: আজ ২৩ জুন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একসময় দিনটি ছিল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে উৎসবমুখর রাজনৈতিক আয়োজনের দিন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতন এবং পরবর্তীতে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর দৃশ্যপট এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এবারের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে শ্রদ্ধা নিবেদন, দোয়া, ভার্চুয়াল আলোচনা সভা, মিছিল, পোস্টার-লিফলেট প্রচার এবং দেশব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এসব কর্মসূচিকে ঘিরে প্রশাসনের সতর্কতা আরও বেড়েছে।

সরকারের দাবি, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা বেআইনিভাবে নাশকতা বা অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে—এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই দেশজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে ঢাকাসহ কয়েকটি স্পর্শকাতর জেলা।

ব্যারাকে ফেরার ৭ দিনের মাথায় ফের রাজপথে সেনা

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো সেনাবাহিনীর নতুন করে মাঠে নামার প্রেক্ষাপট। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী মাঠে ছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে ধাপে ধাপে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বর্তমান সরকার।

গত ১৫ জুন সেই প্রত্যাহার প্রক্রিয়া শেষ হয়। কিন্তু এক সপ্তাহের ব্যবধানেই, ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সম্ভাব্য অস্থিরতার আশঙ্কায় ২২ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় ফের ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুর মহানগর এবং নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

শুধু সেনা মোতায়েনই নয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এসব এলাকায় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের—কোস্টগার্ড ও বিজিবিতে প্রেষণে নিয়োজিত সমপদমর্যাদার কর্মকর্তাসহ—বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে তারা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭টি সুনির্দিষ্ট ধারায় অপরাধ আমলে নিয়ে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য: ‘কিছু গোপন বিষয় আছে’

সেনা মোতায়েন নিয়ে জনমনে ওঠা প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সাংবাদিকদের তিনি জানান, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অপতৎপরতা কোথায় কোথায় বেড়েছে, সে ব্যাপারে সরকারের কাছে পরিষ্কার তথ্য রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, এখানে ‘আরও কিছু বিষয়’ জড়িত, যা তিনি এখনই জনসমক্ষে প্রকাশ করতে চান না। দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য কিছু মহল পাঁয়তারা করছে—এ বিষয়ে সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

পুলিশের ওপর আস্থার অভাব থেকেই সেনাবাহিনীকে ডাকা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি তা নাকচ করে দেন। তাঁর দাবি, এটি কোনো আস্থাহীনতার বিষয় নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ও স্বাভাবিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে আওয়ামী লীগের ঘোষিত কর্মসূচি

এদিকে আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ঘোষণায় ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচির কথা জানানো হয়েছে। ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা নিবেদন, বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের শহীদদের স্মরণে দোয়া, টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা ও দোয়া, মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডায় বিশেষ প্রার্থনা, অসহায়দের মধ্যে খাদ্য বিতরণ, ঢাকা ও দেশজুড়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা নিয়ে মিছিল, পোস্টার-লিফলেট প্রচার, দেয়াললিখন এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারাভিযান।

এছাড়া ২৩ জুন ভার্চুয়াল আলোচনা সভার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে, যেখানে শেখ হাসিনাকে প্রধান অতিথি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২৪ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সহযোগী সংগঠনগুলোর ভার্চুয়াল আলোচনা সভা এবং ১ জুলাই দেশব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচির কথাও ঘোষণায় রয়েছে।

তবে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ঘোষিত এসব কর্মসূচিকে ঘিরেই প্রশাসনের উদ্বেগ বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা। সরকারের দাবি, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আড়ালে নিষিদ্ধ সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা ঝটিকা মিছিল, পোস্টারিং বা নাশকতার চেষ্টা করতে পারে—এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

গাজীপুরে পুলিশের প্রতি হুমকির অভিযোগ, দেশজুড়ে ধরপাকড়

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরেই নিষিদ্ধ দলটির নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন জায়গায় ঝটিকা মিছিল করার চেষ্টা করছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি। গত রোববার গাজীপুরে যুবলীগের একটি ঝটিকা মিছিল থেকে পুলিশকে উদ্দেশ্য করে সরাসরি হত্যার হুমকি দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এরপরই অভিযান জোরদার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ ২৪ ঘণ্টার বিশেষ অভিযানে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ৩০ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে। এছাড়া রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে ১০ জন, নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর পোস্টারসহ একজন এবং চুয়াডাঙ্গায় নিষিদ্ধ দলের অঙ্গসংগঠনের তিন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঢাকায় ১৮ হাজার পুলিশ, ৫ জেলায় বিজিবি

সেনাবাহিনীর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে কক্সবাজার, মাদারীপুর, শেরপুর, গাজীপুর ও মৌলভীবাজার জেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রয়োজনে অন্যান্য জেলায়ও বিজিবি নামানোর প্রস্তুতি রয়েছে।

রাজধানী ঢাকার নিরাপত্তায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ১৮ হাজারেরও বেশি সদস্য মাঠে থাকছে। ২০০টির বেশি কৌশলগত স্থানে বসানো হয়েছে বিশেষ তল্লাশিচৌকি। ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।

রাজপথে পাল্টা কর্মসূচিতে এনসিপি

প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি রাজপথেও উত্তাপের আশঙ্কা রয়েছে। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যেকোনো তৎপরতা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে আজ মঙ্গলবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি—এনসিপি।

‘আওয়ামী ফ্যাসিস্ট কর্তৃক সংঘটিত সব গুম, খুন ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে’ বিকেল ৫টায় দেশের সব জেলা শহর ও মহানগরে একযোগে এই কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে দলটি।

রাজনৈতিক বার্তা বনাম নিরাপত্তা বাস্তবতা

সব মিলিয়ে, ২৩ জুনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে এক জটিল ও স্পর্শকাতর পরিস্থিতি। একদিকে আওয়ামী লীগ তাদের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, নিষিদ্ধ দলের সম্ভাব্য অপতৎপরতা ঠেকাতেই সেনা, বিজিবি ও পুলিশের সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বিগত সরকারের পতনের পর বর্তমান নির্বাচিত সরকারের অধীনে নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে দেশের পরিস্থিতি যাতে কোনোভাবেই অস্থিতিশীল না হয়, সেদিকেই এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন। একই সঙ্গে রাজপথের রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি ঘিরেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২৩ জুন একসময় ছিল প্রতিষ্ঠা, ঐতিহ্য ও সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের দিন। ২০২৬ সালে এসে সেই দিনটিই পরিণত হয়েছে নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা, সেনা মোতায়েন, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং রাষ্ট্রীয় সতর্কতার এক বড় পরীক্ষায়।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles