Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: একসময় এক ডলারের দাম ছিল সাত-আট টাকা। তারপর কুড়ি, চল্লিশ, ষাট, আশি পেরিয়ে এখন যদি তা সাতানব্বই টাকায় এসে দাঁড়ায়, তাহলে বিষয়টি নিছক একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান থাকে না। এটি আসলে একটি দেশের মুদ্রার ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ার দীর্ঘ আখ্যান। আর সেই আখ্যানের সবচেয়ে ভারী অধ্যায়টি লেখা হয় সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে, ওষুধের দোকানে, বিমানবন্দরে, পেট্রোল পাম্পে এবং চাকরির বাজারে।
কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পৃথিবীতে ডলার হল প্রধান মুদ্রা। ভারত যে তেল কেনে, যে মোবাইল, চিপ, সার, ভোজ্যতেল, চিকিৎসা সরঞ্জাম বা শিল্পযন্ত্র আমদানি করে, তার বড় অংশের মূল্য পরিশোধ হয় ডলারে। ফলে ডলারের তুলনায় টাকা দুর্বল মানে একই জিনিস কিনতে ভারতকে আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
জ্বালানি: প্রথম ধাক্কা
এই প্রভাব প্রথমে চোখে পড়ে জ্বালানির বাজারে।
ভারত পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ। ভারত তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের প্রায় পঁচাশি শতাংশ বিদেশ থেকে কেনে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি অপরিবর্তিতও থাকে, তবু ডলার আশি থেকে সাতানব্বই টাকায় পৌঁছালে একই পরিমাণ তেল কিনতে ভারতীয় সংস্থাগুলিকে বিপুল অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। সেই বোঝা শেষমেশ এসে পড়ে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে — পেট্রোল, ডিজেল, রান্নার গ্যাস, পরিবহণ, ট্রাক ভাড়া, বাসভাড়া, কৃষি উৎপাদনের খরচ—সবকিছু বাড়তে থাকে।
মুদ্রার অবমূল্যায়ন এভাবে এক ধরনের “অদৃশ্য মূল্যবৃদ্ধি” তৈরি করে। মানুষ হয়তো বুঝতেই পারেন না কেন হঠাৎ বাজারে আলুর দাম বাড়ল বা অনলাইন ডেলিভারি চার্জ চড়ল। কিন্তু সেই বৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে জ্বালানি খরচের ঊর্ধ্বগতি।
রান্নাঘর ও ভোগ্যপণ্য
দ্বিতীয় বড় অভিঘাত পড়ে খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে।
ভারত নানা ধরনের ভোজ্যতেল আমদানি করে। সূর্যমুখী তেল, পাম অয়েল, সয়াবিন তেলের মতো পণ্যের দাম সরাসরি ডলারের সঙ্গে যুক্ত। ফলে টাকার দাম কমলে বাজারে রান্নার তেলের দাম বাড়ে। একইভাবে বিদেশি রাসায়নিক সার, পশুখাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল—সবকিছুর খরচ বাড়তে থাকে। উৎপাদকরা সেই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ক্রেতার ঘাড়েই চাপান।
এখানেই সাধারণ মধ্যবিত্তের সংকট শুরু হয়।
বেতন বাড়ে বছরে একবার। কিন্তু খরচ বাড়ে প্রায় প্রতি মাসে। ফলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। পঞ্চাশ হাজার টাকা বেতন আগের মতোই আসছে, কিন্তু সেই টাকায় আগের তুলনায় কম জিনিস কেনা যাচ্ছে। অর্থনীতির ভাষায় এটি “রিয়াল ইনকাম ইরোশন” — প্রকৃত আয়ের ক্ষয়।
শিক্ষার্থী ও চিকিৎসাপ্রার্থী: সবচেয়ে নির্মম আঘাত
মুদ্রার দুর্বলতা সবচেয়ে কঠোর আঘাত হানে বিদেশে পড়তে যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের উপর। ধরা যাক আমেরিকার কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ফি চল্লিশ হাজার ডলার। ডলার আশি টাকায় থাকলে খরচ বত্রিশ লাখ টাকা। সেই ডলারই যদি সাতানব্বই টাকায় পৌঁছায়, খরচ প্রায় ঊনচল্লিশ লাখে গিয়ে ঠেকে। শুধু বিনিময় হারের পরিবর্তনেই কয়েক লাখ টাকার বাড়তি বোঝা তৈরি হচ্ছে। বিদেশে চিকিৎসা বা পর্যটনে যাওয়া মানুষের ক্ষেত্রেও একই হিসাব। যে পরিবারগুলি সন্তানের পড়াশোনার জন্য শিক্ষাঋণ নিয়েছে, তাদের মাসিক কিস্তির চাপও বাড়তে থাকে।
উল্টো দিকের সামান্য স্বস্তি
তবে এই ছবির একটি উল্টো দিকও আছে।
বিদেশে কর্মরত ভারতীয়রা যখন দেশে টাকা পাঠান, তখন তাঁরা কিছুটা লাভবান হন। কারণ এক ডলারে এখন বেশি ভারতীয় টাকা পাওয়া যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা বা ইউরোপে থাকা ভারতীয়দের রেমিট্যান্স তাই পরিবারগুলিকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। একইভাবে সফটওয়্যার রপ্তানিকারক সংস্থা বা আইটি শিল্পের কিছু অংশও ডলার আয়ের কারণে বাড়তি লাভ পেতে পারে।
কিন্তু এখানেও বাস্তবতা অত সহজ নয়।
কারণ ভারতীয় শিল্পের বড় অংশ বিদেশি যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। ফলে তাদের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। অর্থাৎ ডলার আয়ের সুবিধা থাকলেও আমদানির খরচ সেই লাভের একটি বড় অংশ খেয়ে নেয়।
ঋণ, বিনিয়োগ ও আস্থার সংকট
ভারতের বহু সংস্থা বিদেশ থেকে ডলারে ঋণ নেয়। টাকা দুর্বল হলে সেই ঋণ শোধ করতে বেশি টাকা লাগে, কোম্পানির লাভ কমে, নতুন বিনিয়োগ থেমে যায়, কর্মসংস্থানের বাজারে চাপ তৈরি হয়। একইসঙ্গে মুদ্রার দ্রুত অবমূল্যায়ন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কিত করে — তাঁরা শেয়ার বাজার থেকে অর্থ তুলে নিতে শুরু করেন, বাজারে অস্থিরতা বাড়ে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাধারণ মানুষ প্রায়ই প্রশ্ন করেন—টাকার দাম কমা কি সবসময় খারাপ?
অর্থনীতিবিদদের উত্তর কিছুটা জটিল। নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত অবমূল্যায়ন কখনও কখনও রপ্তানি বাড়াতে সাহায্য করে। কারণ ভারতীয় পণ্য বিদেশে তুলনামূলক সস্তা হয়ে যায়। ফলে টেক্সটাইল, চামড়া, আইটি পরিষেবা, ওষুধ শিল্পের মতো খাত কিছু সুবিধা পেতে পারে।
কিন্তু সমস্যা হয় যখন অবমূল্যায়ন দীর্ঘস্থায়ী ও দ্রুতগতির হয়। তখন তা অর্থনীতির শক্তির নয়, দুর্বলতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। এটি ইঙ্গিত দেয় যে দেশ বেশি আমদানি করছে, কম রপ্তানি করছে, বিদেশি পুঁজি বেরিয়ে যাচ্ছে, অথবা বাজার দেশের আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
নীরব সামাজিক পুনর্বণ্টন
ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিতে এর সামাজিক অভিঘাতও গভীর।
মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি আঘাত করে দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্তকে। ধনী মানুষ হয়তো বাড়তি পেট্রোলের দাম সামলে নিতে পারেন, কিন্তু দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের কাছে রান্নার গ্যাসের দাম একশো টাকা বাড়া মানে মাসের খাদ্যতালিকা বদলে যাওয়া।
অর্থাৎ ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া কেবল অর্থনীতির খবর নয়। এটি এক ধরনের নীরব সামাজিক পুনর্বণ্টন যেখানে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে অদৃশ্যভাবে টাকা বেরিয়ে গিয়ে আমদানি ব্যয়, ঋণের চাপ ও মূল্যবৃদ্ধির বোঝা সামলাতে ব্যবহৃত হয়।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল মানসিকতা।
যখন মানুষ বারবার দেখে টাকা দুর্বল হচ্ছে, তখন অর্থনীতির ওপর আস্থাও কমতে শুরু করে। মানুষ সোনা কিনতে ঝোঁকে, ডলারভিত্তিক সম্পদে আগ্রহ বাড়ে, বিদেশে অর্থ সরানোর প্রবণতা দেখা দেয়। অর্থাৎ মুদ্রার অবমূল্যায়ন কেবল আর্থিক ঘটনা নয়, এটি আস্থার সংকটও তৈরি করতে পারে।
একটি দেশের মুদ্রা আসলে সেই দেশের অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক। তাই ডলার নব্বই, পঁচানব্বই বা সাতানব্বই ছোঁয়া মানে শুধু বিদেশি মুদ্রার শক্তি বৃদ্ধি নয়, এটি একই সঙ্গে ভারতীয় অর্থনীতির ভঙ্গুরতাও প্রকাশ করে।