হাইলাইটস:

  • সীমান্ত বিরোধে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার প্রস্তাব সরাসরি খারিজ করল ভারত
  • নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ চীন ও ব্রিটেনের ভূমিকার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন
  • বিদেশ মন্ত্রক জানাল, সীমান্তের ৯৮ শতাংশ ইতিমধ্যেই চিহ্নিত
  • কালাপানি-লিপুলেখ প্রশ্নে পুরনো বিতর্ক ফের সামনে
  • দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বাড়তি প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ নয়াদিল্লির

বাংলাস্ফিয়ার: নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সংসদে দাঁড়িয়ে সীমান্ত বিরোধ মেটাতে তৃতীয় পক্ষের সাহায্যের কথা বলেছিলেন। নামও নিয়েছিলেন চীন ও ব্রিটেনের। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নয়াদিল্লি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিল—ভারত ও নেপালের সীমান্ত সমস্যা ভারত ও নেপালই মেটাবে। বাইরের কারও দরকার নেই।

ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের এই প্রতিক্রিয়া শুধু একটি কূটনৈতিক জবাব নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে ভারতের বহু দশকের পররাষ্ট্রনীতির একটি মৌলিক নীতি—দ্বিপাক্ষিক সমস্যার সমাধান দ্বিপাক্ষিকভাবেই হবে। বিশেষ করে যখন প্রতিবেশী দেশগুলির কথা আসে, তখন এই অবস্থান থেকে নয়াদিল্লি এক চুলও সরে আসতে রাজি নয়।

সংসদে বালেন্দ্রর মন্তব্য, দিল্লির তাত্‍ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া

নেপালের সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেন, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত। প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বা তৃতীয় পক্ষের সহায়তা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরই ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিকদের বলেন, ভারত ও নেপালের মধ্যে সীমান্ত-সংক্রান্ত বিষয়গুলি দেখার জন্য প্রতিষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা রয়েছে। সেই ব্যবস্থার মাধ্যমেই সমস্ত সমস্যা সমাধান সম্ভব।

জয়সওয়াল স্পষ্ট করে দেন, ভারত কোনও ধরনের বহিরাগত মধ্যস্থতার প্রয়োজনীয়তা দেখছে না।

৯৮ শতাংশ সীমান্ত মিটে গিয়েছে, বাকি অংশ নিয়েই বিতর্ক

ভারতের দাবি, দুই দেশের মধ্যে প্রায় ১,৮৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের ৯৮ শতাংশ ইতিমধ্যেই নির্ধারিত এবং চিহ্নিত।

বিতর্ক মূলত কয়েকটি ছোট অংশকে ঘিরে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল কালাপানি, লিপুলেখ এবং লিম্পিয়াধুরা অঞ্চল।

ভারত এই এলাকাগুলিকে উত্তরাখণ্ডের অংশ বলে মনে করে। অন্যদিকে নেপালের দাবি, ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী এগুলি তাদের ভূখণ্ডের অন্তর্গত।

এই অল্প কয়েকটি অঞ্চলই দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রধান কারণ হয়ে রয়েছে।

২০২০ সালের পর থেকে বিরোধ আরও জটিল

কালাপানি-লিপুলেখ বিরোধ নতুন নয়। তবে ২০২০ সালে পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়।

সেই বছর ভারত লিপুলেখ পর্যন্ত একটি কৌশলগত সড়ক নির্মাণ করে। নেপাল তার তীব্র প্রতিবাদ জানায়। পরে কাঠমান্ডু নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে, যেখানে কালাপানি, লিপুলেখ এবং লিম্পিয়াধুরাকে নেপালের অংশ হিসেবে দেখানো হয়।

তৎকালীন ঘটনাবলি দুই দেশের সম্পর্ককে তলানিতে ঠেলে দিয়েছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে উচ্চপর্যায়ের সফর ও কূটনৈতিক উদ্যোগে সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়, সীমান্ত প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত।

কেন তৃতীয় পক্ষকে এত অপছন্দ ভারতের?

ভারতের আপত্তির কারণ কেবল নেপাল নয়। এর পিছনে রয়েছে বৃহত্তর কৌশলগত চিন্তা।

নয়াদিল্লি বরাবরই মনে করে, একবার যদি কোনও দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার দরজা খোলা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য বিরোধেও একই দাবি উঠবে। কাশ্মীর প্রশ্নে যেমন ভারত দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা প্রত্যাখ্যান করে এসেছে, তেমনই সীমান্ত বিরোধের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করছে। পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল চীন।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী যখন সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীনের নাম উল্লেখ করেন, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই দিল্লির দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নেপালে চীনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং অবকাঠামোগত উপস্থিতি দ্রুত বেড়েছে। ভারত চাইছে না যে, তার প্রতিবেশী সম্পর্কের কোনও স্পর্শকাতর বিষয়ে বেজিং সরাসরি ভূমিকা পাক।

নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাবও রয়েছে

নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, ভারতবিরোধী জাতীয়তাবাদ বহুবার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সীমান্ত প্রশ্ন সাধারণ মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িত। ফলে সরকার যখন চাপে পড়ে, তখন এই ইস্যু রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানো হয়।

কাঠমান্ডুর একাংশের বিশ্লেষক মনে করছেন, বালেন্দ্র শাহের বক্তব্যের লক্ষ্য যতটা নয়াদিল্লি, তার চেয়ে বেশি ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শ্রোতারা। তবে সংসদে দেওয়া একটি বক্তব্য যে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, সেটাই এখন স্পষ্ট।

সম্পর্কের গুরুত্ব বিরোধের চেয়েও বড়

ভারত ও নেপালের সম্পর্ক শুধু মানচিত্রের রেখা দিয়ে নির্ধারিত হয় না।

উন্মুক্ত সীমান্ত, পারিবারিক যোগাযোগ, ধর্মীয় সম্পর্ক, শ্রমবাজার, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ায় এক অনন্য উদাহরণ। প্রতিদিন হাজার হাজার নেপালি নাগরিক ভারতে কাজ করেন। একই সঙ্গে ভারত নেপালের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারদের অন্যতম। এই বাস্তবতায় সীমান্ত নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও সম্পর্ককে সংঘাতের দিকে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কোনও পক্ষই নিতে চায় না।

বার্তা স্পষ্ট, সিদ্ধান্তও স্পষ্ট

বালেন্দ্র শাহের মন্তব্য হয়তো নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, কিন্তু ভারতের প্রতিক্রিয়াও সমান স্পষ্ট।

নয়াদিল্লির বক্তব্যের সারমর্ম একটাই—ভারত-নেপাল সীমান্ত সমস্যা ভারত ও নেপালের। এর সমাধানও ভারত ও নেপালকেই খুঁজে বের করতে হবে। তৃতীয় পক্ষের জন্য সেখানে কোনও আসন খালি নেই।