বাংলাস্ফিয়ারঃ ভারতের চতুর্থ বৃহত্তম রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ভোটে পরাজিত হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদায় নিয়ে শোক করার কোনও কারণ নেই। পনেরো বছর ধরে তিনি এমন এক শাসন চালিয়েছেন, যা মূলত ব্যর্থতার প্রতীক। সারা দেশের অর্থনীতি যখন দ্রুত এগোচ্ছে, তখন তাঁর রাজ্যের ১০ কোটি মানুষের জীবন অনেকটাই স্থবির হয়ে থেকেছে। আজ একজন গড়পড়তা বাঙালির আয় গুজরাটের মানুষের আয়ের অর্ধেক মাত্র—যে গুজরাট নরেন্দ্র মোদীর নিজের রাজ্য। কিন্তু শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতাই নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনের আরেকটি ভয়ঙ্কর দিক ছিল তাঁর দমনমূলক রাজনৈতিক আচরণ। সমালোচকদের চুপ করানো হয়েছে, বিরোধীদের জেলে পাঠানো হয়েছে। তাঁর দলের বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ ছিল সর্বত্র। এমনকি অভিযোগ উঠেছে, দলের গুন্ডারা ধর্ষণের মতো অপরাধ করেও অনেক সময় পার পেয়ে যেত। ব্যবসায়ীদের জমি বা লাইসেন্স পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য করা হত। ফলে বহু মানুষ রাজ্য ছেড়ে চলে গেছেন।

ক্ষমতা হারানোর পরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সৌজন্য দেখাননি। বরং তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি সহজে ক্ষমতা ছাড়বেন না, কারণ তাঁর দাবি—নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। কিন্তু তাঁকে যেতেই হবে। নরেন্দ্র মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নির্বাচনে জিতেছে এবং প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গ শাসন করতে চলেছে। এই নির্বাচন ছিল এমন এক রাজনৈতিক ঢেউয়ের অংশ, যা দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতাসীন সরকারকে হটিয়ে দিয়েছে। কেরলে কমিউনিস্ট সরকার বিদায় নিয়েছে। তামিলনাড়ুতে চলচ্চিত্র তারকা থেকে রাজনীতিক হওয়া বিজয় বহু পুরনো রাজনৈতিক বংশকে সরিয়ে দিয়েছেন। এসবই দেখায় যে ভারতের গণতন্ত্র এখনও কাজ করে, যদিও তা নিখুঁত নয়। শেষ পর্যন্ত ভোটের ফল মোটামুটি মানুষের ইচ্ছাকেই প্রতিফলিত করেছে।

এই ফল আরও প্রমাণ করল যে, নরেন্দ্র মোদীর দল এখনও প্রবল শক্তিশালী। গত বারো বছরে কিছু রাজনৈতিক ধাক্কা খেলেও বিজেপি তার সংগঠনগত শক্তি ধরে রেখেছে। বিরোধীদের তুলনায় দলটি অনেক বেশি সুসংগঠিত। একই সঙ্গে তারা হিন্দুত্ববাদ ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিকে দক্ষতার সঙ্গে মিলিয়ে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পেরেছে। মিত্রদলগুলিকে সঙ্গে নিয়ে বিজেপি এখন ভারতের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল শাসন করছে, যেখানে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ বাস করেন। এমনকি যে দক্ষিণ ভারত একসময় বিজেপির প্রতি অনাগ্রহী ছিল, সেখানেও এখন মোদীর প্রতি কিছুটা সমর্থন তৈরি হচ্ছে।

তবু উদ্বেগের কারণ রয়েছে। গণতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে হলে বিজেপিকে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক কৌশলের সীমা মানতে হবে। কিন্তু অনেক সময় তারা তা মানে না। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল সঠিক হলেও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু অভিযোগ পুরোপুরি অমূলক নয়। ভোট পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার প্রায় আড়াই লক্ষ সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করেছিল। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এমন এক কঠোর প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে, যাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন, অথচ তাঁদের অনেকেই আপিল করার সুযোগ পাননি। নির্বাচন কমিশন তত্ত্বগতভাবে নিরপেক্ষ সংস্থা হলেও, মোদীর আমলে সেটিকে ক্রমশ সরকারের অনুগত বলেই মনে হচ্ছে।

ভারতের রাজনীতি আরও সংকীর্ণ ও কদর্য হয়ে ওঠার আশঙ্কাও বাড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলি ক্রমশ ধর্মের ভিত্তিতে ভোটারদের ভাগ করার চেষ্টা করছে। পশ্চিমবঙ্গ ও অসম—দুই জায়গাতেই বিজেপি বিপুল সংখ্যক হিন্দু ভোট পেয়েছে, আংশিকভাবে মুসলমানদের নিয়ে ভয় তৈরি করে। বিজেপি বলতে পারে যে বিরোধীরা নিজেদের ব্যর্থতার জন্য দায়ী কারণ তারা শক্তিশালী নেতৃত্ব বা হিন্দুত্ববাদের মোকাবিলায় বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প দিতে পারেনি। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে মোদী সরকার তদন্ত সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করে বিরোধীদের চাপে রেখেছে, দলীয় অর্থায়নের নিয়ম নিজেদের সুবিধামতো বদলেছে এবং সংবাদমাধ্যমের বড় অংশকে নিজেদের প্রভাবের মধ্যে নিয়ে এসেছে।

মোদী হয়তো এসব সমালোচনা উপেক্ষা করতে চাইবেন। কারণ তাঁর আক্রমণাত্মক রাজনীতি আপাতত বেশ সফল বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু এই রাজনীতি তাঁর আরেকটি বড় শক্তির সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে পারে, তা হল দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। সংস্কারমুখী নীতির কারণে এতদিন অর্থনীতি তাঁকে রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু এখন সেই গতি কমে যেতে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে সাধারণ মানুষ চাপে পড়বেন, আর তার প্রভাব ভোটের বাক্সেও পড়তে পারে। তখন মোদী হয়তো আরও বেশি বিভাজনের রাজনীতির দিকে ঝুঁকবেন। কিন্তু তা ভারতের জন্য ক্ষতিকর হবে, এমনকি তাঁর নিজের জন্যও। কারণ ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসন। অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী ও আক্রমণাত্মক শাসকদল সেই ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে। তাই জয়ের পর মোদীর সংযম দেখানো উচিত।