হাইলাইটস
- নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসী পরিষদগুলি পঞ্চায়েত নির্বাচনের খসড়া বিধির বিরুদ্ধে সরব।
- তাদের অভিযোগ, নতুন বিধি আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত স্বশাসন ব্যবস্থাকে দুর্বল করবে।
- উপজাতি প্রতিনিধিরা খসড়া নিয়ম সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
- প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে সাংবিধানিক সুরক্ষার কথা স্মরণ করিয়েছে পরিষদগুলি।
- বিষয়টি নিয়ে আন্দামান-নিকোবর প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে।
নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে পঞ্চায়েত নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রস্তাবিত খসড়া বিধিকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন আদিবাসী পরিষদ ও প্রথাগত নেতৃত্ব একযোগে এই খসড়া বিধি বাতিলের দাবি তুলেছে। তাদের বক্তব্য, প্রস্তাবিত নিয়মাবলি কার্যকর হলে নিকোবরের শতাব্দীপ্রাচীন উপজাতীয় প্রশাসনিক কাঠামো এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
নিকোবরের বিভিন্ন দ্বীপে বসবাসকারী আদিবাসী সম্প্রদায়ের নিজস্ব সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে। গ্রাম ও উপজাতি পরিষদের মাধ্যমে ভূমি ব্যবহার, সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তি, সম্পদ বণ্টন এবং সামষ্টিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের রীতি গড়ে উঠেছে। আদিবাসী নেতাদের অভিযোগ, নতুন খসড়া বিধি সেই ঐতিহ্যগত ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং মূল ভূখণ্ডের প্রশাসনিক কাঠামোকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
উপজাতি পরিষদগুলির মতে, নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের বিশেষ সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক অবস্থান বিবেচনা না করেই খসড়া তৈরি করা হয়েছে। ফলে স্থানীয় বাস্তবতা, জনসংখ্যার চরিত্র এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি। তাদের আশঙ্কা, নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণ, প্রতিনিধিত্বের পদ্ধতি এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের ফলে আদিবাসী সমাজের স্বশাসনের অধিকার সংকুচিত হতে পারে।
আদিবাসী নেতারা আরও দাবি করেছেন, খসড়া প্রণয়নের আগে পর্যাপ্ত পরামর্শ বা গণশুনানির ব্যবস্থা করা হয়নি। স্থানীয় পরিষদগুলির মতামত যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। তাদের বক্তব্য, যে কোনও নির্বাচন বিধি প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা হওয়া উচিত ছিল।
এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে নিকোবরের ঐতিহ্যগত ‘ট্রাইবাল কাউন্সিল’ ব্যবস্থা। বহু বছর ধরে এই পরিষদগুলি স্থানীয় সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে আসছে এবং প্রশাসনের সঙ্গে সংযোগ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। পরিষদগুলির আশঙ্কা, নতুন পঞ্চায়েত কাঠামো চালু হলে তাদের ভূমিকা কার্যত গৌণ হয়ে পড়বে।
উপজাতি প্রতিনিধিরা প্রশাসনের কাছে খসড়া বিধি অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নতুন করে আলোচনা শুরুর দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের বিরোধিতা তাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা চাই যা আধুনিক প্রশাসন ও ঐতিহ্যগত উপজাতীয় অধিকার—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে।
আন্দামান ও নিকোবর প্রশাসন এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে সব অভিযোগের জবাব দেয়নি। তবে প্রশাসনিক সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে যে খসড়া নিয়ে প্রাপ্ত আপত্তি ও পরামর্শগুলি পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজনে সংশোধনের পথও খোলা রাখা হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, নিকোবরের মতো সংবেদনশীল উপজাতীয় অঞ্চলে যে কোনও প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই আস্থা ছাড়া নতুন নির্বাচনী কাঠামো কার্যকর করা কঠিন হবে। ফলে খসড়া বিধি নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিরোধ আগামী দিনে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটির প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।