বাংলাস্ফিয়ারঃ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ইতিহাসে এমন দিন খুব বেশি আসেনি, যেদিন বিতর্কের কেন্দ্রে কেবল রাজনৈতিক শক্তিপ্রদর্শন নয়, বরং আচরণের সংস্কৃতিও জায়গা করে নেয়। গতকাল স্পিকার নির্বাচন উপলক্ষে বিধানসভায় যে আলোচনা, পাল্টা বক্তব্য এবং সংযত বাক্যবিনিময় দেখা গেল, তা নিছক একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ছিল না। বরং সেটি ছিল বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদলে যাওয়ার এক প্রতীকী দৃশ্য। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে যে বিধানসভা ক্রমশ সংঘর্ষ, হইচই, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং দলীয় দম্ভের মঞ্চে পরিণত হয়েছিল, সেখানে আচমকা যেন অন্য এক সুর শোনা গেল।

নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাঁর বক্তৃতায় বিরোধীদের উদ্দেশ্যে যে ভাষা ব্যবহার করলেন, তা পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রায় অচেনা। তিনি বিরোধীদের “শত্রু” নয়, “গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ” বলে উল্লেখ করেন। এমনকি তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও বিধানসভা কেবল সরকারের সম্পত্তি নয়। এই মন্তব্যটি হয়তো অন্য অনেক রাজ্যে খুব স্বাভাবিক শোনাবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের গত এক দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি ছিল কার্যত একটি রাজনৈতিক ঘোষণা।

কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে বিধানসভার পরিবেশ ক্রমশ এমন এক জায়গায় পৌঁছেছিল, যেখানে বিরোধী কণ্ঠস্বরকে প্রায়শই সহ্যই করা হত না। বিরোধী সদস্যদের বক্তব্য মাঝপথে থামিয়ে দেওয়া, মাইক বন্ধ করে দেওয়া, সাসপেনশন, তুমুল হট্টগোল, কটূক্তি—এসব যেন নিয়মিত দৃশ্য হয়ে উঠেছিল। অনেক সময় মনে হত, বিধানসভা আর বিতর্কের জায়গা নয়; বরং সেটি সংখ্যার জোরে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রদর্শনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক মঞ্চ।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিত্বের মধ্যেই এই প্রবণতার কিছু ব্যাখ্যা লুকিয়ে আছে। তিনি স্বভাবতই সংঘর্ষমুখী রাজনীতির মানুষ। রাস্তার আন্দোলন, সরাসরি আক্রমণ, প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার রাজনীতি—এসবের ভিতর দিয়েই তাঁর উত্থান। ফলে প্রশাসনের শীর্ষে পৌঁছেও সেই রাজনৈতিক প্রবৃত্তি খুব একটা বদলায়নি। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও তিনি বিরোধিতাকে প্রায়শই ব্যক্তিগত আক্রমণ বলে ধরে নিতেন। বিধানসভায় তাঁর বক্তৃতা বহু সময়েই তথ্যনির্ভর কম, আবেগনির্ভর বেশি হয়ে উঠত। বিরোধী বেঞ্চের দিকে আঙুল তুলে তিরস্কার, ব্যঙ্গ, কখনও সরাসরি অপমান—এসব ছিল প্রায় রোজকার ঘটনা।

এর ফলে বিধানসভার সামগ্রিক পরিবেশও বদলে গিয়েছিল। শাসকদলের অনেক সদস্যই ধরে নিয়েছিলেন, আক্রমণাত্মক আচরণই রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রমাণ। ফলে বিতর্কের বদলে শ্লোগান, যুক্তির বদলে বিদ্রুপ, সংসদীয় রীতির বদলে দলীয় উচ্ছ্বাস বেশি চোখে পড়ত। স্পিকার পদটিও বহু সময় বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে। বিরোধীরা অভিযোগ তুলত, স্পিকার নিরপেক্ষ নন এবং কার্যত সরকারপক্ষের সম্প্রসারিত অংশে পরিণত হয়েছেন।

গতকালের অধিবেশনে সেই কারণেই পরিবেশের পরিবর্তনটি এত স্পষ্ট হয়ে উঠল। বিরোধী সদস্যরা সরকারকে আক্রমণ করেছেন, প্রশ্ন তুলেছেন, রাজনৈতিক কটাক্ষও করেছেন কিন্তু তার মধ্যেও এক ধরনের সংসদীয় সংযম বজায় ছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, সরকারপক্ষের তরফে সেই সমালোচনার প্রতি প্রতিক্রিয়াও ছিল তুলনায় অনেক শান্ত। মুখ্যমন্ত্রী নিজের বক্তব্যে কয়েকবার “হাউসের মর্যাদা” শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন। এই একটি শব্দই আসলে দুই যুগের পার্থক্যকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

মমতার আমলে বিধানসভার ধারণাটি ক্রমশ ব্যক্তি-কেন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল। অনেক সময় মনে হত, সরকার, দল এবং নেত্রী—তিনটি জিনিস যেন একাকার হয়ে গেছে। ফলে সরকারের সমালোচনা মানেই নেত্রীর সমালোচনা, আর নেত্রীর সমালোচনা মানেই প্রায় রাজনৈতিক অপরাধ। এই মনোভাবের সরাসরি প্রভাব পড়েছিল বিধানসভার উপরেও। শাসকদলের সদস্যরা প্রায়শই বিরোধীদের বক্তব্যকে রাজনৈতিক মতপার্থক্য হিসেবে নয়, ব্যক্তিগত অবমাননা হিসেবে নিতেন।

গতকাল সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে নতুন সরকার যেন অন্য একটি বার্তা দিতে চাইল। শুভেন্দু অধিকারী নিজের বক্তব্যে একাধিকবার অতীতের সংঘর্ষমূলক রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, মানুষ এখন “স্বাভাবিকতা” চায়। এই শব্দটির রাজনৈতিক গুরুত্ব কম নয়। কারণ পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে সাধারণ মানুষের এক বড় অংশের মধ্যেই এমন অনুভূতি তৈরি হয়েছিল যে রাজনীতি ক্রমশ অত্যধিক উত্তেজনাপূর্ণ এবং সর্বগ্রাসী হয়ে উঠছে। ভোট মানেই সংঘর্ষ, মিছিল মানেই আতঙ্ক, বিরোধিতা মানেই শত্রুতা—এই সংস্কৃতি সমাজের ভিতরেও প্রভাব ফেলেছিল।

বিধানসভা সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই প্রতিচ্ছবি। ফলে সেখানে আচরণের পরিবর্তনকে কেবল প্রোটোকলের পরিবর্তন বলে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে ক্ষমতার ভাষা বদলেরও ইঙ্গিত।

তবে এটাও সত্যি যে একটি দিনের পরিশীলিত বিতর্ক দিয়ে কোনও সরকারের চরিত্র নির্ধারণ করা যায় না। ইতিহাস বলছে, বহু সরকার শুরুতে সংযমের প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে ক্ষমতার স্বাভাবিক অহংকারে আক্রান্ত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষও সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত। ফলে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—এই নতুন সংসদীয় সংস্কৃতি কি স্থায়ী হবে? বিরোধীরা যখন আরও আক্রমণাত্মক হবে, যখন রাজনৈতিক চাপ বাড়বে, তখনও কি একই সংযম বজায় থাকবে?

কারণ গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা সৌজন্যের মুহূর্তে নয়; উত্তেজনার মুহূর্তে।

তবু গতকালের অধিবেশনকে ছোট করে দেখার উপায় নেই। অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা আবার এমন একটি জায়গা বলে মনে হয়েছে, যেখানে বক্তব্যের মূল্য আছে, যুক্তির জায়গা আছে, এবং রাজনৈতিক মতভেদ থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক সম্মানের কিছু অবশেষ এখনও বেঁচে আছে।

একসময় বাংলার বিধানসভা তার তীব্র কিন্তু মার্জিত বিতর্কের জন্য পরিচিত ছিল। জ্যোতি বসু, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় কিংবা অশোক মিত্রদের সময় বিরোধিতা হত তীব্র, কিন্তু ভাষা প্রায়শই থাকত নিয়ন্ত্রিত। ব্যক্তিগত আক্রমণের বদলে তথ্য, ব্যঙ্গের বদলে যুক্তি, উত্তেজনার বদলে বাগ্মিতা—এসবই ছিল সেই সংস্কৃতির অংশ। গতকালকের অধিবেশন সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের পূর্ণ প্রত্যাবর্তন না হলেও, অন্তত তার একটি ক্ষীণ প্রতিধ্বনি যেন শোনা গেল।

বাংলার রাজনীতি বহুদিন ধরে কেবল ক্ষমতার ভাষা শুনেছে। গতকাল, খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও, সেখানে আচরণের ভাষাটিও ফিরে এল।