দুর্নীতির মামলায় একযোগে ৪২টি প্রসিকিউশন স্যাংশন মঞ্জুর, গতি পাবে শিক্ষক নিয়োগ ও পুরসভা নিয়োগ কেলেঙ্কারির বিচারপ্রক্রিয়া
হাইলাইটস
- ২০১৮ সালে তৃণমূল সরকারের প্রত্যাহার করা ‘জেনারেল কনসেন্ট’ পুনর্বহাল করল নতুন বিজেপি সরকার।
- সিবিআইয়ের পাঠানো ৪২টি প্রসিকিউশন স্যাংশন আবেদনে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
- শিক্ষক নিয়োগ, পুরসভা নিয়োগ-সহ একাধিক বহুচর্চিত দুর্নীতি মামলার বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগোতে পারে।
- এতদিন রাজ্যের অনুমোদন না মেলায় বহু মামলায় চার্জশিট ও বিচার প্রক্রিয়া আটকে ছিল।
- প্রশাসনিক মহলের মতে, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্য-কেন্দ্র সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের এক মাসের মধ্যেই দুর্নীতি তদন্তের ক্ষেত্রে বড়সড় নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল নতুন বিজেপি সরকার। দীর্ঘ সাত বছর ধরে ঝুলে থাকা সিবিআইয়ের সমস্ত প্রসিকিউশন স্যাংশনের আবেদন একযোগে অনুমোদন করেছে রাজ্য সরকার। ফলে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, পুরসভা নিয়োগ কেলেঙ্কারি-সহ একাধিক আলোচিত মামলায় অভিযুক্ত সরকারি কর্মচারী ও আধিকারিকদের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হওয়ার পথ অনেকটাই প্রশস্ত হল।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, সম্প্রতি সিবিআইয়ের তরফে পাঠানো মোট ৪২টি প্রসিকিউশন স্যাংশনের আবেদন রাজ্য সরকার অনুমোদন করেছে। এর পাশাপাশি গত সপ্তাহেই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির জন্য ‘জেনারেল কনসেন্ট’ বা সাধারণ অনুমতিও পুনর্বহাল করা হয়েছে। ২০১৮ সালে তৎকালীন তৃণমূল সরকার সেই অনুমতি প্রত্যাহার করেছিল।
ভারতের ফেডারেল কাঠামোয় সিবিআই কোনও রাজ্যে তদন্ত চালাতে গেলে সাধারণত রাজ্যের সম্মতি প্রয়োজন হয়। অনেক রাজ্য সেই সাধারণ অনুমতি বহাল রাখলেও পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, পাঞ্জাব, ঝাড়খণ্ডের মতো কয়েকটি রাজ্য অতীতে তা প্রত্যাহার করেছিল। পশ্চিমবঙ্গে ২০১৮ সালের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলেছে। তৃণমূল সরকারের অভিযোগ ছিল, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধীরা দাবি করত, দুর্নীতির তদন্ত থেকে শাসকদলের নেতাদের রক্ষা করতেই এই অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
নতুন সরকারের সিদ্ধান্ত সেই বিতর্ককে কার্যত উল্টে দিয়েছে।
দুর্নীতি দমন আইনের ১৯ নম্বর ধারায় কোনও সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় চার্জশিট পেশ করতে এবং আদালতের বিচার শুরু করতে সংশ্লিষ্ট সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এই অনুমোদন না মিললে তদন্ত শেষ হলেও বিচার প্রক্রিয়া এগোতে পারে না। গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে এমন বহু মামলা ছিল যেখানে সিবিআই তদন্ত সম্পন্ন করলেও প্রসিকিউশন স্যাংশনের অভাবে কার্যত ফাইলবন্দি হয়ে ছিল পরবর্তী পদক্ষেপ।
বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় বহু সরকারি আধিকারিক, শিক্ষা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। একইভাবে বিভিন্ন পুরসভায় নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগেও সিবিআই তদন্ত করছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন না মেলায় মামলাগুলি প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে সিবিআই এখন দ্রুত আদালতে সম্পূরক চার্জশিট জমা দিতে পারবে। আদালতও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন ও বিচার শুরুর পথে এগোতে পারবে।
রাজনৈতিক দিক থেকেও এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ক্ষমতায় আসার আগে বিজেপি বারবার অভিযোগ করেছিল যে তৃণমূল সরকার প্রশাসনিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করে দুর্নীতির তদন্ত ব্যাহত করছে। নির্বাচনী প্রচারেও শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিল। ক্ষমতায় এসেই সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে নতুন সরকার—এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
তবে বিরোধী শিবিরের বক্তব্য ভিন্ন। তৃণমূলের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিজেপি সরকার কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে আরও বেশি সক্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে এবং এর ফলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তাদের দাবি, তদন্ত অবশ্যই হওয়া উচিত, কিন্তু তা যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত না হয়।
প্রশাসনিক মহলের একটি অংশ অবশ্য মনে করছে, বিষয়টিকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ভুল হবে। দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রক্রিয়া আটকে থাকার ফলে জনমনে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, তা দূর করার জন্যও এই অনুমোদন প্রয়োজন ছিল। তদন্তের পর আদালতে বিচার হবে, অভিযুক্তরা নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ পাবেন—গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সেটাই।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, ‘জেনারেল কনসেন্ট’ পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত। এর ফলে ভবিষ্যতে সিবিআইকে প্রতিটি মামলার জন্য আলাদা করে রাজ্যের অনুমতি নিতে হবে না। কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী, কেন্দ্রীয় প্রকল্প বা আন্তঃরাজ্য দুর্নীতির মতো ক্ষেত্রে তদন্তের কাজ অনেক সহজ হবে। প্রশাসনিকভাবে এটি কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্পর্কের নতুন সমীকরণেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক কাঠামোয় যে দ্রুত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তার মধ্যে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। গত এক মাসে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান, বিভিন্ন পুরনো মামলার পুনর্মূল্যায়ন, আর্থিক অনিয়ম সংক্রান্ত তদন্ত এবং কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির যে ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত তারই অংশ।
এখন নজর থাকবে আদালতের দিকে। বহু প্রতীক্ষিত নিয়োগ দুর্নীতি এবং অন্যান্য আলোচিত মামলাগুলিতে যদি দ্রুত চার্জ গঠন ও বিচার শুরু হয়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় দুর্নীতি বিতর্ক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করবে। সাত বছর ধরে প্রশাসনিক অনুমোদনের অভাবে যে মামলাগুলি কার্যত স্থবির হয়ে ছিল, সেগুলি আবার আইনের গতিতে এগোতে শুরু করবে—এটাই নতুন সরকারের এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য।