Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ইজরায়েলের রাজনীতিতে একটা কথা বহুদিন ধরেই চালু আছে— সেখানে কেউ স্থায়ী নয়, শুধু সংকটটাই স্থায়ী। আর সেই সংকটের সবচেয়ে দীর্ঘজীবী মুখটির নাম বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি এমনভাবে ইজরায়েলের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন যে একসময় মনে হয়েছিল, নেতানিয়াহু আর ইজরায়েলি রাষ্ট্রব্যবস্থা যেন প্রায় সমার্থক হয়ে উঠছে। কিন্তু ইতিহাসে এমন মুহূর্ত আসে, যখন দীর্ঘদিনের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতাকেও হঠাৎ ক্লান্ত, বিচ্ছিন্ন এবং রাজনৈতিকভাবে অরক্ষিত দেখাতে শুরু করে। আজ ইজরায়েলে সেই প্রশ্নটাই ঘুরছে— নেতানিয়াহুর যুগ কি শেষ হতে চলেছে?
সাম্প্রতিক নেসেট সংকট সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে। যুদ্ধ, জিম্মি সংকট, অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিদ্রোহ— সব মিলিয়ে নেতানিয়াহুর ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিরল। বহু বিশ্লেষক এখন প্রকাশ্যেই বলছেন, যদি অবিলম্বে নির্বাচন হয়, তাহলে তিনি হয়তো আর প্রধানমন্ত্রী হয়ে ফিরতে পারবেন না।
এই সম্ভাবনার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে।
যুদ্ধের ক্লান্তি
ইজরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম দিকে ইজরায়েলের জনমত ব্যাপকভাবে সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, তত প্রশ্নও বেড়েছে। হামাসকে পুরোপুরি ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। জিম্মিদের অনেকেই এখনও ফিরতে পারেননি। গাজায় সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এমনকি ইজরায়েলের ভেতরেও এখন অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন— এই যুদ্ধের কোনও সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য আদৌ আছে কি?
ইজরায়েলি সমাজে নিরাপত্তা সবকিছুর ওপরে। আর নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিচয়ই ছিল “মিস্টার সিকিউরিটি”। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভোটারদের বোঝাতে পেরেছিলেন যে দেশের নিরাপত্তা তাঁর হাতেই সবচেয়ে সুরক্ষিত। কিন্তু ২০২৩ সালের হামলার অভিঘাত সেই ভাবমূর্তিকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সাধারণ ইজরায়েলির একাংশ মনে করেন, গোয়েন্দা ও সামরিক ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু এড়াতে পারেন না।
জোটের ভাঙন
নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকার মূলত অতিদক্ষিণপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে। এই জোট শুরু থেকেই অস্থির ছিল। একদিকে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ চায়, অন্যদিকে মধ্যপন্থীরা যুদ্ধ শেষ করে বন্দি বিনিময় ও কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে। ফলে সরকার কার্যত দুই বিপরীত চাপের মধ্যে আটকে গেছে।
ইজরায়েলের রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুব সূক্ষ্ম জিনিস। এক-দুটি ছোট দল সমর্থন তুলে নিলেই সরকার পড়ে যেতে পারে। আর এখন সেই আশঙ্কাই প্রবল। নেসেট ভেঙে গেলে যে নির্বাচন হবে, সেখানে নেতানিয়াহুর দল লিকুড সবচেয়ে বড় দল হলেও জোট গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন পাবে কি না, তা নিয়ে বড় সংশয় তৈরি হয়েছে।
জনমতের পরিবর্তন
সাম্প্রতিক বহু জরিপে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধকালীন আবেগ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তাও নেমেছে। তাঁর বিরোধীরা এখন শুধু বামপন্থী শিবিরে সীমাবদ্ধ নয়। সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, এমনকি রক্ষণশীল ভোটারদের একাংশও প্রশ্ন তুলছেন— এত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর নেতানিয়াহু কি বাস্তববোধ হারিয়ে ফেলেছেন?
অনেক ইজরায়েলি এখন মনে করেন, তিনি রাষ্ট্রনায়কের চেয়ে বেশি “বেঁচে থাকার রাজনীতি” করছেন। অর্থাৎ তাঁর প্রধান লক্ষ্য দেশ নয়, নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা। দুর্নীতির মামলাগুলিও সেই ধারণাকে শক্তিশালী করেছে। বহু সমালোচকের মতে,ক্ষমতার মসনদ ধরে রাখা নেতানিয়াহুর কাছে এখন শুধু রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়, ব্যক্তিগত সুরক্ষারও বিষয়।
আন্তর্জাতিক চাপ
একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্ক ছিল তাঁর বড় শক্তি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি জটিল। ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে না বললেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে মার্কিন প্রশাসনের ধৈর্য কমছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া, গাজায় মানবিক বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ইজরায়েলের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে তরুণ আমেরিকান ও ইউরোপীয় জনমতের একটা বড় অংশ এখন নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের বহু জায়গায় ইজরায়েলের ভাবমূর্তি দ্রুত বদলাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্য খুব বড় হতে পারে।
তবে এটাও সত্যি, নেতানিয়াহুকে রাজনৈতিকভাবে মৃত ঘোষণা করা বিপজ্জনক ভুল হতে পারে। অতীতে বহুবার তাঁকে শেষ বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু প্রত্যেকবারই তিনি কোনও না কোনওভাবে ফিরে এসেছেন। তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হল রাজনৈতিক প্রবৃত্তি। ইজরায়েলের বিভক্ত সমাজে ভয়, নিরাপত্তা, জাতীয়তাবাদ এবং অনিশ্চয়তাকে কীভাবে নির্বাচনী শক্তিতে রূপান্তর করতে হয়, তা তিনি অন্য অনেকের চেয়ে ভালো বোঝেন।
আর বিরোধী শিবিরও খুব সুসংহত নয়। নেতানিয়াহু-বিরোধী শক্তিগুলো নানা মতাদর্শে বিভক্ত। কেউ মধ্যপন্থী, কেউ উদারপন্থী, কেউ কট্টর জাতীয়তাবাদী। ফলে “নেতানিয়াহুকে সরাও” স্লোগান থাকলেও “তারপর কী” প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও নেই।
এ ছাড়া যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে অনেক ভোটার শেষ মুহূর্তে পরিচিত নেতৃত্বের দিকেই ঝুঁকতে পারেন। ইজরায়েলের ইতিহাসে নিরাপত্তা-আতঙ্ক প্রায়ই নির্বাচনী সমীকরণ বদলে দিয়েছে। নেতানিয়াহু সেই মনস্তত্ত্বের ওস্তাদ খেলোয়াড়।
তবু একটা ব্যাপার স্পষ্ট। এবারকার সংকট আগেরগুলোর মতো নয়। আগে নেতানিয়াহু নিজেকে সমস্যার সমাধান হিসেবে তুলে ধরতে পারতেন। এখন ক্রমশ তিনিই সমস্যার অংশ হিসেবে দেখা দিচ্ছেন। এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
একসময় তাঁকে ইজরায়েলের “অপরিহার্য নেতা” মনে করা হত। আজ প্রথমবার বড় আকারে প্রশ্ন উঠছে— তিনি কি ইজরায়েলের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন?
সুতরাং, নেতানিয়াহুর বিদায় অবশ্যম্ভাবী— এমন ঘোষণা এখনও তাড়াহুড়ো হবে। কিন্তু এটাও অস্বীকার করা কঠিন যে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক মোড়ে তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন। নেসেট ভেঙে নির্বাচন হলে তিনি হয়তো এখনও সবচেয়ে দক্ষ খেলোয়াড় থাকবেন। কিন্তু এই প্রথম তিনি এমন এক নির্বাচনে নামবেন, যেখানে তাঁর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ শুধু বিরোধী দল নয়, বরং জনগণের ক্লান্তি।