হাইলাইটস:
- ১৮ জুন থেকে শুরু হচ্ছে পশ্চিমবিধানসভার বাজেট অধিবেশন।
- ২২ জুন পেশ হবে বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট।
- ক্ষমতায় আসার পর এটাই সরকারের প্রথম বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষা।
- কল্যাণমূলক প্রকল্প, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক সংস্কারে বিশেষ জোর থাকতে পারে।
- বিরোধী শিবিরে ভাঙনের আবহে অধিবেশন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। ১৮ জুন থেকে শুরু হচ্ছে রাজ্য বিধানসভার বাজেট অধিবেশন, আর তার চার দিন পর, ২২ জুন, পেশ হবে বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। গত মে মাসে ক্ষমতায় আসার পর নতুন সরকারের সামনে এটি শুধু একটি আর্থিক নথি পেশ করার বিষয় নয়; বরং ভোটারদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার রূপরেখা তুলে ধরারও সুযোগ।
বাজেট সাধারণত কোনও সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন। কিন্তু এবারের বাজেটের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পালাবদলের পর পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ফলে রাজ্যের অর্থনীতি, প্রশাসন এবং উন্নয়ন সংক্রান্ত অগ্রাধিকারগুলির ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন আনতে চায় বিজেপি সরকার, তার প্রথম স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলবে এই বাজেট থেকেই।
সরকারি সূত্রে ইঙ্গিত, বাজেটে একদিকে যেমন রাজ্যের আর্থিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠনের উপর জোর দেওয়া হবে, অন্যদিকে উন্নয়নমূলক ব্যয় বাড়ানোরও চেষ্টা থাকবে। রাজ্যের ঋণের বোঝা, রাজস্ব ঘাটতি এবং কেন্দ্র-রাজ্য আর্থিক সম্পর্কের প্রশ্নগুলি বাজেট আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিজেপি নেতৃত্ব বরাবরই অভিযোগ করে এসেছে যে আগের সরকার বহু ক্ষেত্রে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পারেনি। ফলে নতুন সরকার নিজেদের ‘দায়িত্বশীল আর্থিক প্রশাসন’-এর বার্তা দিতে চাইবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
বাজেটে সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির দিকে। নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি মহিলাদের আর্থিক সহায়তা, দরিদ্র পরিবারের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং প্রত্যক্ষ নগদ হস্তান্তর কর্মসূচির কথা বারবার বলেছিল। ক্ষমতায় আসার পর ইতিমধ্যেই ‘অন্নপূর্ণা’ প্রকল্প চালু হয়েছে। ফলে বাজেটে এই ধরনের প্রকল্পের জন্য কত বরাদ্দ রাখা হয় এবং সেগুলিকে দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে টেকসই করা হবে, তা দেখার অপেক্ষায় সাধারণ মানুষ।
কৃষিক্ষেত্রও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের বিপুল সংখ্যক মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল। কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, শস্য সংরক্ষণ এবং কৃষিপণ্যের বিপণনের জন্য নতুন উদ্যোগ ঘোষণা করা হতে পারে। পাশাপাশি কেন্দ্রের কৃষি প্রকল্পগুলির সঙ্গে রাজ্যের সমন্বয় আরও জোরদার করার কথাও বাজেটে উঠে আসতে পারে।
শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বড় বার্তার প্রত্যাশা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গে শিল্প বিনিয়োগের প্রশ্নটি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। বিজেপি সরকার নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরি করবে এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রশাসনিক জটিলতা কমাবে। ফলে শিল্পাঞ্চল, তথ্যপ্রযুক্তি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং স্টার্ট-আপ খাতে বিশেষ প্রণোদনার ঘোষণা আসতে পারে।
পরিকাঠামো উন্নয়নও বাজেটের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়ার সম্ভাবনা। সড়ক, সেতু, নগরোন্নয়ন, পানীয় জল এবং বিদ্যুৎ পরিষেবার সম্প্রসারণে বড়সড় বরাদ্দের সম্ভাবনা রয়েছে। বিজেপি নেতৃত্ব বারবার বলেছে, উন্নয়নের দৃশ্যমান চিহ্ন তৈরি করাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য পূরণে অবকাঠামো খাতে ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও নতুন সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হবে এই বাজেটে। সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নয়ন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, জেলা স্তরে বিশেষ চিকিৎসা পরিষেবা সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলি গুরুত্ব পেতে পারে। একই সঙ্গে স্কুল ও উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মমুখী পাঠক্রমের উপর জোর দেওয়া হতে পারে।
তবে এই বাজেট অধিবেশন শুধুমাত্র অর্থনৈতিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। রাজনৈতিক দিক থেকেও এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিধানসভায় বিরোধী শিবিরে নেতৃত্বের প্রশ্নে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা অধিবেশনের পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। বিরোধী দলনেতা কে হবেন, বিদ্রোহী শিবিরের শক্তি কতটা, এবং বিরোধী আসনে বসা সদস্যদের মধ্যে সমীকরণ কীভাবে বদলাচ্ছে— এই সমস্ত প্রশ্ন অধিবেশন জুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।
বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়কদের একাংশ ইতিমধ্যেই দাবি করেছেন যে তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন রয়েছে। অন্যদিকে দলীয় নেতৃত্ব সেই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। ফলে বাজেট অধিবেশন কার্যত সংখ্যার লড়াই এবং রাজনৈতিক বৈধতার পরীক্ষাক্ষেত্রেও পরিণত হতে পারে। বিরোধী শিবিরের অভ্যন্তরীণ সংঘাত বিজেপি সরকারের জন্য রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করলেও, সরকারকে একই সঙ্গে প্রশাসনিক দক্ষতারও প্রমাণ দিতে হবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বিধানসভার কার্যক্রম। বিরোধী সদস্যদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে বিধানসভার অধিবেশন খুব কম দিন চলেছে। এবার নতুন সরকারের সামনে সুযোগ রয়েছে আইনসভাকে আরও সক্রিয় এবং কার্যকর করে তোলার। দীর্ঘ আলোচনা, প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং বিভিন্ন নীতিগত বিষয়ে বিশদ বিতর্কের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
সব মিলিয়ে, ২২ জুনের বাজেট শুধু রাজ্যের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। এটি হবে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার প্রথম বড় পরীক্ষা। ভোটের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলিকে বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কাছে কতটা আর্থিক পরিকল্পনা রয়েছে, সেই উত্তর খুঁজবে রাজ্যবাসী। একই সঙ্গে বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশও অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে এই অধিবেশন থেকে।
পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে তাই ১৮ জুন থেকে শুরু হওয়া বাজেট অধিবেশন এবং ২২ জুনের বাজেট পেশ— উভয়ই নজরকাড়া ঘটনায় পরিণত হতে চলেছে। রাজ্যের অর্থনীতি, প্রশাসন এবং রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে এই অধিবেশন গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকতে পারে।