Home খবর ১৬ বছরের আগে ‘লগ আউট’? শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে সরাতে বিশ্বজুড়ে কড়াকড়ি

১৬ বছরের আগে ‘লগ আউট’? শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে সরাতে বিশ্বজুড়ে কড়াকড়ি

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
44 views 5 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • ২০২৭ সালের শুরু থেকে ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করতে চলেছে ব্রিটেন।
  • অস্ট্রেলিয়া ইতিমধ্যেই এমন আইন কার্যকর করেছে, যদিও কিশোরদের একটি বড় অংশ এখনও নানা উপায়ে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাচ্ছে।
  • ফ্রান্স, স্পেন, গ্রিস, ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াও একই পথে হাঁটছে।
  • শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, সাইবার বুলিং, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং অ্যালগরিদম-নির্ভর আসক্তি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
  • সমর্থকদের দাবি, এটি জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন; সমালোচকদের মতে, নিষেধাজ্ঞা নয়, প্রয়োজন ডিজিটাল শিক্ষা।

এক দশক আগেও সোশ্যাল মিডিয়াকে গণতন্ত্র, যোগাযোগ এবং সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত হিসেবে দেখা হত। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মকে তরুণ প্রজন্মের জন্য সুযোগের জানালা মনে করা হত। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই ধারণা দ্রুত বদলাচ্ছে। বিশ্বের বহু দেশ এখন উল্টো প্রশ্ন তুলছে—শিশুদের কি আদৌ সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকার অনুমতি দেওয়া উচিত?

এই বিতর্কে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ নিল ব্রিটেন। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ঘোষণা করেছেন, ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করা হবে। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, কিছু গেমিং প্ল্যাটফর্ম এবং লাইভস্ট্রিমিং পরিষেবার ওপরও বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার চলতি বছরের মধ্যেই সংসদে আইন আনতে চায় এবং ২০২৭ সালের শুরুতে তা কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়েছে।

ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্য স্পষ্ট। শিশুদের অনলাইন জগৎ এখন আর নিরীহ বিনোদনের ক্ষেত্র নয়। এটি এমন এক পরিবেশ, যেখানে আসক্তি, মানসিক চাপ, ঘৃণামূলক প্রচার, যৌন শোষণ এবং ভুল তথ্যের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে শিশুদের সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করতেই হবে।

ব্রিটেনের এই পদক্ষেপ বিচ্ছিন্ন নয়। বরং এটি একটি আন্তর্জাতিক প্রবণতার অংশ।

অস্ট্রেলিয়া: প্রথম বড় পরীক্ষা

এই আন্দোলনের পথিকৃৎ অস্ট্রেলিয়া। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশটি বিশ্বের প্রথম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করে। স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং অন্যান্য বড় প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য ন্যূনতম বয়স ১৬ বছর নির্ধারণ করা হয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি লক্ষ লক্ষ অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি দেখিয়েছে, প্রযুক্তিগতভাবে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সহজ নয়।

অনেক কিশোর ভুয়ো জন্মতারিখ ব্যবহার করে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলেছে। কেউ বাবা-মা বা বড় ভাইবোনের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে। কেউ আবার বয়স যাচাই প্রযুক্তিকে ফাঁকি দেওয়ার কৌশল শিখে ফেলেছে। ফলে ছয় মাস পরে দেখা যাচ্ছে, আইন থাকা সত্ত্বেও বহু কিশোর এখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়।

তবু সমর্থকদের দাবি, এই আইনের প্রকৃত প্রভাব এখনকার ব্যবহারকারীদের ওপর নয়, আগামী প্রজন্মের ওপর পড়বে। যে শিশুরা এখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রবেশ করেনি, তারা হয়তো আরও কয়েক বছর দূরে থাকবে।

ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছে কড়াকড়ি

ইউরোপে এখন কার্যত একটি নতুন রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ দীর্ঘদিন ধরেই শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। ফ্রান্সে ১৫ বছরের কম বয়সিদের জন্য নিষেধাজ্ঞা চালুর প্রস্তুতি চলছে।

স্পেনে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছেন। গ্রিসে ২০২৭ সাল থেকে ১৫ বছরের নিচে শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোতাকিস একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তি নিজে সমস্যা নয়। সমস্যা হল সেই ব্যবসায়িক মডেল, যা শিশুদের মনোযোগকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে। যত বেশি সময় তারা স্ক্রিনে কাটাবে, কোম্পানিগুলির লাভ তত বাড়বে। তাই শিশুদের সুরক্ষার জন্য এই চক্র ভাঙা জরুরি।

ডেনমার্ক এবং অস্ট্রিয়াও একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। ডেনমার্কের যুক্তি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ—শিশুদের জীবনে “শান্তি, খেলা এবং স্বাভাবিক বিকাশের” জন্য আরও সময় দরকার।

এশিয়ার উদ্বেগ

এশিয়াতেও উদ্বেগ কম নয়।

মালয়েশিয়া সম্প্রতি ১৬ বছরের নিচে শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করেছে। কোম্পানিগুলিকে বয়স যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং নিয়ম না মানলে জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়া আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সরকার টিকটক, ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং রোবলক্সকে “উচ্চ ঝুঁকির প্ল্যাটফর্ম” হিসেবে চিহ্নিত করে ১৬ বছরের নিচে ব্যবহারকারীদের প্রবেশ সীমিত করেছে।

অন্যদিকে চীন বহু বছর ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অধিকারী। শিশুদের ভিডিও গেম খেলার সময় সীমিত করা হয়েছে সপ্তাহে মাত্র তিন ঘণ্টায়। পশ্চিমা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কার্যত নিষিদ্ধ। রাষ্ট্রের যুক্তি, ডিজিটাল আসক্তি একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

উদ্বেগের মূল কারণ কী?

এই নিষেধাজ্ঞাগুলির পেছনে শুধু নৈতিক আতঙ্ক নয়, গবেষণালব্ধ তথ্যও রয়েছে।

বিশ্বজুড়ে নানা গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার এবং উদ্বেগ, হতাশা, নিঃসঙ্গতা ও আত্মসম্মানবোধের সমস্যার মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে কিশোরীদের ক্ষেত্রে শরীর নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপের মাত্রা বেড়ে যায়।

সাইবার বুলিংও একটি বড় কারণ। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে অপমান বা হেনস্তা এখন ২৪ ঘণ্টা অনুসরণ করতে পারে একজন কিশোরকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনলাইন প্রতারণা, যৌন শিকারি, সহিংস ভিডিও এবং পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা।

সবচেয়ে বড় অভিযোগ অবশ্য অ্যালগরিদমের বিরুদ্ধে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলি এমনভাবে প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে যাতে ব্যবহারকারী যত বেশি সম্ভব সময় সেখানে কাটায়। অসীম স্ক্রলিং, স্বয়ংক্রিয় ভিডিও চালু হওয়া, নোটিফিকেশনের বন্যা—সবই মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার কৌশল। সমালোচকদের মতে, এই নকশা শিশুদের জন্য বিশেষভাবে বিপজ্জনক।

নিষেধাজ্ঞা নাকি শিক্ষা?

তবে সবাই এই পথকে সমর্থন করছেন না।

সমালোচকদের যুক্তি, নিষেধাজ্ঞা প্রযুক্তিকে অদৃশ্য করে না। বরং শিশুরা গোপনে ব্যবহার করতে শেখে। ফলে অভিভাবক বা শিক্ষকদের নজরদারির বাইরে চলে যায় তাদের অনলাইন কার্যকলাপ।

তাঁদের মতে, ডিজিটাল সাক্ষরতা শেখানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন শিশুকে রাস্তা পার হওয়া শেখানো হয়, তেমনই তাকে ইন্টারনেট ব্যবহারের ঝুঁকি ও নিয়ম শেখাতে হবে। প্রযুক্তির সঙ্গে নিরাপদ সম্পর্ক গড়ে তোলাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।

আরও একটি প্রশ্ন উঠছে—বয়স যাচাই কতটা নিরাপদ? কোটি কোটি ব্যবহারকারীর পরিচয়পত্র বা মুখের তথ্য সংগ্রহ করলে গোপনীয়তার নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

নতুন যুগের জনস্বাস্থ্য বিতর্ক

একসময় ধূমপান, অ্যালকোহল বা জুয়ার বিরুদ্ধে যেভাবে সরকারগুলি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল, এখন অনেক নীতিনির্ধারক সোশ্যাল মিডিয়াকেও একই দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেছেন। তাদের মতে, এটি শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়; এটি শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণের প্রশ্ন।

ব্রিটেনের সিদ্ধান্ত সেই বৃহত্তর পরিবর্তনেরই প্রতীক। আগামী কয়েক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ধরনের আইন কার্যকর হলে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর মিলবে—ডিজিটাল যুগে শৈশবকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় কি নিষেধাজ্ঞা, নাকি শিক্ষা?

এই বিতর্কের নিষ্পত্তি এখনও অনেক দূরে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: যে সোশ্যাল মিডিয়াকে একসময় সীমাহীন স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে দেখা হত, আজ সেটিকেই অনেক সরকার শিশুদের জন্য সম্ভাব্য বিপদ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles