Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: টলিউডে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। এখানে প্রেম যেমন প্রকাশ্য, তেমনই রাজনৈতিক অবস্থানও। কখনও কোনও অভিনেতা কবিতা লিখে বিতর্কে জড়ান, কখনও কারও একটি মন্তব্য রাতারাতি তাঁকে “জনবিচারের কাঠগড়ায়” দাঁড় করিয়ে দেয়। কিন্তু পাঁচ বছর আগের একটি টুইট যে একদিন ফৌজদারি মামলার উপাদান হয়ে ফিরে আসবে, তা সম্ভবত পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় কিংবা স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় কেউই ভাবেননি।
ঘটনার শুরু ২০২১ সালের ২ মে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল জয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে। কিন্তু ফল ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে হিংসার খবর আসতে শুরু করে। রাজনৈতিক উত্তেজনা তখন চরমে। সেই আবহেই পরমব্রত একটি টুইট করেন — “আজ বিশ্ব রগড়ানি দিবস ঘোষিত হোক।” তার নীচে স্বস্তিকার হাসির প্রতিক্রিয়া — “হাহাহা, হোক।” পাঁচ বছর পরে সেই কয়েকটি শব্দই এখন আইনি নথির অংশ। অভিযোগ, এই মন্তব্যগুলি “প্ররোচনামূলক” ছিল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসাকে উৎসাহিত করেছিল।
অভিযোগপত্রে যা বলা হচ্ছে
অভিযোগ দায়ের করেছেন আইনজীবী জয়দীপ সেন। তাঁর বক্তব্য, জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে এই দুই অভিনেতার সামাজিক প্রভাব ছিল বিপুল, ফলে তাঁদের মন্তব্য উত্তেজিত পরিস্থিতিকে আরও দাহ্য করে তুলেছিল। অভিযোগপত্রে এমনও দাবি করা হয়েছে যে ওই সময় বিজেপি কর্মীদের উপর আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ এবং নারী নির্যাতনের আবহ তৈরিতে এই ধরনের পোস্ট ভূমিকা রেখেছিল।
রাজনীতির স্মৃতি বড় বিচিত্র জিনিস। কখনও তা মুহূর্তে মুছে যায়, কখনও আবার বহু বছর পরে হঠাৎ আগ্নেয়গিরির মতো জেগে ওঠে। বাংলার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখন সেই পুরনো টুইট নতুন অর্থ পাচ্ছে। যে কথাটি ২০২১ সালে অনেকেই “ব্যঙ্গ”, “সার্কাজম” বা “রাজনৈতিক উল্লাস” বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, ২০২৬ সালে সেটিই হয়ে উঠেছে “অপরাধমূলক উসকানি”-র সম্ভাব্য প্রমাণ।
ক্ষমতার মানচিত্রে টলিউড
কিন্তু এই কাহিনির আসল নাটক শুধু আইনি নয়। এর ভিতরে রয়েছে টলিউডের সাম্প্রতিক ক্ষমতার মানচিত্র।
কয়েকদিন আগেই পরমব্রত এমন এক বৈঠকে হাজির হন যেখানে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে “চাপের রাজনীতি”, “ব্যান কালচার” এবং ক্ষমতার আনুগত্য নিয়ে তীব্র আলোচনা হয়। সেখানে তিনি নাকি বলেছিলেন, সন্তান এবং পরিবারের কথা ভেবেই তাঁকে অনেক সময় “সমঝোতা” করতে হয়েছে। এই মন্তব্যের পরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর পুরনো রাজনৈতিক অবস্থানগুলি নতুন করে খুঁড়ে দেখা শুরু হয়। কেউ বললেন তিনি সুবিধাবাদী, কেউ বললেন “ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থাকার” অভ্যাস তাঁর পুরনো।
বাংলার সাংস্কৃতিক জগতে এই দৃশ্য নতুন নয়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পীদের পুরনো বক্তব্য নতুন আলোয় বিচার হওয়া এই রাজ্যের দীর্ঘ ঐতিহ্য। একসময় যাঁরা শাসকের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, ক্ষমতা বদলালে তাঁদের পুরনো সাক্ষাৎকার, টুইট, মঞ্চভাষণ — সবই আবার ঘুরে ফিরে আসে। যেন ডিজিটাল যুগে কোনও কথাই সত্যি আর মরে না।
দুই অভিনেতার দুই পরিচয়
পরমব্রত বরাবরই নিজেকে “উদারপন্থী”, “ধর্মনিরপেক্ষ” বুদ্ধিজীবী বলয়ে স্থাপন করেছেন। তাঁর পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারও সেই পরিচয় বহন করে। মহাশ্বেতা দেবীর আত্মীয়, ঋত্বিক ঘটকের পরিবারের সদস্য — এই বংশপরিচয় তাঁকে সবসময় এক ধরনের সাংস্কৃতিক মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু সেই পরিচয়ের সঙ্গেই জুড়ে থেকেছে রাজনৈতিক বক্তব্যের ঝুঁকি।
অন্যদিকে স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় বাংলা বিনোদন জগতের সবচেয়ে স্পষ্টভাষী অভিনেত্রীদের একজন। ব্যক্তিগত জীবন থেকে রাজনৈতিক মন্তব্য — সব ক্ষেত্রেই তিনি রাখঢাক কম করেন। ফলে তাঁর একটি হাসির প্রতিক্রিয়াও এখন আদালত ও থানার ভাষ্যে “সমর্থনসূচক অবস্থান” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
একটি টুইট কি সত্যিই হিংসা ঘটাতে পারে?
এখানে প্রশ্ন উঠছে — একটি টুইট কি সত্যিই হিংসা ঘটাতে পারে?
আইনের ভাষায়, “ইনসাইটমেন্ট” বা উসকানির সংজ্ঞা অত্যন্ত জটিল। শুধু আপত্তিকর বক্তব্য যথেষ্ট নয়; প্রমাণ করতে হয় বক্তব্যটির সঙ্গে বাস্তব হিংসার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল। আদালতে সেই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা সহজ নয়। বিশেষত যখন ঘটনাটি পাঁচ বছর আগের এবং পোস্টটি সরাসরি কাউকে আক্রমণের ডাক দেয়নি। ফলে এই মামলার আইনি ভবিষ্যৎ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীকী অর্থ।
কারণ এই এফআইআর আসলে একটি বার্তা। বার্তাটি হল — ডিজিটাল যুগে শিল্পীদের রাজনৈতিক মন্তব্য “টাইম ক্যাপসুল”-এর মতো থেকে যায়। সময় বদলালেই সেই পুরনো বাক্য নতুন শাসনের হাতে অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
টলিউডে নীরব আতঙ্ক
এই ঘটনার পর টলিউডের ভিতরেও নীরব আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলেই অনেকে মনে করছেন। কারণ প্রশ্নটা শুধু পরমব্রত বা স্বস্তিকার নয়। গত এক দশকে বহু অভিনেতা, পরিচালক, গায়ক, কবি নানা রাজনৈতিক মন্তব্য করেছেন। যদি পুরনো পোস্ট খুঁড়ে খুঁড়ে মামলা শুরু হয়, তবে তালিকা দীর্ঘ হতে বাধ্য।
একসময় বাংলার বুদ্ধিজীবী সমাজ মনে করত, শিল্পী মানেই রাজনৈতিক প্রাণী। কবিতা, নাটক, সিনেমা — সবই রাজনৈতিক অবস্থানের সম্প্রসারণ। কিন্তু এখন সেই একই জগৎ দ্বিধাগ্রস্ত। কারণ সামাজিক মাধ্যম শিল্পীর ব্যক্তিগত রসিকতাকেও স্থায়ী পাবলিক ডকুমেন্টে পরিণত করেছে। আগে কফিহাউসের আড্ডায় বলা কথা পরদিন উবে যেত। এখন টুইটের স্ক্রিনশট পাঁচ বছর পরে থানায় পৌঁছে যাচ্ছে।
বাক্স্বাধীনতা না রাজনৈতিক প্রতিহিংসা?
তবে এর মধ্যেও এক ধরনের নাটকীয় বিদ্রূপ আছে। যে বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে “প্রতিবাদী”, “প্রগতিশীল”, “ফ্যাসিবাদ বিরোধী” পরিচয়ে তুলে ধরতে ভালোবাসত, সেই জগতের একাংশ এখন নিজেই বাক্স্বাধীনতা বনাম দায়বদ্ধতার প্রশ্নে বিভক্ত। কেউ বলছেন, শিল্পীর কথার দায় আছে। কেউ বলছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে আইনের মোড়ক পরানো হচ্ছে।
কিন্তু বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দুই তারকা — একজন ব্যঙ্গ করেছিলেন, অন্যজন হেসেছিলেন। আর সেই হাসি, সেই ব্যঙ্গ, পাঁচ বছর পরে কলকাতার থানার ডায়েরিতে পরিণত হয়েছে।
ডিজিটাল যুগের রাজনীতি সম্ভবত এমনই। এখানে কোনও টুইটই সত্যি পুরনো হয় না।