Home খবররাজ্য-রাজনীতি কালীঘাটে বিস্ফোরণ: সিআইডি জেরা, আইনি ভাঙন ও ‘ধৃতরাষ্ট্র’ বিতর্ক

কালীঘাটে বিস্ফোরণ: সিআইডি জেরা, আইনি ভাঙন ও ‘ধৃতরাষ্ট্র’ বিতর্ক

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিআইডি হাজিরার দিনেই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনি শিবির সরে দাঁড়ানো এবং রিজু দত্তর বিস্ফোরক মন্তব্যে তৃণমূলের অন্দর-সংকট ফের প্রকাশ্যে। Calcutta High Court তাঁকে CID-র সামনে হাজির হতে বলার পাশাপাশি তিন সপ্তাহের অন্তর্বর্তী সুরক্ষাও দেয়।

by পার্বণ
0 comments 31 views 6 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার স্পেশাল রিপোর্ট: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এমন দিন বারবার আসে না। একদিকে সিআইডি-র ম্যারাথন জেরার মুখে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্যদিকে দলের অন্দরেই ক্ষোভ, অপমান, আত্মসম্মান আর ক্ষমতার লড়াইয়ের বিস্ফোরণ। লোকসভা নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে তৃণমূল কংগ্রেসের ভিতরের ফাটল এবার আর চাপা রইল না। কালীঘাটের অলিন্দ থেকে আদালত চত্বর, দলীয় আইনজীবী শিবির থেকে রাজপথ—সব জায়গাতেই যেন একসঙ্গে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ভূমিকম্প।

স্বাক্ষর জালিয়াতি মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সিআইডি-র সামনে হাজির হতে নির্দেশ দেয় আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে অন্তর্বর্তী সুরক্ষাও দেওয়া হয়। কিন্তু সেই আইনি লড়াইয়ের দিনেই তৃণমূলের ভেতর থেকে এমন সব বিস্ফোরক মন্তব্য সামনে এল, যা বাংলার রাজনীতিকে নতুন অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

মাঝরাতের হাই-ড্রামা: অভিষেকের আইনি শিবিরে ভাঙন

ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু বিধানসভার বহুচর্চিত স্বাক্ষর জালিয়াতি মামলা। এই মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হয়ে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন শ্রীরামপুরের প্রবীণ সাংসদ তথা বর্ষীয়ান আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর টিম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই সমীকরণে নাটকীয় বদল ঘটে।

কল্যাণ-পুত্র তথা আইনজীবী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিয়ে দাবি করেন, তাঁদের অত্যন্ত অসম্মানজনকভাবে জানানো হয় যে অন্য আইনজীবীরা মামলায় উপস্থিত থাকবেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে যায়, বিষয়টি শুধু পেশাগত সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আত্মসম্মান, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং দীর্ঘদিনের সম্পর্কের হিসেব-নিকেশ।

শীর্ষণ্যর কথায়, তাঁরা কেউ “সুখের পাখি” নন। সুসময়-দুঃসময়, প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে তাঁরা দলের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে যেভাবে তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা তাঁদের কাছে অপমানজনক। আরও কড়া ভাষায় তিনি বলেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য তাঁর বা তাঁর বাবার সংসার চলে না। তিনি তৃণমূলপন্থী হতে পারেন, কিন্তু “তৃণমূল জীব” নন।

এই বক্তব্যের পরই কার্যত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনি ময়দানে বড় ধাক্কা লাগে। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ঘনিষ্ঠ আইনজীবী শিবির অভিষেকের মামলা থেকে সরে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন—যদি আইনি লড়াইয়ের মুহূর্তেই দলের ভিতরের পুরনো সৈনিকরা দূরে সরে যান, তাহলে অভিষেকের রাজনৈতিক অবস্থান কতটা মজবুত?

“উনি তখন কোথায় ছিলেন?”—কল্যাণকে ধুয়ে দিয়ে ময়দানে কাকলি ঘোষ দস্তিদার

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আইনি বয়কট এবং দলের অন্দরে তৈরি হওয়া ‘ধৃতরাষ্ট্র’ বিতর্কের মাঝেই পাল্টা কামান দাগেন বারাসাতের বরিষ্ঠ তৃণমূল সাংসদ ডক্টর কাকলি ঘোষ দস্তিদার। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরজি কর আন্দোলন সংক্রান্ত মন্তব্যকে এক হাত নিয়ে বাংলাস্ফিয়ারের সামনে বিস্ফোরক ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। কাকলি দেবী সরাসরি কল্যাণবাবুকে বিঁধে বলেন:

“আরজি করের ঘটনার রাতে যখন ‘রাত দখল’ আন্দোলন হচ্ছিল, তখন আমার দুই মেয়ে আর বড় ছেলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছে। আমার ছোট ছেলে এনআরএস-এ গিয়ে লাঠিচার্জের মুখোমুখি হয়েছে! আমরা সশরীরে লড়াই করেছি, দলের নেত্রীর সঙ্গে নিজে দাঁড়িয়ে কথা বলেছি। তখন উনি (কल्याण বন্দ্যোপাধ্যায়) কোথায় ছিলেন? আমি তো ওনাকে কোথাও দেখিনি!”

কাকলি ঘোষ দস্তিদারের এই সরাসরি আক্রমণ প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, তৃণমূলের অন্দরের লড়াইটা এখন আর শুধু ‘অভিষেক বনাম ওল্ড গার্ডস’ নয়, তা এখন প্রবীণ বনাম প্রবীণের এক চরম কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির রূপ নিয়েছে।

রিজু দত্তর বিস্ফোরণ: “অভিষেকের কাউন্সিলর হওয়ার যোগ্যতাও নেই”

এই আইনি সংঘাতের মধ্যেই আরও বড় রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটান তৃণমূলের প্রাক্তন যুবনেতা ও মুখপাত্র রিজু দত্ত। সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

রিজু দত্তর অভিযোগ, দলের সিনিয়র নেতৃত্বকে পরিকল্পিতভাবে সাইডলাইন করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এমন একজনকে দলের শীর্ষে তুলে ধরা হয়েছে, যার “একটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর হওয়ার মতোও ন্যূনতম যোগ্যতা নেই”। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মহাভারতের ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করে রিজু বলেন, দিদি নিজের চোখ বেঁধে অন্ধের মতো সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করেছেন।

তাঁর সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ—অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আই-প্যাক কেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললেই তাকে চুপ করানোর চেষ্টা হয়েছে। রিজুর দাবি, দলের ভেতরে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। বিরুদ্ধস্বরে কথা বললেই মামলা, চাপ, প্রশাসনিক ভয় দেখানো—এসবের মাধ্যমে অনেককে চুপ করিয়ে রাখা হয়েছিল।

রিজু আরও দাবি করেন, তৃণমূলের প্রতীকে জেতা বহু সাংসদ ও বিধায়ক নাকি ভেতরে ভেতরে অন্য রাজনৈতিক শিবিরের দিকে ঝুঁকে গিয়েছেন। যদিও এই দাবিগুলির স্বাধীন যাচাই এখনও হয়নি, তবু এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে আসা নিজেই তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও গভীর করেছে।

ড্যামেজ কন্ট্রোলে কুণাল-কীর্তি: ক্ষোভ চাপা রইল না

দলের এই অস্বস্তিকর অবস্থায় মুখ খুলতে হয় তৃণমূলের একাধিক নেতাকে। কুণাল ঘোষ কৌশলী অবস্থান নিয়ে বলেন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরনো এবং পরীক্ষিত সৈনিক। তিনি কার মামলা লড়বেন বা লড়বেন না, তা তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এই বক্তব্যে সরাসরি অভিষেককে আক্রমণ করা না হলেও কল্যাণের আত্মসম্মানের প্রশ্নটিকে অস্বীকার করা হয়নি।

অন্যদিকে কীর্তি আজাদ আরও স্পষ্টভাবে বলেন, শেষ মুহূর্তে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সিনিয়র আইনজীবীকে জানানো যে অন্য কেউ মামলা লড়বেন, তা অনুচিত। তাঁর মতে, কল্যাণবাবু আবেগপ্রবণ মানুষ, এবং তাঁর ক্ষোভ অস্বাভাবিক নয়। তবে তিনি আশাবাদী—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কথা বললে পরিস্থিতি সামলে যেতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এটি কি সত্যিই সাময়িক ভুল বোঝাবুঝি, নাকি তৃণমূলের অভ্যন্তরে বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ?

সিআইডি জেরা, কালীঘাট বৈঠক এবং অস্বস্তির রাজনীতি

সিআইডি-র জিজ্ঞাসাবাদ শেষে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে পৌঁছান, তখন পরিস্থিতি যথেষ্ট উত্তপ্ত। বাইরে বিরোধীদের আক্রমণ, ভেতরে আইনজীবী শিবিরের ক্ষোভ, দলের একাংশের অসন্তোষ এবং নেতৃত্বের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে অভিষেকের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়।

তৃণমূলের ভিতরে যে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাচ্ছে, তা এখন আর অস্বীকার করার জায়গা নেই। একসময় যাঁকে দলের ভবিষ্যৎ মুখ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, সেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কি এখন চাপের মুখে? পুরনো তৃণমূল বনাম নতুন তৃণমূল—এই দ্বন্দ্ব কি এবার প্রকাশ্য সংঘাতে পরিণত হচ্ছে? নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পুরনো রাজনৈতিক কৌশলেই ভাঙন মেরামত করবেন?

শেষ প্রশ্ন: যুবরাজের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

আদালত, সিআইডি, দলীয় আনুগত্য, প্রবীণ বনাম নবীন নেতৃত্ব, আই-প্যাক বনাম পুরনো সংগঠন—সব মিলিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরমহল এখন এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বাংলার রাজনীতির এই অধ্যায় আর নিছক দলীয় কোন্দল নয়; বরং ক্ষমতার কেন্দ্র বদলের এক নির্মম ও প্রকাশ্য লড়াই।

ঠিক এই টানটান আবহেই, ১১ জুন বিকেল ৫টা নাগাদ ভবানী ভবনে সিআইডির ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আর জেরা-পর্বের আবহে কালীঘাটের আকাশ যেন আরও থমথমে—মেঘে ঢাকা, ভারী, অস্বস্তিতে জমাট। বাইরে তখন রিজু দত্ত ও কাকলি ঘোষ দস্তিদারের তোপ, আর ভেতরে আইনজীবী শিবিরকে ঘিরে অপমান, ক্ষোভ ও চাপা অস্বস্তির বিস্ফোরণ।

সায়নী ঘোষের মাস্ক পরা ছবি কিংবা তৃণমূল-কংগ্রেস সংযুক্তিকরণের জল্পনা উড়িয়ে দেওয়া হলেও, দলের ভেতরের প্রকৃত ফাটল এখন আর আড়াল করা যাচ্ছে না। পুরনো আনুগত্য, নতুন ক্ষমতার বলয় এবং নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ—সব প্রশ্নই একসঙ্গে সামনে চলে এসেছে।

তাহলে কি সুসময়ের ‘যুবরাজ’ সত্যিই ক্ষমতার বৃত্তে কোণঠাসা? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কি এই প্রবল চাপ কাটিয়ে আবার নিজের অবস্থান মজবুত করতে পারবেন? কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো পুরনো সৈনিকরা কি ফের দলে তাঁদের চেনা দাপুটে ভূমিকা ফিরে পাবেন? নাকি রিজু দত্তদের বিস্ফোরক অভিযোগ আসলে আরও বড় বিদ্রোহের পূর্বাভাস?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অবশ্য একটাই—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি তাঁর চিরাচরিত রাজনৈতিক কৌশলে আবারও ভাঙা ঘর জোড়া লাগাতে পারবেন, নাকি ক্ষমতার এই সংঘাতে তিনিও আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি অসহায়?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, ব্রেকিং নিউজ এবং এক্সক্লুসিভ ভিডিও আপডেট সবার আগে পেতে Banglasphere ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles