সৌমিক বিশ্বাস (বি বি সি): বহু বছর ধরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ছিল নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রার এক বড় ব্যতিক্রম।

তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ইতিমধ্যেই ভারতের হিন্দিভাষী বলয়ে ঝড় তুলেছিল, পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব ভারতে নিজেদের বিস্তার ঘটিয়েছিল এবং একসময়ের শক্তিশালী আঞ্চলিক দলগুলোকেও কোণঠাসা করে ফেলেছিল। কিন্তু বাংলা—যে রাজ্য নিজেকে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের এক বিশেষ ভূখণ্ড বলে মনে করতে ভালোবাসে, বিতর্কপ্রবণ এবং আত্মসচেতন—সে রাজ্য দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির প্রতি একরকম অনমনীয় প্রতিরোধ দেখিয়ে এসেছিল।

তাই এবারের বিধানসভা নির্বাচন ছিল অস্বাভাবিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১০ কোটিরও বেশি মানুষের এই রাজ্যের ভোটারসংখ্যা জার্মানির মোট জনসংখ্যার থেকেও বেশি। ফলে এই নির্বাচন অনেকটাই যেন একটি দেশের সরকার নির্বাচনের মতো, কোনও সাধারণ রাজ্য নির্বাচন নয়।

সোমবার পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় নরেন্দ্র মোদীর ১২ বছরের শাসনকালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে ধরা হবে। এটি শুধু টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকা একটি সরকারের পতন নয়; বরং পূর্ব ভারতে বিজেপির দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার পূর্ণতা।

লেখক ও সাংবাদিক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলেন, “বাংলা জয় বিজেপির কাছে বিরাট সাফল্য। এই রাজ্য ছিল বহুদিনের অধরা স্বপ্ন।”

সোমবার দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও বড় রাজনৈতিক পালাবদল দেখা গিয়েছে।

কিন্তু রাজনৈতিক গুরুত্বের বিচারে বাংলার ফলাফলের সঙ্গে অন্য কোনও কিছুর তুলনা চলে না।

গত প্রায় অর্ধশতকে পশ্চিমবঙ্গ মাত্র একবার সরকার পরিবর্তন দেখেছে। প্রথমে ৩৪ বছর বামফ্রন্টের শাসন, তারপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের আধিপত্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বহুদিন ধরেই বাংলাকে এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে এক সময়ে একটি “আধিপত্যবাদী” দলই রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের ফল কোনও আকস্মিক রাজনৈতিক বিস্ফোরণ নয়; বরং এক দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রকল্পের পরিণতি। ত্রিপুরায় বিজেপির দ্রুত উত্থান বা অসমে তাদের আগের সাফল্যের মতো বাংলা কখনও “এক ঝটকায় জয়” হওয়ার মাটি ছিল না।

সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের ফেলো রাহুল ভার্মা বলেন, “টানা তিনটি নির্বাচনে বিজেপি বাংলায় একটি বড় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। তারা ধারাবাহিকভাবে প্রায় ৩৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে।”

তাঁর মতে, “একবার যখন কোনও দল ৩৯-৪০ শতাংশ ভোটের ঘরে পৌঁছে যায়, তখন জয়ের জন্য তাদের আর মাত্র ৫-৬ শতাংশ বাড়তি সমর্থন দরকার হয়।” এবারের ভোটের প্রবণতা দেখাচ্ছে বিজেপি ৪৪ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছে।

সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিজেপি এই ফল করেছে এমন এক পরিস্থিতিতে, যখন বাংলায় জেতার জন্য ঐতিহাসিকভাবে যে গভীর সাংগঠনিক শিকড় দরকার হতো, তা এখনও পুরোপুরি তাদের নেই।

তৃণমূল কংগ্রেসের এখনও বেশি বিস্তৃত তৃণমূল স্তরের সংগঠন ছিল, আর ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা। তবু বিজেপি বারবার বড় ভোটশেয়ার ধরে রাখতে পেরেছে—রাজনৈতিক হিংসা, প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভয় দেখানোর অভিযোগ এবং দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী আঞ্চলিক দলগুলোর একটির বিরুদ্ধে লড়াই করেও।

রাহুল ভার্মার কথায়, “এতে বোঝা যাচ্ছে, বিজেপির সমর্থন এখন তাদের দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামোর সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে।”

তাহলে কী বদলাল, যে নির্বাচনের হাওয়া এত স্পষ্টভাবে বিজেপির দিকে ঘুরে গেল?

বহু বছর ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল এক শক্তিশালী সামাজিক জোট গড়ে তুলেছিল—মহিলা ভোটার, মুসলিম ভোটার এবং গ্রাম ও শহরের বিপুল সংখ্যক হিন্দু ভোটারকে একসঙ্গে ধরে রেখে।

বিশেষ করে মহিলারাই ছিল তৃণমূলের কল্যাণমূলক রাজনীতির প্রধান ভিত্তি। লোকনীতি-সিএসডিএসের ২০২১ সালের সমীক্ষা বলছে, তখন মহিলাদের মধ্যে তৃণমূলের সমর্থন ৫০ শতাংশ ছুঁয়েছিল—যা পুরুষদের তুলনায় চার শতাংশ বেশি। এর পেছনে ছিল বহু বছর ধরে চালু থাকা মহিলাকেন্দ্রিক সরকারি প্রকল্প এবং মহিলাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর মমতার উদ্যোগ।

কিন্তু এবার বিজেপি সেই সুবিধাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে আরও বেশি নগদ সহায়তা ও বিস্তৃত কল্যাণ প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেয়।

রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ভানু জোশি বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ নির্বাচনী সাফল্য দাঁড়িয়ে ছিল কল্যাণনীতি ও সংগঠনের এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর। কিন্তু যে সংগঠন তাঁকে ১৫ বছর ক্ষমতায় রেখেছিল, সেটাই শেষ পর্যন্ত তাঁর দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়।”

সংগঠন দুর্বল হতে শুরু করলে এবং কল্যাণমূলক রাজনীতির আকর্ষণ কমে এলে সেই ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। ভোটারদের একাংশ সরকারি সুবিধাগুলোকে আর রূপান্তরমূলক বলে ভাবছিল না; বরং সেগুলোকে স্বাভাবিক বিষয় বলে ধরে নিচ্ছিল।

এই পরিস্থিতিতে বিজেপির সুযোগ তৈরি হয় তৃণমূল-বিরোধী ক্ষোভকে আরও তীব্র হিন্দু মেরুকরণের ভাষায় অনুবাদ করার।

ভানু জোশির কথায়, “এটি শুধু কল্যাণনীতির ব্যর্থতার গল্প নয়; বরং এমন এক পরিস্থিতির গল্প, যেখানে কল্যাণনীতি ও সংগঠন—দুটোই আর মেরুকরণকে ঠেকানোর পক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না।”

এই নির্বাচন আবারও দেখিয়ে দিল, বাংলার রাজনীতিতে মুসলিম ভোট কতটা গুরুত্বপূর্ণ—যদিও ভোটের প্রকৃত ধরণ এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

মুসলিমরা পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। রাজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে মুসলিম ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২০২১ সালে তৃণমূল মুসলিম-প্রধান ৮৮টির মধ্যে ৮৪টি আসনে জিতেছিল, যা মমতার পক্ষে মুসলিম ভোটের বড়সড় সংহতির ইঙ্গিত দিয়েছিল। এবারে প্রাথমিক প্রবণতাও বলছে, মুসলিম ভোটের বড় অংশ এখনও তৃণমূলের সঙ্গেই রয়েছে। কিন্তু বিজেপি ক্রমশ বৃহত্তর হিন্দু সংহতি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী কল্যাণ প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সেই সুবিধাকে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে।

কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেসের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী মঈদুল ইসলাম বলেন, “বিজেপি একদিকে আক্রমণাত্মক কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অন্যদিকে আরও তীব্র মেরুকরণের রাজনীতি করেছে। নগদ সহায়তা দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি দৃশ্যমান সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ বাংলার হিন্দু ভোটের একাংশকে বিজেপির দিকে টেনে এনেছে।”

তবে বিজেপি নেতারা এই ফলকে আদর্শগত জয়ের চেয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রত্যাখ্যান হিসেবেই তুলে ধরেছেন।

বিজেপি নেতা ধর্মেন্দ্র প্রধান এক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “তৃণমূল নিজেদের জন্য নিজেরাই নেতৃত্বের সংকট তৈরি করেছে।” তাঁর অভিযোগ, দলটির মধ্যে “অহংকার” তৈরি হয়েছিল এবং “বিশেষ করে মহিলারা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও অত্যাচারে ক্ষুব্ধ হয়ে তৃণমূলকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।”

আরও একটি বড় বিতর্ক ছিল ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে।

নির্বাচন কমিশনের দাবি, এই বিশেষ পুনর্বিবেচনার উদ্দেশ্য ছিল ভোটার তালিকা থেকে ভুয়ো বা অযোগ্য নাম বাদ দেওয়া।

কিন্তু ভোটের আগেই প্রায় ৩০ লক্ষ ভোটারের নাম নিয়ে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত বাকি ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলির অভিযোগ, কার্যত “বৃহৎ মাত্রার ভোটাধিকার হরণের” পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে। তাঁদের দাবি, এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে দরিদ্র, সংখ্যালঘু এবং সীমান্তবর্তী এলাকার মুসলিম ও পরিযায়ী সম্প্রদায়ের ওপর।

বিশ্লেষকদের মতে, যেসব আসনে জয়ের ব্যবধান বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার চেয়েও কম, সেখানে এই বিতর্ক আরও তীব্র হবে। রাজনীতিক ও সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব এনডিটিভিকে বলেন, “ফল ঘোষণার পর ভোটার তালিকা সংশোধনের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাবে।”

তবে অনেকের মতে, শুধু এই বিতর্ক দিয়েই বিজেপির উত্থানের ব্যাখ্যা করা যায় না।

তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিজেপি অত্যন্ত সুসংগঠিত প্রচার চালায়। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির মতো কেলেঙ্কারিকে সামনে আনা হয়। ব্যক্তিগতভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করার বদলে দলটি প্রশাসনিক ব্যর্থতাকেই মূল ইস্যু করে তোলে।

বিজেপি যখন জয়ের পথে স্পষ্টভাবে এগিয়ে গেল, তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এর প্রভাব বাংলার বাইরেও অনেক দূর পর্যন্ত যাবে।

বিহারের মতো জোটের ভরসায় নয়, কিংবা ওডিশার মতো দুর্বল হয়ে পড়া আঞ্চলিক দলের বিরুদ্ধে নয়—বাংলায় বিজেপির জয় হবে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী আঞ্চলিক রাজনৈতিক ঘাঁটিগুলোর একটিকে একক শক্তিতে দখল করার ঘটনা।

নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলেন, “এটি মোদীকে আরও শক্তিশালী করবে।”

“ওডিশার থেকেও বেশি, বাংলার জয়কে নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ—দু’জনের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হবে।”

বিজেপির অন্দরে অমিত শাহ কার্যত “ম্যান অফ দ্য ম্যাচ” হয়ে উঠবেন বলেই মনে করা হচ্ছে—যেমন ২০১৪ সালে উত্তরপ্রদেশে ঐতিহাসিক জয়ের পর মোদী তাঁকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের মতে, বাংলার এই জয় বিজেপির উত্তরাধিকার রাজনীতিকেও বদলে দিতে পারে।

এটি অমিত শাহকে মোদীর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে এবং যোগী আদিত্যনাথ, নীতিন গডকরি বা রাজনাথ সিংয়ের মতো নেতাদের থেকেও তাঁকে এগিয়ে রাখতে পারে।

ফলে বাংলার রায় শুধু একটি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; এর তাৎপর্য জাতীয় রাজনীতিতেও গভীর।

দশকের পর দশক বাংলা নিজেকে এমন এক ভূখণ্ড হিসেবে দেখেছে, যা ভারতের বাকি অংশে চলা রাজনৈতিক স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।

এখন বিজেপি যখন অবশেষে ভারতের অন্যতম শক্তিশালী আঞ্চলিক ঘাঁটিও ভেঙে ফেলল, তখন সেটি হয়তো শুধু বাংলার একটি যুগের অবসান নয়; বরং মোদী যুগের রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনাও।

(লেখাটি বিবিসির সাইটে প্রকাশিত লেখাটির ভাবানুবাদ)