অনেক বিদেশি সংবাদপত্র লিখেছে, বাংলা ছিল বিজেপির কাছে এক ধরনের “দুর্গ”। দীর্ঘদিন বামপন্থী রাজনীতি, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি সাংস্কৃতিক অহংকার এবং হিন্দুত্ববাদের বিরোধিতার জন্য বাংলাকে আলাদা চোখে দেখা হত। তাই বিজেপির এই জয়কে তারা শুধুমাত্র সরকার বদল হিসেবে নয়, ভারতের রাজনৈতিক মানসিকতার বড় পরিবর্তনের লক্ষণ হিসেবে দেখেছে।

পশ্চিমি সংবাদমাধ্যমের আরেকটি বড় আলোচনার বিষয় ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে অনেকেই মোদীর বিরুদ্ধে শেষ শক্তিশালী আঞ্চলিক নেত্রী হিসেবে দেখতেন। তাই তাঁর পরাজয়কে তারা ভারতের বিরোধী রাজনীতির দুর্বল হয়ে পড়ার প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছে। বিদেশি রিপোর্টগুলিতে বারবার উঠে এসেছে যে, কংগ্রেস দুর্বল, আঞ্চলিক দলগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে, আর সেই পরিস্থিতিতে মমতার হার বিজেপির জন্য বিশাল মানসিক জয়।

তবে পশ্চিমি সংবাদমাধ্যম শুধু বিজেপির সাফল্যের গল্প লেখেনি। ভোট প্রক্রিয়া নিয়েও তারা অনেক প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে মুসলিম ভোটারদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে বিভিন্ন রিপোর্টে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। পশ্চিমের বহু সাংবাদিক এখন ভারতীয় রাজনীতিকে “নির্বাচিত গণতন্ত্রের ভিতরে ধীরে ধীরে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ” — এই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখেন। অর্থাৎ ভোট হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলি ক্রমশ একদলীয় প্রভাবের দিকে ঝুঁকছে কিনা, সেই প্রশ্ন তাঁরা তুলছেন।

অর্থনীতি ও প্রশাসনের দিক থেকেও এই ফলাফলকে গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে। বিদেশি ব্যবসায়িক সংবাদমাধ্যমগুলির মতে, যদি বিজেপি বাংলায় স্থায়ীভাবে শক্তিশালী হয়, তাহলে কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্পর্ক বদলাবে, শিল্প ও পরিকাঠামো প্রকল্পের গতি বাড়তে পারে। অর্থাৎ তারা এটিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হিসেবেও দেখছে।

আরও একটি গভীর সাংস্কৃতিক বিষয় এখানে কাজ করেছে। পশ্চিমের চোখে বাংলা মানে শুধু একটি রাজ্য নয়। রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায়, বুদ্ধিজীবী সংস্কৃতি, বামপন্থা, উদ্বাস্তু রাজনীতি—এসব মিলিয়ে বাংলার একটি আলাদা আন্তর্জাতিক পরিচয় ছিল। তাই সেই বাংলায় বিজেপির উত্থানকে তারা প্রতীকী ঘটনা হিসেবেও দেখেছে। যেন ভারতের পুরনো রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দুই বদলে যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে পশ্চিমি সংবাদমাধ্যমের চোখে এই নির্বাচনের অর্থ ছিল চারটি বড় বিষয়—
মোদীর সর্বভারতীয় আধিপত্য আরও মজবুত হওয়া,
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতনের মাধ্যমে বিরোধী রাজনীতির দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়া,
ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে নতুন প্রশ্ন ওঠা,
এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির এমন অঞ্চলেও বিস্তার, যেগুলিকে একসময় তার বাইরে মনে করা হত।