Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। প্রায় ছয় দশক পরে আবার রাজ্যের মন্ত্রিসভায় জায়গা পেতে চলেছে কংগ্রেস। দলীয় বিধায়ক রাজেশ কুমার এবং পি বিশ্বনাথন বৃহস্পতিবার মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন। ১৯৬৪ সালের পরে এই প্রথম তামিলনাড়ুর ক্ষমতার কেন্দ্রে সরাসরি অংশীদার হচ্ছে কংগ্রেস। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি শুধু দুই বিধায়কের মন্ত্রী হওয়া নয়, বরং দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের এক চেনা সমীকরণ বদলে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
তামিলনাড়ুতে বহু বছর ধরেই কংগ্রেস কার্যত আঞ্চলিক দলগুলির ছায়াসঙ্গী হয়ে ছিল। কখনও ডিএমকের (DMK) সঙ্গে, আবার কখনও এআইএডিএমকের (AIADMK) সঙ্গে জোট করে তারা নির্বাচনে লড়েছে, কিন্তু স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। রাজ্যে দ্রাবিড় রাজনীতির প্রবল উত্থানের পর থেকেই কংগ্রেস ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়েছিল। সেই কারণেই এবারের মন্ত্রিসভায় এই অন্তর্ভুক্তি কংগ্রেসের কাছে শুধুমাত্র প্রশাসনিক সাফল্য নয়, বরং এক বড়সড় মানসিক পুনর্বাসনও বটে।
জোট বদলের অঙ্কে বাজিমাত: টিভিকে-র সঙ্গে হাত মেলানোর সুফল
এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে এক জটিল রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস। এবারের নির্বাচনের আগে কংগ্রেস ডিএমকে নেতৃত্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ জোট ছেড়ে অভিনেতা-রাজনীতিক বিজয়-এর দল ‘তামিলাগা ভেত্রি কাজগম’ (TVK)-র সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল।
-
ঝুঁকিপূর্ণ চাল: রাজনৈতিক মহলে এই সিদ্ধান্ত প্রথমে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ বলেই মনে হয়েছিল।
-
ফলাফল: কিন্তু নির্বাচনে কংগ্রেস পাঁচটি আসন জিতে নেয় এবং টিভিকে সরকার গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শরিক হয়ে ওঠে।
-
পুরস্কার: এখন সেই সমর্থনেরই রাজনৈতিক পুরস্কার হিসেবে কংগ্রেসের এই দুই বিধায়ক মন্ত্রীসভায় ঠাঁই পাচ্ছেন।
রাজেশ কুমারের জয় বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কিল্লিয়ুর আসনে তিনি মাত্র ১,৩১১ ভোটে জিতেছেন। অন্যদিকে পি বিশ্বনাথন মেলুর আসনে জয়ী হয়েছেন ২,৭২৪ ভোটের ব্যবধানে। এই দুই কেন্দ্রেই লড়াই ছিল অত্যন্ত কঠিন ও হাড্ডাহাড্ডি। ফলে তাঁদের এই মন্ত্রীত্ব কংগ্রেস কর্মীদের কাছে এক বিরাট প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে। দল এর মাধ্যমে বুঝিয়ে দিতে চাইছে যে, অল্প আসন সংখ্যা নিয়েও তারা রাজ্যের ক্ষমতার মূল কাঠামোয় প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
‘প্রশাসনে অংশীদারিত্ব’: বার্তা শীর্ষ নেতৃত্বের
কংগ্রেস সাংসদ মানিক্কম ঠাকুর এই ঘটনাকে “তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়” বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর কথায়, মানুষ শুধু বিরোধী রাজনীতি নয়, প্রশাসনে কংগ্রেসের সরাসরি অংশীদারিত্বও চেয়েছিল। দল এখন সেই দাবিরই প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। এই বক্তব্যের ভেতরের রাজনৈতিক বার্তাও অত্যন্ত স্পষ্ট— দল এখন আর শুধুমাত্র বাইরে থেকে সমর্থনকারী শক্তি হয়ে থাকতে চাইছে না; তারা সরাসরি শাসনের অংশ হতে প্রস্তুত।
ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ
তবে এই প্রত্যাবর্তনের পথ কংগ্রেসের জন্য মোটেই সহজ হবে না। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এখনও দ্রাবিড় দলগুলির আধিপত্য ও শিকড় অত্যন্ত প্রবল। সেই তুলনায় কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি এখনও সীমিত এবং নিজস্ব ভোটব্যাঙ্কও বেশ দুর্বল। ফলে মন্ত্রিসভায় যোগদান করলেই যে দল রাতারাতি পুনর্জীবন পাবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বরং এখন দল ও মন্ত্রীদের ওপর দায়িত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে গেল। তামিলনাড়ুর সাধারণ মানুষ এখন দেখতে চাইবে, কংগ্রেসের মন্ত্রীরা প্রশাসনে থেকে কী ধরনের কাজ করেন এবং তাঁরা সত্যিই তাঁদের “জনমুখী শাসন”-এর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছেন কি না।
তবুও, রাজনৈতিক প্রতীকের গুরুত্বকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা যায় না। দীর্ঘ ৫৯ বছর পরে তামিলনাড়ুর মন্ত্রিসভায় কংগ্রেসের এই প্রত্যাবর্তন এই বার্তাই দিচ্ছে যে, ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে পুরনো শক্তিরাও নতুন সমীকরণের মাধ্যমে আবার নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে। দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে এই ঘটনা ভবিষ্যতে আরও কোনো বড় পরিবর্তনের পূর্বাভাস হয়ে উঠবে কি না, এখন সেটাই দেখার।