হাইলাইটস
- বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ০-০ ড্রয়ে ইরানের নায়ক গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্ড।
- ৫৯ মিনিটে তাঁর অবিশ্বাস্য সেভ ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
- ২০১৮ বিশ্বকাপে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পেনাল্টি রুখে দেওয়ার স্মৃতি ফিরিয়ে আনলেন তিনি।
- ইরান এখন ইতিহাসে প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠার দোরগোড়ায়।
- মাঠের বাইরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদও ছিল আলোচনায়।
বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রস্তুতির সময় ইরান জাতীয় দল ফিরে তাকিয়েছিল নিজেদের অতীতের দিকে। বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে ফুটবলারদের একটি প্রেরণাদায়ক ভিডিও দেখানো হয়। সেই ভিডিওতে ছিল গত দুই বিশ্বকাপে ইরানের স্মরণীয় মুহূর্তগুলো—অদম্য রক্ষণ, প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা এবং স্পেন ও পর্তুগালের মতো শক্তিধর দলের বিরুদ্ধে সাহসী লড়াই।মিডফিল্ডার আলিরেজা জাহানবাখশ পরে জানান, ভিডিওটির একটি বিশেষ অংশ ছিল ২০১৮ বিশ্বকাপে আলিরেজা বেইরানভান্ডের দুর্দান্ত গোলরক্ষণের দৃশ্য। আশ্চর্যের বিষয়, ম্যাচে ঠিক তেমনই একটি মুহূর্ত আবার তৈরি হয়।লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে ৭০ হাজারেরও বেশি দর্শকের সামনে ৫৯ মিনিটে বেইরানভান্ড যে সেভটি করেন, তা মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের সবচেয়ে বড় ঘটনা হয়ে ওঠে। বেলজিয়ামের নিশ্চিত গোলের সুযোগ তিনি ঝাঁপিয়ে পড়ে রুখে দেন। পুরো স্টেডিয়াম যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।তবে বেইরানভান্ডের জন্য এটি নতুন কিছু নয়। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পেনাল্টি ঠেকিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছিলেন। একই টুর্নামেন্টে মরক্কোর বিরুদ্ধে গোললাইন থেকে বল সরিয়ে দলকে জয়ও এনে দিয়েছিলেন। তাই এবারের সেভটিও তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে উঠল।
সামান ঘোদ্দোস বলেন, “ভিডিওতে আমরা ঠিক এই ধরনের মুহূর্তই দেখছিলাম। আজ আবার একই ঘটনা ঘটল। আমাদের ঐক্য, লড়াইয়ের মানসিকতা এবং দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছাই এই দলকে এগিয়ে নিয়ে যায়।”বিশ্বকাপে শেষ মুহূর্তের নাটকীয় ঘটনার সঙ্গে ইরানের পরিচয় পুরোনো। ২০১৪ সালে লিওনেল মেসির জাদুকরী গোল, ২০১৮ সালে রিকার্দো কোয়ারেসমার দুর্দান্ত শট এবং ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হেরে নকআউটে উঠতে না পারার হতাশা—সবই রয়েছে স্মৃতিতে। কিন্তু এবার বেইরানভান্ডের সেভ যেন নতুন এক ইতিহাসের সূচনা হতে পারে।জাহানবাখশ বলেন, “গত কয়েকটি বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপে আমরা শেষ মুহূর্তে প্রাপ্য ফল পাইনি। এবার সুযোগ আমাদের হাতে। দেশের মানুষের জন্য এবং নিজেদের জন্য আমরা সেরাটা দিতে চাই।”মাঠের বাইরে দৃশ্যও ছিল সমান তাৎপর্যপূর্ণ। ইরানি সমর্থকেরা নানা ধরনের জার্সি ও পতাকা নিয়ে হাজির হন। একই সঙ্গে প্রায় ২০০ জন সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারী ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। তাঁদের দাবি, জাতীয় দল সাধারণ মানুষের নয়, বরং শাসকগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে।আরেকটি ব্যানারে ১৬৮ জন নিহত স্কুলশিশুর স্মরণে লেখা ছিল—“ফিফা, যুদ্ধের খেলায় অংশ নিও না।” এটি সম্প্রতি একটি ইরানি স্কুলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের হামলায় নিহতদের প্রতি ইঙ্গিত করে তৈরি করা হয়েছিল।তবে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় এবারের পরিবেশ ছিল অনেক শান্ত। তখন সরকারবিরোধী প্রতিবাদকারীরা নিরাপত্তা সংস্থার নজরদারির ভয়ে ছিলেন। এবারও মতভেদ ছিল, কিন্তু তা বড় সংঘাতে রূপ নেয়নি।ম্যাচে বেলজিয়াম আক্রমণে ধারালো ছিল, কিন্তু রোমেলু লুকাকুকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখেন ইরানের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার শোজা খলিলজাদেহ। প্রথমার্ধে মেহদি তারেমি একটি ফ্রি-কিক থেকে গোল করলেও অল্পের জন্য অফসাইড ধরা পড়ে।
শেষ পর্যন্ত গোলহীন ড্র হলেও ইরানের কাছে এটি ছিল অনেকটা জয়ের সমান। কারণ এই ফল তাদের প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের দ্বিতীয় পর্বে ওঠার স্বপ্নকে জীবিত রেখেছে।শৈশবে ইরানের গ্রামীণ অঞ্চলে বন্ধুদের সঙ্গে পাথর ছুড়ে খেলার অভ্যাস থেকেই বেইরানভান্ডের শক্তিশালী হাতের বিকাশ। যাযাবর পরিবার থেকে উঠে এসে ফুটবলের স্বপ্ন পূরণ করতে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সেই ছেলেটিই আজ দেশের সবচেয়ে বড় নায়কদের একজন।সামান ঘোদ্দোসের ভাষায়, “আজ সে অসাধারণ ছিল। শুধু আজ নয়, বহু বছর ধরেই সে আমাদের ভরসা। আমার মতে, বেইরানভান্ড ইরানের ইতিহাসের সেরা গোলরক্ষক।”Are বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে সেই এক সেভ হয়তো শুধু একটি গোল বাঁচায়নি; ইরানের বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের দরজাও খুলে দিয়েছে।