হাইলাইটস
- সরকারি বিনামূল্যে বাসযাত্রা প্রকল্প চালুর পর যাত্রীসংখ্যা কমার অভিযোগ বেসরকারি বাসমালিকদের।
- বিশেষ করে মহিলা যাত্রীদের বড় অংশ সরকারি বাসে চলে যাওয়ায় আয়ে ধাক্কা।
- বহু রুটে দৈনিক আয়ের পতন, কিছু বাস কম ট্রিপ চালাতে বাধ্য।
- পরিবহণ বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক কল্যাণ ও বেসরকারি পরিবহণের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য জরুরি।
- সরকার বলছে, নারীদের চলাচল ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতেই এই উদ্যোগ।
রাজ্যের মহিলাদের জন্য সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাত্রার সুযোগ চালু হওয়ার পর তার সামাজিক প্রভাব নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কর্মজীবী, ছাত্রী, গৃহবধূ—সব শ্রেণির মহিলাদের কাছে এই প্রকল্প স্বস্তি এনে দিয়েছে বলে সরকারের দাবি। কিন্তু এই সুবিধার অন্য একটি দিকও ধীরে ধীরে সামনে আসছে। বেসরকারি বাসমালিকদের অভিযোগ, সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাত্রার সুযোগ চালু হওয়ার ফলে তাঁদের ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কলকাতা ও শহরতলির একাধিক রুটে বেসরকারি বাসচালক ও মালিকদের বক্তব্য, মহিলা যাত্রীদের একটি বড় অংশ এখন সরকারি বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। আগে যে যাত্রীরা প্রথম পাওয়া বাসে উঠে পড়তেন, এখন তাঁদের অনেকেই সরকারি বাস না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। ফলে বেসরকারি বাসের আসন ফাঁকা থাকছে, যাত্রীসংখ্যা কমছে এবং আয়ও হ্রাস পাচ্ছে।
বাসমালিক সংগঠনগুলির দাবি, ইতিমধ্যেই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধি, বীমা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি পরিবহণ শিল্প চাপে ছিল। তার উপর যাত্রী কমে যাওয়ায় অনেক রুটে ব্যবসা অলাভজনক হয়ে উঠছে। কয়েকজন মালিকের বক্তব্য, দিনের শেষে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ফারাক এতটাই কমে যাচ্ছে যে বাস চালিয়ে লাভের বদলে ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে সেই সব রুটে, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি বাস একই সঙ্গে চলাচল করে। যাত্রীদের একটি বড় অংশ, বিশেষত মহিলা যাত্রীরা, স্বাভাবিকভাবেই বিনামূল্যের সুবিধা নিতে চাইছেন। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এর ফলে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটি অসম হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ বেসরকারি পরিবহণ ব্যবসায়ীদের।
তাঁদের প্রশ্ন, যদি সরকার সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করতেই চায়, তাহলে বেসরকারি বাসকেও সেই প্রকল্পের আওতায় আনা যায় না কেন? সরকার চাইলে নির্দিষ্ট সংখ্যক মহিলা যাত্রীর ভাড়ার অর্থ সরাসরি বেসরকারি বাসমালিকদের দিতে পারে। তাতে যাত্রীও সুবিধা পাবেন, আবার বেসরকারি পরিবহণ ব্যবস্থাও টিকে থাকবে।
পরিবহণ বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, বিষয়টি শুধুমাত্র ব্যবসায়িক ক্ষতির প্রশ্ন নয়। পশ্চিমবঙ্গের গণপরিবহণ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ এখনও বেসরকারি বাসের উপর নির্ভরশীল। বহু এলাকায় সরকারি বাসের সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। যদি আর্থিক চাপে বেসরকারি বাসের সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ যাত্রীদেরই অসুবিধা হবে।
অন্যদিকে সরকার এই প্রকল্পকে নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে। সরকারি মহলের মতে, বিনামূল্যে যাতায়াতের সুযোগ পাওয়ায় বহু মহিলা এখন আরও সহজে কর্মস্থলে যেতে পারছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছতে পারছেন এবং পরিবারের আর্থিক বোঝাও কিছুটা কমছে। বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে এই সাশ্রয় উল্লেখযোগ্য।
সরকারি সূত্রের দাবি, প্রকল্পটির উদ্দেশ্য কোনওভাবেই বেসরকারি পরিবহণকে ক্ষতিগ্রস্ত করা নয়। বরং বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বেসরকারি বাসমালিকদের উদ্বেগও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ রাজ্যে গত এক দশকে বেসরকারি বাসের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। নতুন বাস নামানোর আগ্রহও তেমন দেখা যাচ্ছে না।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পের সাফল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণপরিবহণের সামগ্রিক কাঠামোকে কীভাবে টিকিয়ে রাখা যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর জন্য প্রয়োজন সরকার, পরিবহণ দফতর এবং বেসরকারি বাসমালিক সংগঠনগুলির মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা।
নারীদের বিনামূল্যে যাত্রার সুবিধা নিঃসন্দেহে জনপ্রিয় এবং সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ। কিন্তু সেই উদ্যোগের অনিচ্ছাকৃত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যদি বেসরকারি পরিবহণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন এবং বাস্তবসম্মত নীতিগত হস্তক্ষেপ, যাতে যাত্রীস্বার্থ, সামাজিক ন্যায় এবং পরিবহণ ব্যবস্থার আর্থিক স্থায়িত্ব—তিনটিই একসঙ্গে রক্ষা করা যায়।