বাইশ বছর পরে আবার লাল-হলুদের উঠোনে শঙ্খ বাজছে।
কলকাতার আকাশে আজ যেন পুরনো দিনের গন্ধ।
ময়দানের বাতাসে ধুলো উড়ছে, কিন্তু সেই ধুলো আর ক্লান্তির নয়—
সে ধুলো স্মৃতির, আবেগের, বহুদিনের জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসের।

ইস্টবেঙ্গল এফসি আবার ভারতসেরা।
এই একটি বাক্য লিখতে যতটা সময় লাগে,
তার চেয়ে অনেক বেশি সময় লেগেছে এই বাক্য সত্যি হতে।

বাইশ বছর।
একটি প্রজন্ম বড় হয়ে গেছে।
যে ছেলে বাবার হাত ধরে শেষবার ট্রফি দেখেছিল,
সে এখন নিজের ছেলেকে নিয়ে মাঠে আসে।
যে বৃদ্ধ একদিন “লাল হলুদ” বলে গলা ফাটাতেন,
তিনি এখন চশমা মুছতে মুছতে শুধু বলেন—
“আর একবার যদি দেখতে পেতাম!”

ফুটবল আসলে শুধু খেলা নয়।
বিশেষ করে কলকাতায় তো নয়ই।
এ শহরে ফুটবল মানে ধর্মের চেয়েও পুরনো এক অভ্যাস।
এখানে মানুষ সংসারে হার মানে, বাজারে ঠকে, চাকরিতে অপমানিত হয়—
কিন্তু ক্লাব হারলে ব্যক্তিগত অপমানের মতো লাগে।

এই বাইশ বছরে কত কিছু বদলে গেছে।
কলকাতায় ট্রাম কমেছে, ফ্লাইওভার বেড়েছে।
ময়দানের গ্যালারিতে চিৎকারের বদলে মোবাইল ক্যামেরা উঠেছে।
অনেক কিংবদন্তি মারা গেছেন।
অনেক সমর্থক মাঝপথে রাগ করে বলেছিলেন—
“আর না, আর ইস্টবেঙ্গল দেখি না।”

কিন্তু তাঁরা দেখেছেন।
রাতের অন্ধকারে যেমন পুরনো প্রেমের চিঠি ফেলে দেওয়া যায় না,
ঠিক তেমনই ইস্টবেঙ্গলকে ত্যাগ করা যায় না।

এই ক্লাবের সমর্থকদের মধ্যে একধরনের উদ্বাস্তু মন আছে।
হারলেও তারা ভাবে— “একদিন ফিরবই।”
হয়তো পূর্ববঙ্গ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা মানুষের রক্তেই এই জেদ ছিল।
তাই ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকরা কখনও পুরোপুরি পরাজয় মানতে শেখেনি।

আজ সেই প্রত্যাবর্তনের দিন।

আজ কলকাতার বহু বাড়িতে মাছের ঝোল একটু বেশি সুস্বাদু।
চায়ের দোকানে রাজনৈতিক তর্ক সাময়িক বন্ধ।
অটোচালক ভাড়া কম না নিলেও মুখে হাসি আছে।
ফেসবুকে এমন লোকও “জয় ইস্টবেঙ্গল” লিখছেন,
যাঁরা সারা বছর ক্রিকেট ছাড়া কিছুই দেখেন না।

এমনকি বহু মোহনবাগান সমর্থকও আজ একটু নরম।
কারণ তারা জানে—
প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিশালী না হলে জয়ও নিরস লাগে।
কলকাতার ফুটবল আসলে এক অদ্ভুত যুগলবন্দি।
একজন ছাড়া অন্যজনের গল্প সম্পূর্ণ হয় না।

তবু এই রাত লাল-হলুদের।
কাল রাতের কলকাতায় হর্নও যেন তাল মেনে বেজেছে।
পুরনো পতাকা বেরিয়েছে আলমারি থেকে।
অনেক ছেঁড়া জার্সি আবার গায়ে উঠেছে।
বহুদিন পরে বহু মানুষ নিজেদের একটু কম বৃদ্ধ মনে করছেন।

কেউ কেউ বলছেন—
“এই তো আমাদের ইস্টবেঙ্গল!”
আসলে কথাটার মানে ট্রফি নয়।
তার মানে—
“আমরা এখনও শেষ হয়ে যাইনি।”

ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত এটাই,
সে মানুষকে বাস্তবের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়।
যে শহরে প্রতিদিন ব্যর্থতা আছে,
সেখানে একটি ক্লাবের জয় মানুষকে কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও বিশ্বাস করায়—
অপেক্ষা বৃথা যায় না।

আর তাই এই রাতে কলকাতার আকাশে যদি একটু বেশি আলো দেখা যায়,
জানবেন—
সেটা শুধু আতশবাজির নয়।
সেটা বাইশ বছরের জমে থাকা আশার আগুন।