Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-পরবর্তী আপিল ট্রাইবুনালের ছবিটি অস্বস্তিকর। মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৯টির মধ্যে ১২টি ট্রাইবুনাল ২৪.৯৮ লক্ষ আপিলের মধ্যে মাত্র ৬,৫৮১টি নিষ্পত্তি করেছে — অর্থাৎ মাত্র ০.২৬ শতাংশ। তার মধ্যে প্রায় চার হাজার নাম ভোটার তালিকায় ফিরেছে।
এই সংখ্যাই আসল গল্প। কারণ এটি শুধু ধীরগতির গল্প নয়; এটি ভুলের গল্পও। যদি নিষ্পত্তি হওয়া মামলার প্রায় ষাট শতাংশে ভোটারের নাম ফিরিয়ে দিতে হয়, তা হলে প্রথম দফার বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বড় ত্রুটি ছিল — এই সন্দেহ আর রাজনৈতিক অভিযোগমাত্র থাকে না, পরিসংখ্যানের ভাষা পেয়ে যায়।
ট্রাইবুনালের শম্বুকগতির পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, মামলার পাহাড়। প্রায় পঁচিশ লক্ষ আপিলের সামনে ১৯টি ট্রাইবুনাল কাগজে যত বড়ই শোনাক, বাস্তবে তা নগণ্য। দ্বিতীয়ত, এই আপিলগুলি সাধারণ প্রশাসনিক আপত্তি নয় — প্রতিটি মামলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিচয়, বসবাস, নথির ধারাবাহিকতা, মৃত্যু-স্থানান্তর-দ্বৈত নামের যাচাই এবং অনেক ক্ষেত্রে বহু বছরের ভোটার-ইতিহাস।
তৃতীয় কারণটি আরও গভীর। আগের পর্যায়ে যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের ব্যাপারে বিচারক বা কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন এখন স্পষ্টতই পুনর্বিবেচনার মুখে। তাই ট্রাইবুনাল দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে ভয় পাচ্ছে। কারণ দ্রুততা আবার ভুল তৈরি করতে পারে। কিন্তু ধীরতা নিজেও গণতান্ত্রিক অবিচার। ভোট চলে যায়, মামলা পড়ে থাকে।
এখানেই পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর বিতর্কের কেন্দ্র। নির্বাচন কমিশন বলছে ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণ দরকার। কিন্তু শুদ্ধিকরণের নামে যদি জীবিত, বসবাসকারী, বৈধ ভোটারদের নাম বাদ পড়ে, তবে তা আর প্রশাসনিক পরিচ্ছন্নতা থাকে না, তা ভোটাধিকারের ওপর আঘাত হয়ে ওঠে। ভোটার তালিকা কোনও রেশন কার্ড নয়, কোনও কল্যাণ প্রকল্পের উপভোক্তা-তালিকাও নয়। এটি গণতন্ত্রের নাগরিক নিবন্ধন। এখানে একটি নাম বাদ যাওয়া মানে একটি রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর নীরব হয়ে যাওয়া।
এত বড় ভুল হল কীভাবে
পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর বিতর্কে এখন সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি একটাই — যাঁদের নাম প্রথমে বাদ দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের এত বড় অংশ আবার ফিরছেন কীভাবে?
মাত্র ছয় হাজারের কিছু বেশি মামলার নিষ্পত্তির মধ্যেই যদি প্রায় চার হাজার মানুষ ভোটার তালিকায় ফিরে আসেন, তবে বোঝাই যাচ্ছে সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন নয়। এটি কাঠামোগত। কোথাও না কোথাও গোটা যাচাই-প্রক্রিয়ার ভিতরেই বড় গলদ ছিল।
এই গলদের সূত্র খুঁজতে গেলে প্রথমে নজর যায় মাঠপর্যায়ের যাচাই ব্যবস্থার দিকে। এসআইআর-এর আসল কাজটা আদালতে নয়, শুরু হয়েছিল বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের স্তরে। বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও-দের ওপর বিপুল চাপ পড়ে। অল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক ভোটারের তথ্য যাচাই করতে হয়েছে। বহু জায়গায় অভিযোগ উঠেছে, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই কাজ করানো হয়েছে। কোথাও বাড়িতে গিয়ে ভোটারকে পাওয়া যায়নি, কোথাও ভাড়াটে বদলেছে, কোথাও পুরনো ঠিকানা মিলছে না, কোথাও নামের বানানে অমিল।
ভারতের প্রশাসনিক বাস্তবতায় এগুলো অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু সমস্যাটা হল, এই অসঙ্গতিগুলিকে অনেক ক্ষেত্রেই “সন্দেহ” হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। অর্থাৎ একজন ভোটার বহু বছর ধরে একই বুথে ভোট দিয়েছেন, কিন্তু হঠাৎ দেখা গেল তাঁর নামের ইংরেজি বানানে সামান্য পার্থক্য। কোথাও বাবার নামের আদ্যক্ষর বাদ গেছে। কোথাও বয়স তিন বছর কমবেশি। কোথাও স্বামীর নামের বানান পাল্টেছে। আর সেখান থেকেই শুরু হয়েছে আপত্তি।
প্রশ্ন হল, এগুলো কি সত্যিই জাল ভোটারের প্রমাণ? নাকি ভারতের দুর্বল নথি-সংস্কৃতির স্বাভাবিক উপসর্গ?
নথির বিশৃঙ্খলা বনাম প্রশাসনিক যন্ত্র
ভারতের দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত সমাজে নথির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত দুর্বল। একেক সরকারি দপ্তরে একেক বানান, একেক বয়স। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে বিয়ের পরে নাম বা পদবির পরিবর্তন অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। গ্রামাঞ্চলে এখনও বহু মানুষের জন্মসনদ নেই। পুরনো ভোটার তালিকার নথি নষ্ট হয়েছে। কোথাও বাড়ির নম্বর বদলেছে, কোথাও পুরসভা এলাকার পুনর্বিন্যাস হয়েছে।
কিন্তু এসআইআর-এর সময় এই বাস্তবতার সঙ্গে প্রশাসনিক যন্ত্রের সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই ছিল যান্ত্রিক। কাগজে অমিল মানেই সন্দেহ। এই মনোভাব থেকেই বিপুল সংখ্যক বাদ পড়ার ঘটনা ঘটেছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। আর এখন ট্রাইবুনালের রায়গুলি সেই অভিযোগকে অনেকাংশে রাজনৈতিক স্লোগান থেকে বাস্তব প্রশ্নে পরিণত করছে।
কারণ ট্রাইবুনাল আবেগের ভিত্তিতে নাম ফিরিয়ে দিচ্ছে না, তারা নথি দেখেই দিচ্ছে। অর্থাৎ যাঁদের নাম প্রথমে বাদ গিয়েছিল, তাঁদের বিপুল অংশের ক্ষেত্রেই হয় প্রাথমিক যাচাই অসম্পূর্ণ ছিল, নয়তো মূল্যায়ন অতিরিক্ত কড়া ছিল।
এই জায়গায় আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ — সময়ের চাপ। নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণ সবসময় রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। ফলে প্রশাসনের ওপর দ্রুত কাজ শেষ করার চাপ থাকে। আর যখন লক্ষ লক্ষ নাম যাচাইয়ের কাজ খুব কম সময়ে করতে হয়, তখন মানবিক বিচার কমে গিয়ে “চেকলিস্ট প্রশাসন” শুরু হয়: ফর্ম আছে কি না, নথি মিলছে কি না, বাড়িতে পাওয়া গেছে কি না। অর্থাৎ ভোটার ধীরে ধীরে মানুষ থেকে ফাইলে পরিণত হন। আর সেখানেই ভুলের সম্ভাবনা ভয়ঙ্করভাবে বেড়ে যায়।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতাও এই পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করেছে। এখানে ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক মানেই তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক মেরুকরণ। শাসকপক্ষ বলছে ভুয়ো ভোটার সরানো হচ্ছে। বিরোধীরা বলছে বেছে বেছে বৈধ ভোটারদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। এই পরিবেশে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও দ্রুত রাজনৈতিক রং পেয়ে যায়। ফলে বিএলও থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসনের ওপরও এক অদৃশ্য চাপ তৈরি হয়। কেউ “নরম” হওয়ার দায়ে অভিযুক্ত হতে চান না। আবার কেউ “ভুল বাদ”-এর দায় নিতে রাজি নন। এই দ্বৈত আতঙ্ক প্রশাসনিক আচরণকে আরও রক্ষণাত্মক করে তোলে।
ট্রাইবুনালের ধীরগতির পিছনেও এই ভয় কাজ করছে। প্রথম পর্যায়ের এত বিপুল ভুল সামনে আসার পরে এখন বিচারকেরা অনেক বেশি সতর্ক। প্রতিটি নথি খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে — আগের ভোটার তালিকা, আধার, রেশন কার্ড, বিদ্যুতের বিল, বসবাসের প্রমাণ, সব মিলিয়ে যাচাই চলছে। ফলে একটি মামলার নিষ্পত্তিতে সময় লাগছে।
কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে গণতান্ত্রিক সংকট। কারণ ভোটারের অধিকার সময়-নিরপেক্ষ নয়। যদি কোনও ব্যক্তি নির্বাচন শেষ হওয়ার পরে নিজের নাম ফিরে পান, তবে আইনি জয় পেলেও রাজনৈতিকভাবে তিনি হেরে গেলেন। কারণ ভোট দেওয়ার অধিকার সেই নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। অর্থাৎ ধীর বিচার এখানে কার্যত আংশিক ভোট-বঞ্চনা। এই পরিস্থিতি নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও তুলছে। কারণ কমিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজই হল ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিশ্চিত করা। যদি বড় সংখ্যক বৈধ ভোটারকে প্রথমে বাদ দিয়ে পরে ফিরিয়ে আনতে হয়, তবে বিরোধীরা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলবে — এই প্রক্রিয়া কি সত্যিই নিরপেক্ষ ছিল?
আর এখানেই পুরো বিতর্ক প্রশাসনিক সীমা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। কারণ গণতন্ত্রে ভোটার তালিকা শুধু প্রযুক্তিগত দলিল নয়, এটি ক্ষমতার ভিত্তি। কে ভোট দেবে, কে দেবে না — এই প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ফল নির্ধারণ করতে পারে। ফলে এসআইআর নিয়ে বর্তমান বিতর্ক কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতার নয়, এটি গণতন্ত্রের আস্থাসঙ্কটেরও গল্প।
গণতন্ত্রের অশনি সঙ্কেত
পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর বিতর্ক এখন আর নিছক প্রশাসনিক জটিলতা নয়। এটি ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে পরিণত হচ্ছে। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষ প্রথমে আদালত নয়, প্রথমে ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অংশ হন। সেই ভোটাধিকার নিয়েই যদি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তবে পুরো রাজনৈতিক কাঠামোর ওপরই সন্দেহ জমতে শুরু করে।
আজ ট্রাইবুনালের সামনে লক্ষ লক্ষ মামলা ঝুলে আছে। নিষ্পত্তির গতি এত ধীর যে বর্তমান হারে সব আবেদন মেটাতে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে — এমন আশঙ্কাও রয়েছে। অথচ এই সময়ের মধ্যে নির্বাচন থেমে থাকবে না। মানুষ ভোট দেবে, সরকার গঠিত হবে, ক্ষমতা বদলাবে। কিন্তু যাঁদের নাম বাদ গেছে এবং যাঁদের মামলা এখনও ঝুলে আছে, তাঁদের জন্য গণতন্ত্র কার্যত “স্থগিত” হয়ে থাকবে। এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ।
কারণ ভোটাধিকার কোনও বিমূর্ত সাংবিধানিক অলংকার নয়। এটি নাগরিক মর্যাদার কেন্দ্রবিন্দু। একজন মানুষ আদালতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের নাম ফিরে পেলেও যদি মাঝখানে একটি বা দুটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করতে পারেন, তবে সেই ক্ষতি আর পূরণ করা যায় না।
এই কারণেই এখন রাজনৈতিক দলগুলিও বিষয়টিকে ক্রমশ আরও আক্রমণাত্মকভাবে তুলছে। বিরোধীদের বক্তব্য, এত বিপুল সংখ্যক নাম ফিরে আসা প্রমাণ করছে যে প্রথম পর্যায়ের বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় গুরুতর গলদ ছিল। তাঁদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণের নামে এক ধরনের “অতিরিক্ত সন্দেহের সংস্কৃতি” তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রেই বৈধ ভোটারদের প্রতিও অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়েছে।
শাসকপক্ষ অবশ্য পাল্টা যুক্তি দিচ্ছে — যদি আপিলের সুযোগ থাকে এবং মানুষ শেষ পর্যন্ত নাম ফেরত পান, তবে ব্যবস্থাই প্রমাণ করছে যে তা সংশোধনক্ষম। অর্থাৎ ভুল হলে তা শুধরে নেওয়ার পথ খোলা রয়েছে। শুনতে যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু বাস্তবে প্রশ্নটা আরও জটিল। কারণ একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাফল্য শুধু “ভুল সংশোধনের” ওপর নির্ভর করে না, বরং “অপ্রয়োজনীয় ভুল কমানোর” ওপর নির্ভর করে। যদি বিপুল সংখ্যক মানুষকে প্রথমে বাদ দিয়ে পরে ফিরিয়ে আনতে হয়, তবে তা প্রক্রিয়ার অন্তর্নিহিত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে
আর এখানেই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়ে উঠছে। ভারতের নির্বাচন কমিশন দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী নির্বাচন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলির একটি ছিল বিপুল বৈচিত্র্যের মধ্যেও তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পরিচালনা।
কিন্তু গত কয়েক বছরে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমশ বেড়েছে। বিরোধীরা প্রায়শই অভিযোগ করছে, কমিশন অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্তভাবে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে। আবার শাসকদল বলছে, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এই আক্রমণ আসলে পরাজয়ের অজুহাত তৈরি করা। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর বিতর্ক সেই বৃহত্তর জাতীয় বিতর্কের অংশ হয়ে উঠছে।
কারণ ভোটার তালিকা নিয়ে আস্থা নষ্ট হলে নির্বাচনের ফল নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়। আর গণতন্ত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত হল সেই সময়, যখন পরাজিত পক্ষ মনে করতে শুরু করে যে খেলার মাঠই সমান ছিল না।
এই পরিস্থিতিতে আদালতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন আইনজীবী ও নাগরিক সংগঠন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন — ট্রাইবুনালের বর্তমান পরিকাঠামো কি এত বিপুল সংখ্যক মামলা সামলানোর জন্য যথেষ্ট? বিচারপ্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা উচিত কি না? কোনও ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আগে আরও কঠোর যাচাই বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত কি না?
অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণে “প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার”-এর নীতি আরও শক্তভাবে প্রয়োগ করা দরকার। অর্থাৎ কোনও ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়ার আগে তাঁকে পর্যাপ্ত সময়, পরিষ্কার কারণ এবং সহজ আপিল ব্যবস্থা দিতে হবে। শুধু প্রশাসনিক অসঙ্গতিকে সন্দেহের ভিত্তি বানালে চলবে না। কারণ ভারতের মতো দেশে নথিগত বিশৃঙ্খলা এত সাধারণ যে কেবল কাগজের অমিল দিয়ে মানুষের নাগরিক বা ভোটার পরিচয় বিচার করা বিপজ্জনক হতে পারে।
প্রান্তিক মানুষের ওপর বৈষম্যের বোঝা
এই সংকটের আরও একটি গভীর সামাজিক দিক আছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া শুধু প্রশাসনিক অসুবিধা নয়, এটি সামাজিক মর্যাদার আঘাতও। বহু মানুষ মনে করেন, রাষ্ট্র হঠাৎ তাঁদের সন্দেহের চোখে দেখছে। বিশেষ করে দরিদ্র, প্রান্তিক এবং কম-শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই আতঙ্ক আরও তীব্র।
কারণ তারা জানে, আদালতে লড়াই করার সামর্থ্য সবার সমান নয়। একজন মধ্যবিত্ত শহুরে মানুষ হয়তো দ্রুত নথি জোগাড় করতে পারেন। কিন্তু গ্রামের দিনমজুর, বৃদ্ধা বিধবা বা বহুবার ঠিকানা বদলানো শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে সেই কাজ ভয়ঙ্কর কঠিন। ফলে এসআইআর-এর মতো প্রক্রিয়া অনিচ্ছাকৃতভাবেও সামাজিক বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের এই অভিজ্ঞতা হয়তো ভারতীয় গণতন্ত্রকে একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাবে — রাষ্ট্র কি তার নাগরিককে প্রথমে বিশ্বাস করবে, না প্রথমে সন্দেহ করবে?
গণতন্ত্রের ভিত্তি সাধারণত বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে। রাষ্ট্র ধরে নেয় নাগরিক বৈধ, যতক্ষণ না তার বিপরীত প্রমাণিত হচ্ছে। কিন্তু যখন প্রশাসনিক সংস্কৃতি ক্রমশ “সন্দেহ-প্রথম” হয়ে ওঠে, তখন ভোটার ধীরে ধীরে নাগরিক থেকে সম্ভাব্য প্রতারকে পরিণত হন। এই মানসিক পরিবর্তনই সবচেয়ে উদ্বেগজনক।
কারণ একটি গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে টিকে থাকে না, টিকে থাকে নাগরিকের আস্থার ওপর। আর সেই আস্থা একবার ক্ষয়ে যেতে শুরু করলে, কেবল আদালতের রায় দিয়ে তাকে পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা যায় না।