বাংলাস্ফিয়ারঃ পশ্চিমবঙ্গ–বাংলাদেশ সীমান্তের যে অংশগুলি এখনও পুরোপুরি সুরক্ষিত নয় বা যেখানে কাঁটাতারের বেড়া অসম্পূর্ণ, সেগুলি মূলত উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ পর্যন্ত কয়েকটি সীমান্ত জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে। এই অঞ্চলগুলির অনেক জায়গাতেই নদী, চরভূমি, ঘন জনবসতি, কৃষিজমি এবং জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত সমস্যার কারণে স্থায়ী বেড়া নির্মাণ দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে।
উত্তর ২৪ পরগনা
সবচেয়ে বেশি আলোচিত অঞ্চলগুলির মধ্যে রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা। বিশেষ করে বসিরহাট, স্বরূপনগর, বাগদা, পেট্রাপোল সংলগ্ন এলাকা বহুদিন ধরেই ছিদ্রপ্রবণ সীমান্ত হিসেবে পরিচিত। ইছামতী নদী ও হাকিমপুর এলাকার কিছু অংশে এখনও পূর্ণাঙ্গ কাঁটাতার নেই। নদী ও জলাভূমির কারণে সেখানে স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি কঠিন।
নদিয়া
নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর ও সীমান্তবর্তী গ্রামীণ অঞ্চলেও দীর্ঘদিন জমি অধিগ্রহণের জট ছিল। বহু জায়গায় ভারতীয় গ্রাম ও বাংলাদেশের বসতি প্রায় পাশাপাশি অবস্থান করছে। ফলে আন্তর্জাতিক সীমান্তের নিয়ম মেনে বেড়া বসানো জটিল হয়ে পড়ে।
মুর্শিদাবাদ
মুর্শিদাবাদ জেলার পরিস্থিতি আরও জটিল। পদ্মা ও গঙ্গা নদী সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় নদীর গতিপথ প্রায়ই বদলে যায়। কোথাও নতুন চর জাগে, কোথাও ভাঙনে জমি নদীতে তলিয়ে যায়। ফলে স্থায়ী কাঁটাতারের বেড়া বসানো প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। এইসব জায়গায় বিএসএফকে অনেকাংশে নৌপথে টহলের উপর নির্ভর করতে হয়।
মালদা
মালদার কালিয়াচক ও নদীবহুল সীমান্ত এলাকাতেও একই সমস্যা রয়েছে। বর্ষাকালে বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে সীমান্ত অবকাঠামো বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কোচবিহার
কোচবিহার জেলাতেও কিছু অংশ এখনও পুরোপুরি সুরক্ষিত নয়। ছিটমহল বিনিময়ের পর পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হলেও সীমান্ত নির্ধারণ, জমির মালিকানা এবং স্থানীয় প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কিছু এলাকায় বেড়ার কাজ ধীরে এগিয়েছে।
জলপাইগুড়ি
জলপাইগুড়ি জেলার দহগ্রাম–আঙ্গরপোতা করিডর সংলগ্ন অঞ্চলেও দীর্ঘদিন সমস্যা ছিল। নদী, বনাঞ্চল এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে বহু অংশে সীমান্ত অবকাঠামো গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
এছাড়া দক্ষিণ দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর এবং উত্তরবঙ্গের আরও কিছু সীমান্ত এলাকাতেও আংশিকভাবে বেড়াহীন অঞ্চল রয়ে গেছে বলে বিভিন্ন সরকারি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
“অরক্ষিত” মানেই কি সম্পূর্ণ খোলা?
তবে “অরক্ষিত” শব্দটি এখানে একটু সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা দরকার। সব জায়গাই সম্পূর্ণ খোলা নয়। বহু এলাকায় কাঁটাতার না থাকলেও বিএসএফের টহল, বর্ডার আউটপোস্ট, ফ্লাডলাইট এবং নজরদারি ব্যবস্থা রয়েছে। আবার কিছু জায়গায় আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী শূন্যরেখা থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে বেড়া বসাতে হয়। ফলে সীমান্ত ও কাঁটাতারের মাঝখানে ভারতীয় কৃষিজমি বা বসতি পড়ে যায়, যা নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।
কেন্দ্রীয় সরকারের হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তের কয়েকশো কিলোমিটার অংশ এখনও পুরোপুরি বেড়াবন্দি নয়। তবে তার সবটাই জমি সমস্যার কারণে নয়। অনেক অংশই নদী, জলাভূমি ও পরিবর্তনশীল ভূপ্রকৃতির কারণে বাস্তবিক অর্থেই স্থায়ী কাঁটাতারের উপযোগী নয়।