হাইলাইটস:
- পিএম আবাস যোজনা সংক্রান্ত অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার প্রাক্তন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহ।
- ২০২৬ সালের সরকার পরিবর্তনের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভার চতুর্থ প্রাক্তন মন্ত্রী হিসেবে জেলে গেলেন তিনি।
- তদন্তকারীদের দাবি, আবাস প্রকল্পের সুবিধাভোগী তালিকা, বরাদ্দ এবং অর্থ বণ্টনে গুরুতর অসঙ্গতির প্রমাণ মিলেছে।
- বিরোধীদের অভিযোগ, তৃণমূল আমলে গড়ে ওঠা ‘দুর্নীতির নেটওয়ার্ক’-এর আরেকটি স্তর উন্মোচিত হল।
- তৃণমূলের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই বিরোধী নেতাদের একের পর এক গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের পর দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের আবহে আরও এক বড় রাজনৈতিক ঘটনা ঘটল। প্রাক্তন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী ও দিনহাটার প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা উদয়ন গুহকে গ্রেপ্তার করেছে তদন্তকারী সংস্থা। অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা (পিএম আবাস) প্রকল্পে অনিয়ম, সুবিধাভোগী নির্বাচনে পক্ষপাত এবং সরকারি অর্থ বণ্টনে দুর্নীতির সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগ ছিল। তদন্তকারীরা দীর্ঘদিন ধরে তথ্য সংগ্রহের পর এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
উদয়ন গুহ দীর্ঘদিন কোচবিহার ও উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন। ফরওয়ার্ড ব্লক থেকে তৃণমূলে যোগ দিয়ে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ নেতা হিসেবে উঠে আসেন এবং উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের দায়িত্বও সামলান। কিন্তু রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক পুরনো অভিযোগ নতুন করে খতিয়ে দেখা শুরু হয়। এর আগেও দিনহাটা পুরসভা সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
তদন্ত সূত্রের দাবি, আবাস প্রকল্পে প্রকৃত গরিবদের বদলে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও কর্মীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ উঠে এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে সুবিধাভোগী দেখানো হয়েছে, আবার বহু প্রকৃত দাবিদার বঞ্চিত হয়েছেন বলেও অভিযোগ। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে নথি পরীক্ষা ও সাক্ষ্যগ্রহণের পরই গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে এই গ্রেপ্তার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ২০২৬ সালের নির্বাচনে তৃণমূল ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই বিজেপি সরকার দুর্নীতি দমনের নামে একাধিক তদন্ত শুরু করেছে। এর আগে মমতা মন্ত্রিসভার আরও তিন প্রাক্তন মন্ত্রী বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। উদয়ন গুহের গ্রেপ্তারের ফলে সেই তালিকা আরও দীর্ঘ হল।
তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য পুরো ঘটনাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে ব্যাখ্যা করেছে। দলের নেতাদের বক্তব্য, নির্বাচনে পরাজয়ের পর বিরোধী শিবিরকে ভাঙতে এবং রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতেই প্রশাসনকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, প্রকৃত আইনি প্রক্রিয়ার পরিবর্তে বেছে বেছে তৃণমূল নেতাদের নিশানা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বিজেপির বক্তব্য, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতেই সরকার এগোচ্ছে। সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নয়, আইনের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজ্য সরকারের দাবি, বহু বছর ধরে জমে থাকা অভিযোগগুলির তদন্ত এখন দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে।
উদয়ন গুহের গ্রেপ্তার উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। দিনহাটা ও কোচবিহার অঞ্চলে তাঁর উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক প্রভাব ছিল। ফলে এই ঘটনায় তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের উপর চাপ বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজ্যের রাজনৈতিক সংঘাতও আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, পিএম আবাস দুর্নীতি মামলায় উদয়ন গুহের গ্রেপ্তার শুধু একটি আইনি ঘটনা নয়; এটি পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতারও গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ক্ষমতার পালাবদলের পর দুর্নীতির অভিযোগে যে ধারাবাহিক অভিযানের কথা শাসকদল বলছে, তারই সর্বশেষ অধ্যায় হয়ে উঠল এই গ্রেপ্তার।