হাইলাইটস
- জি–৭ বৈঠকে বিশ্ব রাজনীতিতে ‘বিশ্বাসের ঘাটতি’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর উপস্থিতিতেই আস্থার সংকট কাটানোর আহ্বান জানান মোদী।
- যুদ্ধ, সংঘাত, সুরক্ষাবাদ এবং ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে সহযোগিতার নতুন কাঠামোর উপর জোর।
- উন্নয়নশীল দেশগুলির উদ্বেগ ও গ্লোবাল সাউথের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি ভারতের।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনীতি, জলবায়ু বা নিরাপত্তা নয়—বরং বিশ্বাসের সংকট। কানাডায় অনুষ্ঠিত জি–৭ শীর্ষ সম্মেলনে এই বার্তাই স্পষ্টভাবে তুলে ধরলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi। বিশেষ তাৎপর্যের বিষয় হল, তাঁর এই মন্তব্যের সময় উপস্থিত ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump, যাঁর প্রশাসনের নানা নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে।
মোদী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক আস্থা, স্বচ্ছতা এবং সহযোগিতা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিশ্বজুড়ে সেই আস্থার ঘাটতি ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠেছে। একাধিক যুদ্ধ, বাণিজ্যিক সংঘাত, নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি এবং কূটনৈতিক মেরুকরণ এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে দেশগুলির মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস বাড়ছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যে বহুপাক্ষিক কাঠামো বিশ্বকে দীর্ঘদিন স্থিতিশীলতা দিয়েছিল, তা আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অনেক উন্নয়নশীল দেশের অভিযোগ, বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের মতামত যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমছে।
মোদী জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সময়ে বিশ্বের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলি রয়েছে—সেগুলি কোনও একক দেশ একা সমাধান করতে পারবে না। সন্ত্রাসবাদ, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, সাইবার হুমকি কিংবা মহামারির মতো সমস্যার মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগই একমাত্র পথ। আর সেই সহযোগিতার ভিত্তি হতে হবে বিশ্বাস।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির উদ্বেগের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলির উচিত উন্নয়নশীল দেশগুলিকে শুধুমাত্র বাজার বা কৌশলগত অংশীদার হিসেবে না দেখে সমান মর্যাদার অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা। আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ ও চাহিদাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সুরক্ষাবাদী প্রবণতা বিশ্ব অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশগুলির মধ্যে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মোদীর বক্তব্যের একটি কূটনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে একটি সেতুবন্ধনকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে। জি–২০ সভাপতিত্বের সময়ও নয়াদিল্লি গ্লোবাল সাউথের উদ্বেগকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনার চেষ্টা করেছিল। জি–৭ মঞ্চে একই বার্তা পুনরায় তুলে ধরে ভারত সেই অবস্থানকেই আরও জোরালো করল।
ট্রাম্পের উপস্থিতিতে এই বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি, শুল্ক বৃদ্ধি এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি সংশয় নিয়ে অতীতে ট্রাম্প প্রশাসন বহু বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। যদিও মোদী সরাসরি কোনও দেশের নাম নেননি, তবু তাঁর বক্তব্যকে অনেকেই বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আস্থার সংকট নিয়ে সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখছেন।
জি–৭ সম্মেলনের মূল আলোচনাগুলির মধ্যে ছিল বৈশ্বিক অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং চলমান আন্তর্জাতিক সংঘাত। এই সব বিষয়ের মধ্যেই মোদীর বার্তা ছিল তুলনামূলকভাবে মৌলিক—বিশ্ব যদি সত্যিই বড় সমস্যাগুলির সমাধান চায়, তবে প্রথমে দেশগুলির মধ্যে ভেঙে পড়া আস্থার ভিত্তিকে পুনর্গঠন করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিলেন, তা শুধু কূটনৈতিক ভাষণ নয়, বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্ক সংকেতও বটে। প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য যতই বাড়ুক, পারস্পরিক বিশ্বাস ছাড়া স্থায়ী শান্তি ও সহযোগিতা সম্ভব নয়। আর সেই কারণেই আজকের বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠেছে—আস্থা।